
হাম যেন এক অঘোষিত মহামারিতে পরিণত হয়েছে। হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন উল্লেখ্যযোগ্য সংখ্যক শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। খালি হচ্ছে মায়ের বুক। বুকের মানিক হারানো মায়ের আহাজারিতে রীতিমতো ভারী হয়ে উঠেছে আকাশ- বাতাস। ইতোমধ্যে এটি দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়ে উঠেছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের চরম অবহেলা ও অদূরদর্শিতার কারণে সমগ্র দেশে শিশুর জীবন এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে। বলা হয়, বিশ্বে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মরণ ব্যাধির মধ্যে হাম একটি। এটি খুব দ্রুত সংক্রমণশীল ভাইরাসজনিত একটি রোগ। ‘মিজলস মর্বিলিভাইরাস’ নামের একটি ভাইরাস এই হামের অনুঘটক। এটি মূলত মানুষের শ্বাসতন্ত্রকে সংক্রমিত করে। এটি হাঁচি-কাশির ড্রপলেট বা ফোঁটার মাধ্যমে বাতাসে মিশে যায়। ফলে এটি খুব দ্রুত একজন থেকে অন্যজনে ছড়ায়। এটি এত ভয়ংকর যে, আক্রান্ত শিশু বেঁচে যাওয়ার পরেও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য জটিলতায় বা স্থায়ী শারীরিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, এটি নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া, অন্ধত্ব এবং মস্তিষ্কে প্রদাহ বা এনসেফালাইটিস ঘটাতে পারে। এছাড়া হাম শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। ফলে অন্যান্য রোগের সংক্রমণের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘ইমিউনিটি অ্যামনেশিয়া’ বলা হয়। বর্তমানে এর প্রাদুর্ভাব এমন পর্যায়ে যে, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্তবয়স্কদেরও আক্রান্তের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, চলমান ভয়ংকর পরিস্থিতির পূর্বাভাস দিয়ে ইউনিসেফ একাধিকবার সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারকে আগেই সতর্ক করেছিল বলৈ ইউনিসেফ বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি স্টানলি গুয়াভুইয়া গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ইউনিসেফ অন্তর্বর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছে। প্রতিটি বৈঠকের পর আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে টিকার সম্ভাব্য ঘাটতি, রোগের প্রাদুর্ভাব, জটিলতা বৃদ্ধি এবং মৃত্যুহারের ঝুঁকি নিয়ে সরকারকে সতর্ক করেছে। অথচ, ড. ইউনুস এবং তার সরকার ইউনিসেফকে পাশ কাটিয়ে ৫০ শতাংশ টিকা ওপেন টেন্ডার মেথডে (উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি) কেনার সিদ্ধান্ত নেয়।
ইউনিসেফ ও তাদের অংশীদাররা তখন উদ্বেগের সঙ্গে জানায়, এই প্রক্রিয়ায় সামগ্রিক ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। এসব উদ্বেগ সত্ত্বেও উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে সরকার টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। এমন সিদ্ধান্তের ফলে টিকা সংগ্রহে বিলম্ব ঘটে এবং চরম ঘাটতি সৃষ্টি হয়। ফলে হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ে। গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এ পরিস্থিতি এখন রীতিমতো মৃত্যুর মিছিলে রূপ নিয়েছে। নিবন্ধটি লেখা অবধি সমগ্র দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮১ জনে।
জেনেশুনে এভাবে শত শত শিশুকে মৃত্যুকূপে ঠেলে দেওয়াকে পরোক্ষ গণহত্যা বললে অত্যুক্তি হবে না।
প্রসঙ্গত, ১৯৭৪ সালে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) আন্তর্জাতিকভাবে চালু হওয়ার পর থেকেই ইউনিসেফ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে টিকা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সরবরাহ করে চলেছে। বিশ্বব্যাপী টিকা সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় ইউনিসেফ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশ্বব্যাপী শিশু স্বাস্থ্য রক্ষায় তারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং সফল। বর্তমানে ইউনিসেফ শতাধিক দেশে প্রায় ৪৫ শতাংশ টিকা সরবরাহ করে থাকে। বাংলাদেশ সরকার ইউনিসেফের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তির আওতায় ১৯৭৯ সাল থেকে টেকনিক্যাল ও লজিস্টিক সহায়তাসহ টিকার সুবিধা পেয়ে আসছে। এর ফলে সময়মতো, সাশ্রয়ী এবং সমতাভিত্তিকভাবে টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে।
প্রতিটি শিশু যেন টিকা গ্রহণের মাধ্যমে জীবন রক্ষা করতে পারে— সে লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী কাজ করছে ইউনিসেফ। বাংলাদেশের সঙ্গে ইউনিসেফের পারস্পরিক এই অংশীদারত্বের ফলে বাংলাদেশ শিশু স্বাস্থ্য রক্ষায় দারুন সাফল্য অর্জন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে পোলিও নির্মূল, নতুন টিকা চালু এবং ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত টিকাদান। ইউনিসেফের সহায়তায় বাংলাদেশে পূর্ণ টিকাদান কর্মসূচি ১৯৮০ সালে ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে তা ৮২ শতাংশে উন্নীত হয়। সম্প্রসারিত এই টিকা কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ ২০০৭ সালেই পোলিও মুক্ত হয়েছে। ২০১৪ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশসহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ১১টি দেশকে পোলিও মুক্ত অঞ্চল ঘোষণা করে।
