জাতীয় সংসদ নির্বাচনি জরিপের কেন এই হাল!

ডেস্ক রিপোর্ট
  ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৪৮

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মনোনয়ন যাচাই-বাছাই আর প্রচারণা এখন তুঙ্গে। একইসঙ্গে সমান গুরুত্ব দিয়ে চলছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নানাবিধ জরিপ— কার ঘরে কত ভোট। এরইমধ‍্যে বেসকারি সংস্থার দুটি নির্বাচনি জরিপ এবং দেশের শীর্ষ দৈনিকগুলোর একটি সামাজিক রাজনৈতিক-জনমত জরিপের ফলাফল সবার নজর কেড়েছে। তবে এক জরিপের ফলাফলের সঙ্গে আরেক ফলাফলের বিস্তর ফারাক থাকায় প্রশ্ন উঠছে— এর পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া নিয়ে। যারা গবেষণা ও জরিপ প্রক্রিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিন জড়িত— তারা বলছেন, নমুনা নির্ধারণ, উপাত্ত সংগ্রহসহ গবেষণা পদ্ধতির বিষয়ে সতর্ক না থাকলে মতামত জরিপে ‘ভুল রিপ্রেজেন্টেশনের’ শঙ্কা থাকে। এছাড়া চলমান জরিপগুলোকে তাড়াহুড়োর ছাপ স্পষ্ট।
গত ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মার্কিন ফেডারেল সরকারের অর্থায়নে রিপাবলিকান পার্টির ঘনিষ্ঠ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) একটি জরিপে বেরিয়ে আসে, আগামী সপ্তাহে (ডিসেম্বরের মাঝামাঝি) জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ৩০ শতাংশ ভোটার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) ভোট দেবেন এবং ২৬ শতাংশ ভোটার জামায়াতে ইসলামীকে ভোট দেবেন। ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের সেন্টার ফর ইনসাইটস ইন সার্ভে রিসার্চের পক্ষে একটি স্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান এই জরিপটি পরিচালনা করে। ২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং সিএপিআই (কম্পিউটার অ্যাসিস্টেড পার্সোনাল ইন্টারভিউয়িং) পদ্ধতিতে সরাসরি উপস্থিত হয়ে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। ওই জরিপে ৪ হাজার ৯৮৫ জন অংশগ্রহণ করেন, যাদের বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি। বাংলাদেশের আটটি বিভাগের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬৩ জেলা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়, তবে রাঙামাটি জেলা থেকে কোনও নমুনা বাছাই করা হয়নি। জরিপকারীদের দাবি, এই জরিপের আস্থার পরিমাণ ৯৫ শতাংশ।
চলতি সপ্তাহে বেসরকারি সংস্থা এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট (ইএএসডি) একটি জনমত জরিপের ফলাফল প্রকাশ করে। যেখানে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৭০ শতাংশ মানুষ বিএনপিকে ভোট দিতে যাচ্ছেন এবং জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে এই জনমত ১৯ শতাংশ। জরিপে উত্তরদাতাদের সামনে মূলত চারটি প্রশ্ন রাখা হয়েছিল। কোন দল সরকার গঠন করবে, এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির পক্ষে বেশি জনমত ছিল। ৭৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন, বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে, আর জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠন করবে বলে মনে করেন ১৭ শতাংশ মানুষ। ১ শতাংশের বেশি মানুষ মনে করেন আগামী নির্বাচনে এনসিপি সরকার গঠন করবে।
যে জরিপগুলো হচ্ছে, সেগুলো থেকে একটা ধারণা পাওয়া গেলেও উত্তরদাতা নির্ধারণে নমুনা বাছাইয়ে ধরন যা দেখা যাচ্ছে— সেটা ঠিক প্রতিনিধিত্বশীল মনে হয় না উল্লেখ করে ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেটিক্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইআইডি) নির্বাহী প্রধান সাঈদ আহমেদ বলেন, ‘‘এসব জরিপের প্রশ্নের মধ্যে যথেষ্ট পক্ষপাতমূলক টোন লক্ষ্য করা যায়। আবার একদিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে জরিপ তথ্য সংগ্রহকারীদের দিয়ে মাঠে প্রশ্ন পাঠানোর পদ্ধতিকেও প্রশ্ন করতে হবে। আমরা যারা নিয়মিত জরিপের কাজ করি, তারা তিনদিনের প্রশিক্ষণ শেষে প্রশ্ন নিয়ে তথ্য সংগ্রহকারীদের মাঠে পাঠাই। তারা সেখানে গিয়ে ‘ফিল্ড টেস্ট’ করে ফেরে। ৫ দিনের কমে প্রশিক্ষণ দিয়ে জরিপের কাজের জন্য প্রস্তুত করতে পারার কথা না।’’
