
দীর্ঘ এক দশকের রাজনৈতিক আলোচনা, বিতর্ক ও সমঝোতার পর অবশেষে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নতুন অভিবাসন ও আশ্রয় নীতি “মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম প্যাক্ট” কার্যকর হতে শুরু করেছে। শুক্রবার (১২ জুন) থেকে ইউরোপজুড়ে এই নতুন কাঠামোর বাস্তবায়ন শুরু হয়, যার মাধ্যমে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, আশ্রয় আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগির নতুন ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।
ইউরোপীয় কমিশনের মতে, এই নতুন চুক্তির উদ্দেশ্য হলো অভিবাসন ব্যবস্থাপনাকে আরও সমন্বিত, কার্যকর ও নিয়ন্ত্রিত করা। বিশেষ করে ২০১৫ সালের শরণার্থী সংকটের পর ইউরোপে যে রাজনৈতিক চাপ ও মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল, তার সমাধান হিসেবেই এই সংস্কার আনা হয়েছে।
নতুন নীতির আওতায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাহ্যিক সীমান্ত দিয়ে অনিয়মিতভাবে প্রবেশকারী ব্যক্তিদের জন্য বাধ্যতামূলক স্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এতে তাদের পরিচয়, জাতীয়তা, স্বাস্থ্যগত অবস্থা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি যাচাই করা হবে। সাধারণত সাত দিনের মধ্যে প্রাথমিক যাচাই সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
যেসব আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন গ্রহণের সম্ভাবনা কম বলে বিবেচিত হবে, তাদের আবেদন সীমান্ত পর্যায়েই দ্রুত নিষ্পত্তি করা হবে। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকা আশ্রয় প্রক্রিয়া কমবে বলে আশা করছে ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষ।
ইতালি, গ্রিস, স্পেন ও মাল্টার মতো সীমান্তবর্তী দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত অভিবাসন চাপের মুখে ছিল। নতুন চুক্তির আওতায় অন্যান্য সদস্য দেশকে আশ্রয়প্রার্থী গ্রহণ, আর্থিক সহায়তা বা প্রশাসনিক সহযোগিতার মাধ্যমে দায়িত্ব ভাগাভাগি করতে হবে। এই ব্যবস্থাকে “সংহতি প্রক্রিয়া” বলা হচ্ছে।
চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ইউরোড্যাক ডাটাবেজকে আরও উন্নত করা হয়েছে। এখানে আঙুলের ছাপ, মুখাবয়বের ছবি এবং অন্যান্য বায়োমেট্রিক তথ্য সংরক্ষণ করা হবে, যাতে একজন ব্যক্তি একাধিক দেশে একাধিকবার আশ্রয় আবেদন করতে না পারেন এবং প্রক্রিয়া আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়।
তবে নতুন ব্যবস্থার প্রথম দিনেই ইউরোড্যাক সিস্টেমে কিছু প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দেয়, যা কয়েকটি সদস্য দেশের কার্যক্রমে সাময়িক প্রভাব ফেলে। ইউরোপীয় কমিশন এটিকে প্রাথমিক প্রযুক্তিগত সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো নতুন নীতির কিছু দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের আশঙ্কা, সীমান্ত পর্যায়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণে অনেক আশ্রয়প্রার্থী যথাযথ আইনি সহায়তা বা ন্যায্য শুনানির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংস্কার ইউরোপের অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও কঠোর ও নিয়ন্ত্রিত করবে, তবে এর সফলতা নির্ভর করবে সদস্য দেশগুলোর প্রস্তুতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন নীতিতে এটি অন্যতম বড় সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ইউরোপের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও অভিবাসন নীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।