
একটি পরিবারের মাসের বাজারের হিসাব যখন আয়-ব্যয়ের খাতায় মেলে না, তখন মানুষ সাধারণত কিছু খরচ কমানোর চেষ্টা করে। বাইরে খাওয়া বন্ধ করে, পোশাক কেনা পিছিয়ে দেয়, বিনোদন বাদ দেয়, সন্তানের অতিরিক্ত চাহিদা মেটাতে পারে না। কিন্তু জ্বালানি? রান্নার গ্যাস? কর্মস্থলে যাওয়ার পরিবহন? এগুলো এমন খরচ, যেগুলোকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে এসবের দাম বাড়লে মানুষ শুধু একটি পণ্য বা সেবার জন্য বেশি টাকা দেয় না; তাকে জীবনের অন্য কোনো প্রয়োজন থেকে টাকা সরিয়ে নিতে হয়। এ কারণেই এলপিজির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি নিছক একটি জ্বালানির দাম বাড়ার খবর নয়। এর অভিঘাত ঘরের রান্নাঘর থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের সংসার পর্যন্ত পৌঁছাবে।
৪ অক্টোবর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন—বিইআরসি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে। সেপ্টেম্বরে যে সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা, এক মাসের ব্যবধানে তা বেড়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ। একই সঙ্গে গাড়িতে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দাম প্রতি লিটার ৭৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা করা হয়েছে। অর্থাৎ অটোগ্যাসের ক্ষেত্রেও এক ধাক্কায় উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধি। নতুন দাম কার্যকর হয়েছে ৪ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা থেকে।
বিইআরসির ব্যাখ্যা হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বেড়েছে। অক্টোবরের দাম নির্ধারণে সৌদি আরামকোর প্রোপেন ও বিউটেনের চুক্তিমূল্য এবং পরিবহন ও ব্যবসায়িক প্রিমিয়ামসহ অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ মূল্য নির্ধারণের একটি সূত্রভিত্তিক কাঠামো আছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের বাজারেও তার প্রভাব পড়বে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই প্রভাবের পুরো ভার কি ভোক্তার ওপরই পড়বে?
জ্বালানির মূল্য নির্ধারণের সময় শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের হিসাব করলেই হবে না; মানুষের ক্রয়ক্ষমতার হিসাবও করতে হবে। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্যই। বাজারকে স্বাভাবিক রাখা যেমন জরুরি, তেমনি বাজারের অভিঘাত থেকে দুর্বল মানুষকে রক্ষা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন আমরা গত কয়েক সপ্তাহের বাজারচিত্র দেখি। সেপ্টেম্বরে ১২ কেজি এলপিজির সরকারি নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভোক্তাকে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে বলে সংবাদ এসেছে। কোথাও কোথাও সরকারি দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অথচ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা একদিকে সরবরাহ নিয়ে সমস্যার কথা বলেছেন, অন্যদিকে এলপিজি অপারেটরদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দেশে চাহিদার তুলনায় আমদানি যথেষ্ট।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি তৈরি হয়—সমস্যাটি কি সত্যিই পণ্যের ঘাটতি, নাকি বাজার ব্যবস্থাপনার ঘাটতি?
জ্বালানি মন্ত্রণালয় সম্প্রতি আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠক করেছে। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসকদেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করেছে। অর্থাৎ বাজারে অনিয়মের অভিযোগ যে একেবারে ভিত্তিহীন নয়, সেটিও স্পষ্ট। কিন্তু অভিযান আর জরিমানা দিয়ে কি সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে?
