
অনেক শিশু সময়মতো বয়স উপযোগী কথা শিখতে ব্যর্থ হয় বা দেরি করে। অথবা অনেক শব্দ শিখলে বা অনুকরণ করতে পারলেও পরিবেশ উপযোগী যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে না।
অনেকে আবার অর্থবোধক শব্দ শিখতে পারে না সময়মতো। এই সমস্যাগুলোকে মোটাদাগে স্পিচ ডিলে (বিলম্বিত কথা বলা) বলা হয়ে থাকে।
সুস্থ ও স্বাভাবিক একটি শিশু সাধারণত দুই মাস বয়সেই বিভিন্ন ধ্বনি তৈরি করে কাছের মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করে। ৬ থেকে ৮ মাসের দিকে সে বাবলিং করে অর্থাৎ বা বা, দাদ দা—এই ধরনের শব্দ করতে শুরু করে।
১ বছর বয়সের দিকে সে দাদা, মামা বাদেও কমপক্ষে একটি অর্থবোধক শব্দ বলতে শেখে। ১৬ থেকে ২০ মাস বয়সের মাঝে তার শব্দভান্ডার বেড়ে ১০ থেকে ৫০-এর মাঝে আসে।
২ বছরের দিকে দুটি শব্দ জোড়া লাগিয়ে ছোট ছোট বাক্য যেমন আমি খাব, এটা কী, তুমি বস—এসব বলতে পারে। ৩ থেকে ৪টি শব্দ জুড়ে বাক্য বানাতে তার সময় লেগে যায় তিন বছরের মতো।
৪ বছরের দিকে সে একটু জটিল বাক্য বোঝে, ছড়া-কবিতা বলতেও শিখে যায়। এই স্বাভাবিকতার ব্যত্যয় ঘটলে সেটিই স্পিচ ডিলে।
স্পিচ ডিলের বিভিন্ন কারণ
স্পিচ ডিলের কারণ অনেক। একটি শিশুর কথা বলার জন্য সঠিকভাবে কানে শোনা, মস্তিষ্ক দিয়ে অনুধাবন এবং মুখ দিয়ে সঠিকভাবে উচ্চারণ করা প্রয়োজন। এসব প্রক্রিয়ার কোনোটিতে বিচ্যুতি হলেই শিশুর কথা বলা বিলম্বিত হতে পারে।
শিশু যদি কানে কম শোনে অথবা শ্রবণপ্রতিবন্ধী হয়।
শিশুর যদি স্নায়ুর বিকাশজনিত সমস্যা থাকে, যেমন: সেরিব্রাল পালসি, অটিজম, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা।
বিভিন্ন ধরনের সিনড্রেমিক চাইল্ড, বিশেষ করে ডাউন সিনড্রোমের রোগীদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়।
বিভিন্ন ধরনের ডেভেলপমেন্টাল ল্যাঙ্গুয়েজ ডিজঅর্ডার যেমন তোতলানো, সিলেকটিভ মিউটিজম ইত্যাদি কারণেও শিশুর স্পিচ ডিলে হতে পারে।
এ ছাড়া মুখগহ্বরের বিভিন্ন সমস্যা যেমন টাং টাই, তালুকাটা, ঠোঁটকাটা বাচ্চাদেরও কথা বলতে সমস্যা হয় বলে স্পিচ ডিলে হতে পারে।
শিশুদের অতিরিক্ত ইলেকট্রনিক ডিভাইসে বুঁদ হয়ে থাকা। এতে একদিকে যেমন পারস্পরিক যোগাযোগ স্থাপন ব্যাহত হয়, অন্যদিকে বহু ভাষার সংস্পর্শে এসে বিকাশের সময়টায় দুই ভাষার দ্বন্দ্বে অনেক সময় শিশুদের কথা বলা শিখতে দেরি হয়ে যায়।
বর্তমান কালের একক পরিবারগুলোয় শিশুদের কথা বলার সঙ্গীর অভাব। সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ কম পাওয়াও শিশুর দেরিতে কথা বলার একটি অন্যতম কারণ।
শিশুর স্পিচ ডিলের চিকিৎসার জন্য সবার আগে দরকার সঠিক কারণ নির্ণয়। এ জন্য শিশুবিশেষজ্ঞ অথবা শিশুস্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। এ জন্য শিশুটির ইতিহাস খুব ভালোমতো নিতে হবে।
জন্মের সময় কোনো সমস্যা ছিল কি না, মানসিক বিকাশ ঠিকমতো হচ্ছে কি না, পরিবারে এ ধরনের সমস্যা আর কারও আছে কি না, এসব খুঁজে দেখতে হবে।
এসব ইতিহাস নিয়ে এবং শিশুটিকে খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা যেমন হিয়ারিং অ্যাসেসমেন্ট বা কানে শোনার পরীক্ষা, সাইকোলজিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট বা বুদ্ধি পরীক্ষা এবং শিশুটিকে যদি অটিস্টিক মনে হয় সেই অনুযায়ী কিছু পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করে সে অনুযায়ী চিকিৎসা করাতে হবে।
শিশুর যদি শ্রবণ সমস্যা থাকে তবে স্পিচ থেরাপির আগে কানের চিকিৎসা করাতে হবে। হিয়ারিং এইড অথবা ককলিয়ার ইমপ্ল্যান্টশনের প্রয়োজন হতে পারে। এরপর স্পিচ থেরাপি দিলে শিশুর কথা শিখতে উপকার হয়।
টাং টাই যদি কথা বলায় সমস্যা তৈরি করে তবে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জোড়াটা ছাড়িয়ে পরে স্পিচ থেরাপি দিলেই শিশুর কথা বলতে আর সমস্যা হয় না।
সেরিব্রাল পালসি অথবা শিশুর অন্যান্য বিকাশজনিত সমস্যায় স্পিচ থেরাপি দিলে উন্নতি হয়।
শিশু অটিস্টিক হলে বিভিন্ন ধরনের আর্লি ইন্টারভেনশন থেরাপি, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পেশাল স্কুলিংসহ বিভিন্ন ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে শিশুটির চিকিৎসায়।
ডেভেলপমেন্টাল ল্যাঙ্গুয়েজ ডিজঅর্ডার ভাষাজনিত এমন একটি সমস্যা, যেখানে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা, শ্রবণক্ষমতা বয়স অনুযায়ী ঠিক থাকলেও কথা বলায় বয়সের তুলনায় পিছিয়ে থাকে।
এর মধ্যে আছে স্ট্যামারিং বা তোতলানো, স্থানভেদে চুপ থাকা। এই সমস্যা পরিবারের অন্য সদস্যদেরও থাকতে পারে। এই শিশুদের স্পিচ থেরাপি দিলে উন্নতি হয়।
তাই কথা বলতে দেরি করলে কারণ নির্ণয় করে যত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, তত দ্রুত শিশুটির উন্নতি আশা করা যায়।