
আরবি নববর্ষ ১৪৪৮ হিজরির সূচনা হতে যাচ্ছে এক মহিমান্বিত ও হৃদয়স্পর্শী আয়োজনের মধ্য দিয়ে। ইসলামের সবচেয়ে পবিত্র স্থাপনা কাবা শরিফকে নতুন কিসওয়া বা গিলাফে আবৃত করা হবে আজ সোমবার (১৫ জুন) এশার নামাজের পর। প্রতি বছরের মতো এবারও পবিত্র মক্কার মসজিদুল হারামে অনুষ্ঠিত হবে এই ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান, যা বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের জন্য গভীর আবেগ, শ্রদ্ধা ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য প্রতীক।
সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য অনুযায়ী, প্রতি হিজরি বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ মহররমে পবিত্র কাবার গিলাফ পরিবর্তন করা হয়। নতুন বছরের প্রথম প্রহরে কাবার নতুন সাজ মুসলিম উম্মাহর কাছে নবজাগরণ ও পবিত্রতার এক বিশেষ বার্তা বহন করে।
১১ মাসের শ্রমে তৈরি নতুন কিসওয়া
অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, সূক্ষ্ম কারুকাজ এবং দক্ষ মানবশ্রমের সমন্বয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে এবারের কিসওয়া। মক্কায় অবস্থিত ‘কিং আবদুল আজিজ কমপ্লেক্স ফর দ্য হোলি কাবা কিসওয়া’-এর বিশেষজ্ঞ কারিগররা প্রায় ১১ মাস ধরে নিরলস পরিশ্রম করে গিলাফ তৈরির কাজ সম্পন্ন করেছেন।
নতুন কিসওয়াটি তৈরি করা হয়েছে ৪৭টি বিশুদ্ধ প্রাকৃতিক রেশমের প্যানেল দিয়ে। এতে সোনালি ও রুপালি প্রলেপযুক্ত সুতা ব্যবহার করে অত্যন্ত নিখুঁত ক্যালিগ্রাফি ও এমব্রয়ডারির মাধ্যমে পবিত্র কোরআনের ৬৮টি আয়াত খচিত করা হয়েছে। পুরো গিলাফটির মোট ওজন প্রায় ১ হাজার ৪১৫ কেজি।
যেভাবে তৈরি হয় কাবার কিসওয়া
একটি কিসওয়া প্রস্তুতের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ও অত্যন্ত সূক্ষ্ম সাত ধাপের প্রক্রিয়া। প্রতিটি ধাপই বিশেষ দক্ষতা ও মান নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন করা হয়।
কিসওয়া তৈরির সাতটি ধাপ
১. পানি বিশুদ্ধকরণ: রেশম প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য বিশেষভাবে পানি পরিশোধন করা হয়।
২. রেশম ধোয়া ও রং করা: রেশম সুতাকে ধুয়ে নির্ধারিত রঙে রাঙানো হয়।
৩. কাপড় বয়ন: স্বয়ংক্রিয় তাঁতের সাহায্যে রেশম সুতা থেকে কাপড় তৈরি করা হয়।
৪. ক্যালিগ্রাফি মুদ্রণ: কুরআনের আয়াত ও নান্দনিক ইসলামিক নকশা কাপড়ে মুদ্রিত করা হয়।
৫. সেলাই ও সংযোজন: কিসওয়ার বিভিন্ন অংশ নির্দিষ্ট মাপ অনুযায়ী সেলাই করে একত্রিত করা হয়।
৬.এমব্রয়ডারি: সোনা ও রুপার প্রলেপযুক্ত সুতা দিয়ে সূক্ষ্ম নকশা ও আয়াতগুলো ফুটিয়ে তোলা হয়।
৭. মান নিয়ন্ত্রণ: সর্বশেষ ধাপে কঠোর পরীক্ষার মাধ্যমে কিসওয়ার গুণগত মান ও পরিপূর্ণতা নিশ্চিত করা হয়।
চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে মসজিদুল হারাম
কিসওয়া পরিবর্তনের মাহেন্দ্রক্ষণ ঘনিয়ে আসায় মসজিদুল হারামে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। নতুন গিলাফের বিভিন্ন অংশ ইতোমধ্যে নির্ধারিত স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা শেষবারের মতো এমব্রয়ডারি, ক্যালিগ্রাফি, ইসলামিক অলংকরণ এবং কুরআনের আয়াতগুলো নিখুঁতভাবে বসানো হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখছেন। এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য একটি বিশেষ কারিগরি ও প্রকৌশলী দলকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
যেভাবে প্রতিস্থাপন করা হবে নতুন গিলাফ
কিসওয়া পরিবর্তনের মূল প্রক্রিয়া শুরু হবে বর্তমান গিলাফে থাকা সোনার প্রলেপযুক্ত অলংকরণ ও এমব্রয়ডারি করা অংশগুলো সতর্কতার সঙ্গে অপসারণের মাধ্যমে।
এরপর ধাপে ধাপে পুরোনো গিলাফ নামিয়ে কাবা শরিফের চার কোণে নতুন কিসওয়া স্থাপন করা হবে। পুরো কাজটি অত্যন্ত সুসংগঠিত ও নির্ধারিত পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা হয়, যাতে কাবার চারপাশের প্রতিটি অংশ সমানভাবে ও নিখুঁতভাবে বসানো যায়।
একই সঙ্গে কাবা শরিফকে বেষ্টন করে থাকা বিখ্যাত এমব্রয়ডারি করা বেল্ট বা ‘হিজাম’ এবং কাবার দরজার ওপরের বিশেষ পর্দাটিও নতুন করে স্থাপন করা হবে।
আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতীক
কাবার কিসওয়া পরিবর্তন শুধু একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ঐতিহ্য। প্রতি বছর নতুন কিসওয়া পরানোর এই দৃশ্য বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলমান গভীর আবেগ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেন।
১৪৪৮ হিজরির প্রথম রাতে নতুন বছরের পবিত্র সূচনার বার্তা নিয়ে পবিত্র কাবা নতুন গিলাফে সজ্জিত হয়ে মুসলিম উম্মাহকে স্বাগত জানাবে।