পোলিও নির্মূল, মাতৃ ও নবজাতকের টিটেনাস নির্মূল, হেপাটাইটিস-‘বি’ নিয়ন্ত্রণ এবং এইচপিভি ও টিসিভি টিকার মতো নতুন টিকা কর্মসূচি চালু করতে ইউনিসেফ কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থাকে ব্যবহার করে স্কুলভিত্তিক পুষ্টি, পানি ও স্যানিটেশন (ওয়াশ) কার্যক্রমের সঙ্গে টিকাদান যুক্ত করে সমন্বিত পদ্ধতি অনুসরণ করে শিশু স্বাস্থ্য রক্ষায় তারা নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। অর্থাৎ, শক্তিশালী সরকারি নেতৃত্ব, তথ্যভিত্তিক সুব্যবস্থাপনা, কমিউনিটির আস্থা এবং ইউনিসেফসহ অংশীদারদের সমন্বিত সহযোগিতার ফলে সম্প্রসারিত গণটিকাদান কর্মসূচিতে শিশুর জীবন রক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। ইতোমধ্যে, টিকা দান কর্মসূচিতে বাংলাদেশ বিশ্বে দশম স্থান অধিকার করেছে, যা যথেষ্ট গর্বের। বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার (হাজারে) ছিল ১৪১, এখন তা দাঁড়িয়েছে ২১ জনে। অর্থাৎ, শিশুমৃত্যুর হার কমেছে ৮৫ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত।
উল্লিখিত অভাবনীয় সাফল্য বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করলে সহজেই বোঝা যায় যে, সময়োচিত পদক্ষেপ ও সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে শত-শত শিশুকে এমন করুণ ও অকাল মৃত্যু বরণ করতে হতো না। অথচ, বিস্ময়ের বিষয় হলো— অন্তর্বর্তী সরকারের এমন অমানবিক অবহেলাকে ছাইচাপা দেওয়ার জন্য কোনও কোনও দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বা মহল থেকে হামের এহেন প্রাদুর্ভাবের নেপথ্যে মায়ের ‘অপুষ্ট স্বাস্থ্য’কে প্রধানভাবে দায়ী করা হচ্ছে। এটা সত্য যে, প্রসূতি মায়ের স্বাস্থ্য সূচকে আমরা আজও উল্লেখযোগ্য উন্নতি লাভ করতে পারেনি। তবে এই অবস্থাতেই আমরা করোনার মতো বৈশ্বিক মহামারি মোকাবিলায় যথেষ্ট সাফল্যের পরিচয় দিয়েছি— যা আন্তর্জাতিকভাবেও দারুন প্রশংসা কুড়িয়েছিল। এ সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই আমরা শিশু মৃত্যুর হার ৮৫ শতাংশ কমিয়ে আনতে পেরেছিলাম। প্রকৃতপক্ষে, সুষ্ঠু টিকা ব্যবস্থাপনার ফলেই তা সম্ভব হয়েছিল। সুতরাং, এ রকম দায়সারা অজুহাত দিয়ে বিরাজমান পরিস্থিতির প্রকৃত কারণকে এড়িয়ে যাওয়া কখনোই শুভকর হতে পারে না। কেননা, এতে এমন অব্যবস্থাপনাগত অপরাধকেই উৎসাহিত করা হবে। ইতোমধ্যে, আড়াই দশকের বেশি সময় ধরে চলতে থাকা হামের টিকাদান কর্মসূচি বাতিলে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তকে ‘ফৌজদারি অবহেলা’ উল্লেখ করে ড. ইউনূসসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের নির্দেশনা চেয়ে ১৭ মে একটি রিট দায়ের করা হয়েছে। গণমানুষের সর্বোচ্চ আস্থার জায়গা আদালত নিশ্চয়ই ন্যায্য বিচার করবে বলে শিশু সন্তানহারা সবব্যথিত মা প্রত্যাশা করেন।
উল্লেখ্য, বিরাজমান সংকট মোকাবিলায় গত ৫ এপ্রিল থেকে সরকার টিকাদান কর্মসূচি চালু করেছে— যা হতাশার মধ্যে আশা জাগিয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় প্রথম ধাপে দেশের ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর ফলে ওই সব উপজেলায় ইতোমধ্যে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। গত ১৯ মে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলমান কর্মসূচির আওতায় সারা দেশে ১ কোটি ৩২ লাখ ৬৮ হাজার ৯০৮ জন শিশুকে হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া হয়েছে। যা ইতোমধ্যেই লক্ষ্য মাত্রার ৯৬ শতাংশ পূর্ণ করেছে। স্বল্প সময়ের মধ্যে সরকারের এমন শিশুবান্ধব গণহিতৈষী উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। আসন্ন কোরবানি ঈদের পর দ্বিতীয় ধাপের ক্যাম্পেইন শুরু হবে বলে সরকার জানিয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, অন্তর্বর্তী সরকার জেনেশুনে কেন নিষ্পাপ শিশুদের এমন নির্দয়ভাবে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিয়েছে? উত্তরটা খুবই সরল আর তা হলো— ড. ইউনূস ও তার নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেড় বছরের শাসনামলে সংস্কারের নামে কার্যত মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নির্মূলেই অধিকাংশ সময় ব্যস্ত ছিলেন। মত্ত ছিলেন তাদের দ্বারা সৃষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রেসার গ্রুপ ‘মব বাহিনী’ পরিচালনায় ও ‘মব কালচার’ ব্যবস্থাপনায়। ফলে হামের টিকা ব্যবস্থাপনা ছিল তাদের কাছে গুরুত্বহীন একটি গৌণ বিষয়, যা নির্মোহ বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতার দাম্ভিকতা ও অপরিণামর্শী প্রতিহিংসা তাদেরকে নজিরবিহীন ও ভয়ংকর নিষ্ঠুর করে তুলেছিল। এরই প্রতিফলন এই শত শত শিশুর নির্মম মৃত্যুর মিছিল। জানি না, এই মিছিলের শেষ কোথায়! জানি না, এই পরোক্ষ গণহত্যার বিচার কোথায়!
লেখক: কলামিস্ট
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন