
স্নায়ুযুদ্ধের দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার দুটি বিশালাকার কৌশলগত বোমারু বিমান একই দিনে পৃথক দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার দক্ষিণ মোহাভে মরুভূমির এডওয়ার্ডস বিমান ঘাঁটি থেকে উড্ডয়নের পরপরই মার্কিন বিমান বাহিনীর একটি বি-৫২ বোমারু বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ৮ জন আরোহীর সবাই নিহত হয়েছেন।
এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর, রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চলের ইর্কুটস্ক এলাকায় একটি প্রশিক্ষণ ফ্লাইটের সময় বিধ্বস্ত হয় রুশ বিমান বাহিনীর টু-২২এম৩ বোমারু বিমান।
শত্রুপক্ষের স্থল ও নৌ সীমানায় বোমা বর্ষণ (এমনকি পারমাণবিক বোমাও), টর্পেডো নিক্ষেপ কিংবা ক্রুজ মিসাইল হামলার মতো বিধ্বংসী অভিযানের জন্য এই যুদ্ধবিমান দুটি ডিজাইন করা হয়েছিল।
মার্কিন বিমান বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উড্ডয়নের পরপরই বি-৫২ স্ট্রাটোফোর্ট্রেস বোমারু বিমানটি রানওয়েতে আছড়ে পড়ে এবং মুহূর্তের মধ্যে আগুনে পুড়ে খাক হয়ে যায়। বিমানে থাকা ৮ জন ক্রু মেম্বারের কেউই বেঁচে নেই।
এডওয়ার্ডস বিমান ঘাঁটির এয়ারফোর্স কর্নেল জেমস হেইস সাংবাদিকদের জানান, আট ইঞ্জিনের এই শক্তিশালী জেট বিমানটি একটি নিয়মিত পরীক্ষামূলক মিশনে ছিল। রানওয়ে ছেড়ে চাকার মাটি স্পর্শ করা মাত্রই এটি দুর্ঘটনার শিকার হয়।
দুর্ঘটনার পর ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, দুর্ঘটনাস্থল থেকে মাইলের পর মাইল দূর পর্যন্ত কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উড়ছে। লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে প্রায় ১০০ মাইল (১৬১ কিমি) উত্তরে অবস্থিত এই দুর্ঘটনাস্থলের আকাশ থেকে তোলা ছবিতে দেখা যায়, মরুভূমির একটি ফুটবল মাঠের চেয়েও বড় অংশ জুড়ে বিমানটির ধ্বংসাবশেষ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
কর্নেল হেইস জানান, নিহত ৮ জনের ওই দলের মধ্যে সরকারি বেসামরিক কর্মকর্তা, ঠিকাদার এবং সামরিক বাহিনীর পোশাকধারী সদস্যরা ছিলেন। বিমানটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘বোয়িং’ নিশ্চিত করেছে যে, নিহতদের মধ্যে তাদের দুজন কর্মীও ছিলেন। বিমানটির রাডার আধুনিকীকরণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই ফ্লাইটটি পরিচালনা করা হচ্ছিল। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনো জানা যায়নি এবং তদন্ত চলছে। রানওয়ের ক্ষয়ক্ষতির কারণে এডওয়ার্ডস বিমান ঘাঁটির সমস্ত কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
একই দিনে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের একটি টু-২২এম৩ কৌশলগত বোমারু বিমান প্রশিক্ষণ চলাকালীন বিধ্বস্ত হয়েছে। তবে সৌভাগ্যবশত, বিমানের ক্রু সদস্যরা দুর্ঘটনার পূর্বমুহূর্তে সফলভাবে ইজেক্ট (প্যারাস্যুট নিয়ে বিমান থেকে বের হওয়া) করতে সক্ষম হয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, বিমানটি অঙ্গারা নদীর তীরের কাছাকাছি একটি ঘন বনাঞ্চলে পড়ে যায় এবং সেখানে একটি বিশাল ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়।
রুশ বার্তা সংস্থা ইন্টারফ্যাক্স প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ‘ক্রু সদস্যরা নিরাপদে বেরিয়ে এসেছেন। পাইলটদের জীবন বা স্বাস্থ্যের কোনো ঝুঁকি নেই। মাটিতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি এবং বিমানটি কোনো যুদ্ধাস্ত্র বা লাইভ বোম বহন করছিল না।’ ইর্কুটস্কের গভর্নর ইগর কোবজেভ জানিয়েছেন, কামেঙ্কা গ্রামের কাছে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে এবং উদ্ধারকারী দল সেখানে কাজ করছে।
সক্ষমতার লড়াই: বি-৫২ বনাম টু-২২এম৩
স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার কয়েক দশক পরেও এই দুটি বিমান মার্কিন ও রুশ সামরিক বাহিনীতে এখনো মেরুদণ্ড হিসেবে টিকে রয়েছে। কারণ এদের মতো ভারী অস্ত্র বহন ক্ষমতা, দীর্ঘ পাল্লা এবং সাশ্রয়ী মূল্যের বিকল্প কোনো আধুনিক বিমান এখনো পুরোপুরি তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
বি-৫২ স্ট্রাটোফোর্ট্রেস (যুক্তরাষ্ট্র)
গতি ও অস্ত্র ক্ষমতা: এটি একটি দূরপাল্লার, সাবসনিক (শব্দের চেয়ে কম গতির) বিমান, যা প্রায় ৭০ হাজার পাউন্ড (৩১,৭৫০ কেজি) অস্ত্র ও রসদ বহন করতে পারে।
ভার্সেটালিটি: ক্লাস্টার বোমা, গ্র্যাভিটি বোমা থেকে শুরু করে নির্ভুল গাইডেড মিসাইল এবং পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র—সবই এটি ৫০ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে নিক্ষেপ করতে সক্ষম।
পাল্লা: কোনো প্রকার জ্বালানি রিফুয়েলিং ছাড়াই এটি একনাগাড়ে ৮ হাজার মাইলেরও বেশি পথ পাড়ি দিতে পারে। বর্তমানে মার্কিন বিমান বাহিনীতে কেবল এর ‘এইচ’ মডেলটিই সচল রয়েছে।
টু-২২এম৩ ‘ব্যাকফায়ার’ (রাশিয়া)
গতি ও অস্ত্র ক্ষমতা: ন্যাটো কর্তৃক ‘ব্যাকফায়ার’ কোডনাম দেওয়া এই বিমানটি একটি সোভিয়েত আমলের সুপারসনিক (শব্দের চেয়ে দ্রুতগামী) বোমারু বিমান। রাশিয়া বর্তমানে এটি সিরিয়া এবং ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহার করছে।
আধুনিক সংস্করণ: ২০১৮ সালে আসা এর সবচেয়ে আধুনিক সংস্করণটি কেএইচ-২২ ক্রুজ মিসাইল এবং শব্দের চেয়ে কয়েক গুণ দ্রুতগামী হাইপারসনিক ‘কিনঝাল’ মিসাইল বহনে সক্ষম। এটি উচ্চ-উচ্চতা থেকে দূরপাল্লার স্ট্যান্ড-অব বোমাবর্ষণে অত্যন্ত পারদর্শী।
সূত্র: এনডিটিভি