হরমুজ প্রণালিকে প্রাধান্য দিয়ে তিন ধাপের সংলাপ চায় ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:২৭

যুদ্ধ স্থায়ীভাবে শেষ করতে যুক্তরাষ্ট্রকে তিন ধাপে সংলাপের প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। প্রস্তাবে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেল সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়াকে সবার আগে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ইরান বলেছে, হরমুজ থেকে যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ তুলে নিলে তারা যুদ্ধ বন্ধের পরবর্তী ধাপের আলোচনা, অর্থাৎ পরমাণু সমৃদ্ধকরণের বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট আরও দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে গতকাল সোমবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওস জানায়, ইসলামাবাদ সফরকালে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান, মিসর, তুরস্ক ও কাতারের কর্মকর্তাদের তাদের প্রস্তাব জানিয়েছেন। তবে পরমাণু বিষয়ে কীভাবে সমাধানের বিষয়টি আসবে, সেটি নিয়ে পরিষ্কার কিছু জানায়নি তেহরান। যুক্তরাষ্ট্র বারবার বলে আসছে, ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করে সব সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যেন তাদের কাছে হস্তান্তর করে।
প্রস্তাবটি ইতোমধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে পৌঁছেছে। সেখানে বলা হয়েছে, হরমুজ বন্ধ রেখে কোনো আলোচনা চলবে না। এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের কর্তৃপক্ষ চাইলে তাঁকে ফোন করতে পারে। তিনি কথা বলতে প্রস্তুত।
বৈরুতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-মায়াদিন জানায়, যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা এগিয়ে নিতে তেহরান তিন ধাপের একটি রূপরেখা প্রস্তাব দিয়েছে। প্রথম ধাপে, শত্রুতার অবসান ঘটানো এবং ইরান ও লেবাননের ওপর নতুন করে হামলার বিরুদ্ধে বাধ্যতামূলক আরোপ নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, ওমানের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে হরমুজ প্রণালি পরিচালনার জন্য একটি নতুন আইনি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা এবং তৃতীয় ধাপে, পারমাণবিক সমস্যার সমাধান করা।
হোয়াইট হাউস বলেছে, যুদ্ধ শেষ করতে এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে ইরানের প্রস্তাব জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তারা আলোচনা করছেন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র কেরোলিন ল্যাভিট এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 
এ অবস্থায় পাকিস্তান ও ওমান সফর শেষ করে আরাঘচি রাশিয়ায় পৌঁছান। সেখানে তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন। স্থানীয় সময় গতকাল সকালে আরাঘচি রুশ শহর সেন্ট পিটার্সবার্গে পৌঁছান। রুশ বার্তা সংস্থা তাস জানিয়েছে, আরাঘচির নেতৃত্বাধীন ইরানের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট পুতিন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই লাভরভের বৈঠক চলে দেড় ঘণ্টা ধরে। পরে লাভরভ জানান, তাদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
আলজাজিরা জানায়, সেন্ট পিটার্সবার্গের ওই বৈঠক শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার লড়াইয়ের জন্য পুতিন ইরানের জনগণের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, মস্কো সম্ভব সবটুকু করার মাধ্যমে তেহরানের পাশে থাকবে। 
এর আগে আরাঘচির ইসলামাবাদ সফরকালে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা প্রত্যাখ্যান করে। সফরকালে ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জেরাড কুশনার পাকিস্তানে আসার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করা হয়। 
যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নানা দরকষাকষি চলছে, তখন লেবাননে যুদ্ধবিরতি ভেঙে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বিবিসি জানায়, হামলায় গত রোববার এক দিনে নারী-শিশুসহ অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে নতুন নতুন এলাকা খালি করতে বলছে। এরই মধ্যে তারা গাজার মতো করে একটি হলুদ রেখা দিয়ে অবস্থান নিয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের অন্তত ১০ কিলোমিটার এলাকা ইসরায়েলের দখলে রয়েছে।
ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দি এশিয়া গ্রুপের উপসাগরীয় অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ হেলাল দোহাভিত্তিক গণমাধ্যম আলজাজিরাকে বলেন, ‘তাদের স্বার্থগুলো এক নয়। রুশরা চায়, এটি চলতে থাকুক। কারণ, তারা রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করছে। অন্যদিকে ইরানিদের এটি বন্ধ করা প্রয়োজন। কারণ, তারা আমদানি-রপ্তানি করতে পারছে না।’
হেলাল আরও বলেন, আরাঘচি রাশিয়ায় গেছেন এই যুদ্ধে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া গোলাবারুদ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সরবরাহ পুনরায় পূরণ করতে এবং কূটনৈতিক সুরক্ষা চাইতে, যেহেতু রাশিয়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে সুরক্ষা দিয়ে থাকে। তাই এ সংকটকালে তারা সামনের দিকে এ সুরক্ষার ওপরই নির্ভর করবে।
বিবিসি জানিয়েছে, গত রোববার ওমানের রাজধানী মাসকাটে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। রাশিয়া যাওয়ার আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোববার ওমান সফর করেন। সেখানে তিনি ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদির সঙ্গে আলোচনা করেন। পরে এক্স-এ দেওয়া পোস্টে ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি বলেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে তিনি ও আব্বাস আরাঘচি একটি ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’ করেছেন, যেখানে তারা ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি তাদের যৌথ দায়িত্ব ও দীর্ঘদিন ধরে আটক থাকা নাবিকদের মুক্তির জরুরি মানবিক প্রয়োজন’ নিয়ে কথা বলেন।
জ্বালানি তেলের দাম আরও বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৯ ডলার ছাড়াল
বিবিসি জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনার পরিকল্পনা আবারও থমকে যাওয়ায় তেলের দাম বেড়েছে। বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৯ দশমিক ৩৩ ডলার হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে লেনদেন হওয়া অপরিশোধিত তেলের দামও ২ শতাংশ বেড়ে ৯৬ দশমিক ৭৮ ডলারে পৌঁছেছে। 
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, সংঘাতের কারণে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বের অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করে।
ফরাসি বহুজাতিক আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান বিএনপি পারিবাসের পোর্টফোলিও ম্যানেজার ও কৌশলবিদ সোফি হুইন বলেন, প্রণালিটি বন্ধ থাকার কারণে ‘ময়লার ব্যাগ থেকে শুরু করে ওষুধ’ পর্যন্ত সবকিছুর দাম প্রভাবিত হতে পারে। তিনি বলেন, যদি প্রণালিটি কয়েক সপ্তাহের বেশি বন্ধ থাকে, তবে এর প্রভাব ‘সরবরাহ শৃঙ্খলের ক্ষেত্রে সত্যিই সুদূরপ্রসারী’ হবে।
সিঙ্গাপুর ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির প্রভাষক গোহ জিং রং বলেন, তেল ব্যবসায়ীরা সাম্প্রতিক খবরের প্রতি তেমন সাড়া দিচ্ছেন না; সংঘাত কমার ‘বিশ্বাসযোগ্য’ প্রমাণের জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, ব্যবসায়ীরা শুধু একটি ভঙ্গুর ও পরিবর্তনযোগ্য যুদ্ধবিরতি চুক্তির চেয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ চান।’