তিনি এখনকার জরিপগুলোতে কয়েক ধরনের ঘাটতি দেখতে পান। গত বছর এই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই, বিবিএসের একটা জরিপের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘ওই জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, বেশিরভাগ মানুষ বলেছেন, তারা মুক্তভাবে মত প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছেন এবং এধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মত প্রকাশের জন্য যখন ‘মব’ এর শিকার হওয়ার শঙ্কা থাকে, তখন আপনি জরিপে গিয়ে সঠিক তথ্যটি তুলে আনবেন— এমন নাও হতে পারে।’’
এছাড়া এ ধরনের জরিপের টেকনিক্যাল ইস্যুর দিকগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘‘জরিপে যে প্রশ্নগুলো আমরা সাধারণত দেখতে পাচ্ছি, সেগুলো ট্যাগ কোশ্চেন। এটা এমন কিছু যে, প্রশ্নটাই উত্তরটাকে পক্ষপাতযুক্ত করবে। গবেষণায় প্রশ্ন করার সময় একটা চেষ্টা থাকতেই হয়, যাতে প্রশ্ন পক্ষপাতদুষ্ট না হয়। আবার, অনেক সময় মানুষ বিরূপ পরিস্থিতিতে মাঝামাঝি একটা জায়গা থেকে উত্তর দিতে চায়, সেটা এড়ানোর জন্য গ্রহণযোগ্য মেথড আছে। এখনকার যে জরিপগুলো, তার কোনোটাতেই এই সাবধানতাগুলো দেখি না। ফলে আমরা বলতে পারি, জরিপ পদ্ধতির মধ্যে সমস্যা আছে।’’
‘নির্বাচনি জরিপে নাগরিকদের মতামত চলমান ঘটনা দ্বারা খুব দ্রুত পরিবর্তনের মধ‍্য দিয়ে যায়’ উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ‍্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ‍্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, ‘‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আবেগপূর্ণ ঘটনা-দুর্ঘটনা মানুষের মতামতকে প্রভাবিত করে থাকে। এছাড়া বর্তমান অস্থির-অনিশ্চিত সময়ে অতিষ্ঠ হয়ে এমন কোনও রাজনৈতিক পক্ষকে, যাদেরকে তারা মনে করতে পারে— যারা স্থিতিশীলতা দিতে পারে। তবে খেয়াল রাখা দরকার যে, উপাত্ত নিজে থেকে কিছু বলে না, সেগুলো কোথায় কখন কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, সেই সিদ্ধান্তটা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক।’’
গবেষক সাঈদ আহমেদ ‘উদ্দেশ‍্য’ নির্ধারণ করে গবেষণার উল্লেখ করে বলেন, ‘‘দ্রুত জরিপ কাজ করবার জন্য এক ধরনের পক্ষপাত আছে, দ্রুত এলাকায় গিয়ে যাকে পেলাম, তাকে স্যাম্পলের অন্তর্ভুক্ত করলাম। যেসব জায়গায় যাচ্ছে এবং নমুনার অ্যাভেলেভলিটির ভিত্তিতে জরিপ করছে। প্রশ্ন হলো, সব জায়গার নমুনা অ্যাভেলেবিলিটিতো এক না। সেটা অ্যাডজাস্ট করেছে কীভাবে?’’
জরিপ ঠিকভাবে করতে হলে নমুনা নির্ধারণে সতর্ক থাকা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘আমরা একটা জরিপ করেছিলাম, সেটার নমুনা বিবিএস আমাদেরকে দ্বৈবচয়ন পদ্ধতিতে নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং আমাদের ওখানেই যেতে হয়েছে। ৫ হাজার বাড়িতে যেতে জরিপে খরচ পড়েছে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। অথচ বেশিরভাগ এ ধরনের জরিপ ১০/১২ লাখ টাকায় হয়ে যাচ্ছে। আবার জরিপে বলা হচ্ছে, যেসব এলাকায় গেছে, সেখানকার নমুনা সহজলভ্যতার (অ্যাভেইলেভিলিটির) কথা বলা হচ্ছে। যখনই বলে ‘অ্যাভেইলেবিলিটি’, তখনই ভাবতে হয়, দিনের বেলা এক ধরনের গ্রুপ বাসায় থাকে, তাদের মতামতের ওপর পুরো সিদ্ধান্ত নিতে হলে সেটা পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার শঙ্কা আছে।’’
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন