
জীবনের প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনো দুঃখ, কষ্ট কিংবা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যায়। কিন্তু সব কষ্ট সবার কাছে প্রকাশ করা প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় মানুষ আমাদের কথা শুনলেও অনুভূতি বুঝতে পারে না, সমাধানও দিতে পারে না। অথচ এমন একজন আছেন, যিনি আমাদের অন্তরের নীরব কান্নাও শোনেন, না বলা কথাও জানেন এবং হৃদয়ের প্রতিটি অনুভূতির খবর রাখেন। তিনি হলেন মহান আল্লাহ।
তাই হৃদয় যখন ভারাক্রান্ত হয়, যখন কষ্টে বুক ভরে যায়, তখন মানুষের কাছে নয়—সর্বপ্রথম নিজের রবের কাছেই হাত উঠান। কারণ তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ এবং অসীম দয়ালু।
আপনার কষ্ট আল্লাহর কাছে অমূল্য
মানুষ হয়তো আপনার চোখের জল দেখতে পায় না, আপনার নীরবতা বুঝতে পারে না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস, প্রতিটি অশ্রুবিন্দু এবং প্রতিটি দোয়া সম্পর্কে অবগত।
হজরত ইয়াকুব (আ.) বহু বছর প্রিয় সন্তান ইউসুফ (আ.)-এর বিচ্ছেদে কষ্ট সহ্য করেছিলেন। কিন্তু তিনি মানুষের কাছে অভিযোগ না করে তার দুঃখ একমাত্র আল্লাহর কাছেই নিবেদন করেছিলেন। কুরআনের বাণী—
قَالَ إِنَّمَا أَشْكُو بَثِّي وَحُزْنِي إِلَى اللَّهِ وَأَعْلَمُ مِنَ اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ
‘তিনি (ইয়াকুব) বললেন, আমি তো আমার দুঃখ ও বেদনা কেবল আল্লাহর কাছেই নিবেদন করি। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে আমি এমন কিছু জানি, যা তোমরা জানো না।’ (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৮৬)
ধৈর্যশীলদের জন্য রয়েছে সীমাহীন প্রতিদান
জীবনের প্রতিটি পরীক্ষা একজন মুমিনের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে, যদি সে ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে। কুরআনের বাণী—إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ
‘নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান অগণিতভাবে পূর্ণরূপে প্রদান করা হবে।’ (সুরা আয-যুমার: আয়াত ১০)
আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন
মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাওয়াক্কুল—আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা। যখন সব পথ বন্ধ মনে হয়, তখনও আল্লাহ এমন পথ খুলে দেন, যা আমরা কল্পনাও করতে পারি না। কুরআনের বাণী—وَمَن يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ
‘আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।’ (সুরা আত-তালাক: আয়াত ৩)
পরীক্ষার পরেই আসে স্বস্তি
আল্লাহ তাআলা কখনোই তার বান্দাকে চিরদিন কষ্টে রাখেন না। প্রতিটি কঠিন সময়ের পর তিনি স্বস্তির দ্বার খুলে দেন। কুরআনের বাণী—فَإِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا
‘নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি।’ (সুরা আলাম নাশরাহ: আয়াত ৫–৬)
হাদিসের আলোকে
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ لَهُ خَيْرٌ...
‘মুমিনের অবস্থা সত্যিই বিস্ময়কর। তার প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। সুখ পেলে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে—এটি তার জন্য কল্যাণ। আর দুঃখ-কষ্টে পড়লে সে ধৈর্য ধারণ করে—এটিও তার জন্য কল্যাণ।’ (মুসলিম ২৯৯৯)
সব কষ্ট মানুষের কাছে প্রকাশ করতে হয় না। কিছু কষ্ট এমনও থাকে, যা শুধু আল্লাহর কাছেই বলা সবচেয়ে সুন্দর ইবাদত। কারণ মানুষ হয়তো ভুলে যায়, কিন্তু আল্লাহ কখনো ভুলে যান না। তিনি বান্দার নীরব কান্নাও শুনেন, গোপন দোয়াও কবুল করেন এবং ধৈর্যশীলদের প্রতিদান কখনোই বিফল করেন না।
তাই হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধরুন, বেশি বেশি দোয়া করুন এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখুন। নিশ্চয়ই তিনি আপনার কষ্টকে শান্তিতে, অশ্রুকে হাসিতে এবং পরীক্ষাকে সফলতায় রূপান্তরিত করার সর্বোত্তম ক্ষমতার অধিকারী। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ধৈর্য, তাওয়াক্কুল এবং তার সন্তুষ্টি অর্জনের তৌফিক দান করুন। আমিন।