এলপিজি এখন বাংলাদেশের লাখ লাখ পরিবারের রান্নার জ্বালানি। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে পাইপলাইনের গ্যাসের বিকল্প হিসেবে এলপিজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে এলপিজির দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি পরিবারের খাদ্যব্যয়ের ওপর পড়ে। একজন নিম্নমধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত মানুষ হয়তো সিলিন্ডার কেনার সময় অতিরিক্ত ২৫২ টাকা দেওয়ার হিসাব করবেন। কিন্তু তার প্রকৃত ক্ষতি এখানেই শেষ নয়। সিলিন্ডারের দাম বাড়লে হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি, ক্ষুদ্র খাদ্য ব্যবসা এবং নানা ধরনের সেবার পরিচালন ব্যয় বাড়বে। সেই বাড়তি ব্যয় কোনো না কোনোভাবে ভোক্তার ওপরই ফিরে আসবে।
অটোগ্যাসের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। যেসব গাড়ি এলপিজি বা অটোগ্যাস ব্যবহার করে, তাদের পরিচালন ব্যয় বাড়বে। পরিবহন মালিকেরা বলবেন, জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে। ভাড়া সমন্বয়ের দাবি উঠবে। গণপরিবহনে ভাড়া বাড়ানোর চাপ তৈরি হবে। ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক হয়তো কিছুটা বেশি খরচ বহন করবেন; কিন্তু বাণিজ্যিক পরিবহনের ক্ষেত্রে এই ব্যয় শেষ পর্যন্ত যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের খরচে যুক্ত হবে।
একটি পণ্য বাজারে পৌঁছাতে কৃষকের ক্ষেত থেকে পাইকার, পাইকার থেকে আড়ত, আড়ত থেকে খুচরা দোকান—একটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়। এই পুরো ব্যবস্থায় পরিবহন ব্যয় একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু গাড়ির মালিকের পকেট কাটে না; তার ঢেউ গিয়ে পড়ে চাল, ডাল, সবজি, মাছ, মাংস, পোশাকসহ নানা পণ্যের দামে।
বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির চাপ যখন সাধারণ মানুষের জীবনকে এমনিতেই কঠিন করে তুলেছে, তখন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির এই বহুমুখী প্রভাবকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। এখানে সরকারের জন্য সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো—মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি বাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশীয় বাজারে দাম বাড়বে—এটি গ্রহণযোগ্য। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে সেই সুবিধা ভোক্তা কত দ্রুত পান, সেটিও স্পষ্ট হওয়া দরকার। দাম নির্ধারণের সূত্র, আমদানি ব্যয়, পরিবহন ব্যয়, ব্যবসায়িক মার্জিন—সবকিছুর একটি স্বচ্ছ হিসাব জনসমক্ষে থাকা উচিত। মাসে মাসে দাম নির্ধারণ হবে, অথচ সাধারণ মানুষ জানবেন না কোন হিসাবের ভিত্তিতে দাম বাড়ল বা কমল—এটি দীর্ঘমেয়াদে আস্থার সংকট তৈরি করে। আরও বড় বিষয় হলো সরবরাহ।
সেপ্টেম্বরে দেশে এলপিজি আমদানির পরিমাণ যথেষ্ট ছিল বলে বিভিন্ন তথ্য এসেছে। জুলাইয়ে প্রায় ১ লাখ ২৪ হাজার টন এবং আগস্টে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এলপিজি আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম ২২ দিনেও এক লাখ ১৮ হাজার টনের বেশি আমদানি হয়েছিল। অর্থাৎ আমদানির পরিমাণ দেখেই সরবরাহ সংকটের একটি সরল ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন।
তাহলে কোথায় সমস্যা?
সরবরাহ শৃঙ্খলের কোনো স্তরে পণ্য আটকে থাকছে কি না, আমদানিকারকেরা ইচ্ছাকৃতভাবে বাজারে পণ্য ছাড়তে দেরি করছেন কি না, ডিলার-পরিবেশক পর্যায়ে মজুতদারি হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। কারণ বাজারে পণ্য আছে, অথচ ভোক্তা তা নির্ধারিত দামে পাচ্ছেন না—এমন পরিস্থিতি কোনো সুস্থ বাজারব্যবস্থার লক্ষণ নয়।
শুধু ভোক্তা-অধিকার অধিদপ্তরের অভিযান দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন একটি স্থায়ী বাজার-নজরদারি ব্যবস্থা। এলপিজির আমদানি থেকে শুরু করে বন্দর, সংরক্ষণাগার, বটলিং প্ল্যান্ট, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সরবরাহের প্রতিটি স্তরে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। কোন আমদানিকারক কত এলপিজি আনলেন, কতটা মজুত আছে, কতটা বাজারে ছাড়লেন—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ অনেকটাই কমবে।
একই সঙ্গে অটোগ্যাস স্টেশনগুলোর সরবরাহ পরিস্থিতিও নজরদারির আওতায় আনতে হবে। কোনো এলাকায় অটোগ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না, অথচ অন্য এলাকায় স্বাভাবিক সরবরাহ রয়েছে—এমন বৈষম্যের কারণও খুঁজে দেখা দরকার। তবে সরকারকে আরেকটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। আমরা কি দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করে থাকব?
আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জাহাজভাড়া, ডলারের বিনিময় হার কিংবা সরবরাহ সংকট—যেকোনো একটি কারণে দাম বেড়ে যেতে পারে। একটি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা যদি এত বেশি বাইরের বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশকে তাই জ্বালানি বহুমুখীকরণের দিকে যেতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সৌরবিদ্যুৎ, বিদ্যুৎচালিত যানবাহন এবং গণপরিবহনের দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্য নয়; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও প্রশ্ন।
আরেকটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না—গণপরিবহনকে সাশ্রয়ী ও কার্যকর করতে পারলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাত অনেকটাই কমানো সম্ভব। মানুষকে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে বাধ্য করে এমন নগরব্যবস্থা তৈরি করে পরে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেওয়া কোনো টেকসই নীতি হতে পারে না। নিরাপদ বাস, নির্ভরযোগ্য রেল, মেট্রোরেল, হাঁটার উপযোগী পথ এবং সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত জ্বালানি ব্যয়ের প্রয়োজনও কমে যাবে।
সবশেষে প্রশ্নটি আবারও ফিরে আসে—মানুষ যাবে কোথায়?
জ্বালানির দাম বাড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়ে। বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে। কিন্তু মানুষের আয় কি একই গতিতে বাড়ে? মধ্যবিত্তের বেতন কি প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে বাড়ে? দিনমজুরের মজুরি কি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে? নিম্নআয়ের মানুষের আয় কি বাজারের সব বাড়তি খরচ বহন করতে পারে? উত্তরটি আমরা সবাই জানি—পারে না।
তাই জ্বালানির মূল্য নির্ধারণের সময় শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের হিসাব করলেই হবে না; মানুষের ক্রয়ক্ষমতার হিসাবও করতে হবে। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্যই। বাজারকে স্বাভাবিক রাখা যেমন জরুরি, তেমনি বাজারের অভিঘাত থেকে দুর্বল মানুষকে রক্ষা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এলপিজির দাম বাড়ানো হয়তো অর্থনৈতিক বাস্তবতার অংশ। কিন্তু নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হওয়া, সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা, মজুতদারি এবং বাজারের অস্বচ্ছতা কোনোভাবেই সেই বাস্তবতার স্বাভাবিক অংশ হতে পারে না।
রাষ্ট্র যদি কেবল বলে, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে’, তাহলে মানুষ একসময় প্রশ্ন করবেই—আন্তর্জাতিক বাজারের দায় কি শুধু ভোক্তার? মানুষ জ্বালানি চায়, কিন্তু আগুন চায় না। মানুষ উন্নয়ন চায়, কিন্তু সেই উন্নয়নের বিল দিতে গিয়ে নিজের জীবনযাত্রা পুড়িয়ে ফেলতে চায় না।
তাই জ্বালানির দাম নির্ধারণের প্রতিটি সিদ্ধান্তে মানুষের সামর্থ্য, বাজারের স্বচ্ছতা এবং অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রের সাফল্য এই হিসাব দিয়ে মাপা যায় না যে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম কত ছিল। সাফল্য মাপা হয়—সেই দামের অভিঘাত থেকে রাষ্ট্র তার মানুষকে কতটা নিরাপদ রাখতে পেরেছে।
মানুষের সামনে যদি প্রতিটি মূল্যবৃদ্ধির পর একই প্রশ্ন ফিরে আসে—‘মানুষ যাবে কোথায়?’—তাহলে সমস্যাটি শুধু জ্বালানির দামে নয়, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের দর্শনেও কোথাও একটি বড় ঘাটতি থেকে যায়।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।