
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক অনেকটা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ট্রাম্পের শুল্ক আরোপ নিয়ে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক হুমকিতে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কানাডায় আক্রমণের সম্ভাবনা নিয়ে গত সপ্তাহে দেশটির প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, ‘আমরা এমন একটি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি, যা একসময় ছিল সম্পূর্ণ অকল্পনীয়।’ তবে তিনি এটাও বলেছেন, ‘ঝুঁকিটি খুবই কম এবং এ ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।’
নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কার্নি বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির সময়ে মার্কিন-কানাডা সম্পর্ক নতুন করে নির্ধারিত হওয়ায় সব ধরনের সম্ভাবনা বিবেচনা করা তার দায়িত্ব। এটা আসলে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ।’
ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্কনীতি এবং কানাডাকে বারবার যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ বানানোর ইচ্ছা দেশ দুটির মধ্যে এমন অবস্থা তৈরি করেছে। তবে ২০২৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র কখনো কানাডার বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে-এমন সম্ভাবনা ‘নেই বললেই চলে’। তার বদলে তিনি রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার কথা বলেছিলেন।
চলতি সপ্তাহে এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউস বলেছে, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কানাডার মহান জনগণের সুরক্ষায় অন্য যে কোনো ব্যক্তির চেয়ে বেশি করেছেন।’
সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কানাডায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। এর অন্যতম কারণ হলো- প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দেশ দুটি পরস্পরের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। তবুও বিষয়টি কানাডিয়ানদের মনে স্পষ্টভাবেই উদ্বেগ তৈরি করছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র আটক করার পর লেজার পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৩০ শতাংশেরও বেশি কানাডিয়ান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কানাডা আক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে।
কেন এটি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম?
রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সে ৩৪ বছর দায়িত্ব পালন করা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা সাবেক লেফটেন্যান্ট-জেনারেল ক্রিস্টোফার কোটস বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে যুদ্ধ হবে- এটি অত্যন্ত জটিল এবং প্রায় কল্পনাতীত।’
বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘আমি পুরো কর্মজীবন সামরিক অভিযানে যুক্ত ছিলাম। কিন্তু আমরা কখনোই এমন সম্ভাবনা বিবেচনা করিনি যে, যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড থেকে কানাডার ওপর সামরিক হামলা আসতে পারে।’
কোটস ন্যাটোর বিভিন্ন মিশনেও কাজ করেছেন। দুই দেশই ন্যাটোর সদস্য। ন্যাটোর মূলনীতির একটি হলো- কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যরা তার প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসবে। এছাড়া দুই দেশ নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ডের অধীনে আর্কটিক অঞ্চলে যৌথ প্রতিরক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করে।
এসব কারণে কোটস মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কখনো কানাডার বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে সেটি সম্ভবত সরাসরি সামরিক হামলা দিয়ে শুরু নাও হতে পারে। বরং, সাইবার যুদ্ধ বা অন্যান্য পদ্ধতি দিয়ে শুরু হতে পারে।
দেশ দুটি সবসময় পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল না
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ২০ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত সময়ে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র স্বাভাবিক মিত্রে পরিণত হয়। সময়ের সঙ্গে তাদের অর্থনীতি, সামরিক ব্যবস্থা ও সংস্কৃতি গভীরভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু সবসময় এমন ছিল না।
কানাডিয়ান ওয়ার মিউজিয়ামের গবেষক টিম ফোরান বলছেন, কানাডার জাতীয় পরিচয়ের একটি মূল বৈশিষ্ট্য হলো- ১৮শ ও ১৯শ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রসারণবাদী নীতির বিরোধিতা করা। তার মতে, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে ভয় করার বিষয়টি কানাডার রাজনৈতিক প্রকল্পের ভিত্তিগত অংশ।’
আধুনিক কানাডা গঠনের আগে ব্রিটিশ উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন উপনিবেশ ব্রিটিশদের অনুগত ছিল, যখন বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশগুলো ব্রিটেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল।
কানাডা গঠনের আগেই যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশ উত্তর আমেরিকার উপনিবেশগুলো আক্রমণের চেষ্টা করেছিল। ১৭৭৫ সালে আমেরিকান বাহিনী মন্ট্রিল দখল করে এবং কুইবেক সিটিও প্রায় দখল করে ফেলেছিল।
এরপর ১৮১২ সালের যুদ্ধে আমেরিকান বাহিনী তৎকালীন কানাডার বিভিন্ন অংশ এবং সামুদ্রিক উপনিবেশগুলোতে বারবার আক্রমণ চালায়। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধটি মূলত অমীমাংসিত অবস্থায় শেষ হয়। এ যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বাহিনী প্রতিশোধ হিসেবে বিখ্যাতভাবে হোয়াইট হাউস পুড়িয়ে দেয়।
ফোরান জানান, সেসময় কানাডা তাদের প্রতিরক্ষার জন্য গ্রেট ব্রিটেন, রয়্যাল নেভি এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করত, যারা প্রধান যুদ্ধগুলোতে জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা ও প্রভাবের জবাবে কানাডা আবারও যুদ্ধের পরিকল্পনা বিবেচনা করেছিল। তখন কানাডা একটি পরিকল্পনা করে। সে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশটির সেনাবাহিনীর জেনারেলরা গোপনে সীমান্তবর্তী আমেরিকান শহরগুলোতে ভ্রমণ করতেন। তারা পর্যটকের ছদ্মবেশে সেতু ও মহাসড়কের ছবি তুলতেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে সম্ভাব্য শত্রু সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতেন।
২০ শতকে কানাডার ইতিহাস নিয়ে কাজ করা কানাডিয়ান ওয়ার মিউজিয়ামের গবেষক অ্যান্ড্রু বার্চের মতে, তখনও যুদ্ধের সম্ভাবনা খুবই কম ছিল। কিন্তু কানাডা প্রস্তুত থাকতে চেয়েছিল। এটাই সামরিক বাহিনীর কাজের একটি অংশ। তারা বিভিন্ন ধরনের সম্ভাব্য পরিস্থিতি কল্পনা করে।
যুক্তরাষ্ট্র কানাডা আক্রমণ করলে কী হতে পারে?
কানেকটিকাটের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাভেনের জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ম্যাথিউ শ্মিট বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কানাডা আক্রমণের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। তবুও কানাডা যে এখন এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেটিই প্রমাণ করে বৈশ্বিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা কতটা বদলে গেছে।
ম্যাথিউয়ের মতে, কানাডার নেতাদের এখন কঠিন কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। যেমন- যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তারা কতটা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ চালিয়ে যাবে? কারণ, এই সামরিক সহযোগিতা কানাডাকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। কিন্তু একই তথ্য ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষেও কানাডার বিরুদ্ধে ব্যবহারযোগ্য হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষতি করছে এবং কানাডিয়ানদের মধ্যে একটি বাস্তব ধরনের ভয় তৈরি হয়েছে।
আমেরিকানরা হয়তো ট্রাম্পের কানাডাকে ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর মন্তব্যকে গুরুত্বের সঙ্গে নাও নিতে পারেন। কিন্তু, কানাডিয়ানরা যে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে, তা স্পষ্ট। এবং প্রয়োজন হলে তারা নিজেদের রক্ষার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
তাহলে যুদ্ধ শুরু হলে কী হতে পারে?
যদি কোনোভাবে যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে প্রথম পর্যায়টি খুব দ্রুত শেষ হতে পারে। চলতি বছরের শুরুতে গ্লোব অ্যান্ড মেইল পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কানাডিয়ান সামরিক বাহিনীর একটি মডেল অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের ক্ষেত্রে এক সপ্তাহের মধ্যেই কানাডার গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানগুলো দখল হয়ে যেতে পারে।
কানাডার সামরিক বাহিনী দ্রুত সংখ্যায় পিছিয়ে পড়বে। ফলে কানাডিয়ান বাহিনীকে সম্ভবত গেরিলা-ধাঁচের যুদ্ধকৌশলে যেতে হবে, যাতে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের মতো মিত্র দেশগুলোর কাছে কানাডা সহায়তা ও প্রতিরক্ষার জন্য আবেদন করবে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে এই প্রথমবার কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার জন্য এমন সামরিক পরিকল্পনা করেছে।
তবে কোটস বলেন, এই মডেলিং আসলে সামরিক যুদ্ধ পরিকল্পনার তুলনামূলকভাবে প্রাথমিক পর্যায়ের বিষয়। তার মতে, অন্য ন্যাটো মিত্রদের তুলনায় কানাডা যেকোনো স্থল আক্রমণের পরিস্থিতিতে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, সে বিষয়ে পরিকল্পনা তৈরিতে পিছিয়ে ছিল। বর্তমান অনিশ্চিত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশটি এখন সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে।
এর একটি উদাহরণ হলো কানাডার প্রতিরক্ষা প্রধানের সামরিক বাহিনীর আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সাম্প্রতিক আহ্বান। এর মধ্যে প্রায় ৩ লাখ অপেক্ষাকৃত স্বল্প-প্রশিক্ষিত নাগরিক সৈন্য যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এমন যুদ্ধ সহজ হবে না। ম্যাথিউয়ের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক শক্তি থাকলেও কানাডার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য আমেরিকান জনগণ ও সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়া কঠিন হবে।
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, অনেক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা কানাডা আক্রমণের আদেশ পেলে পদত্যাগ করবেন। কারণ, তাদের কাছে এমন আদেশ অবৈধ এবং অনৈতিক বলে মনে হতে পারে।
কানাডিয়ান ও আমেরিকান সৈন্যরা নিয়মিত একসঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ করে এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক রয়েছে। তবে যদি পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয় যে, দুই দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। ম্যাথিউয়ের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত কানাডার মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ- যেমন তেল ও খনিজ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দিকে মনোযোগ দেবে। পাশাপাশি তারা কানাডার রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দ্রুত অচল করে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
তার মতে, এমন অভিযান অনেকটা ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের মতো হতে পারে, যেখানে সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা হয়েছিল। তবে তিনি এটাও স্বীকার করেন যে, সামরিক সক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র অনেক এগিয়ে থাকলেও ‘সমান অনুপাতে তুলনা করলে’ কানাডিয়ান সৈন্যরা যথেষ্ট শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন।