
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার (১৩ মার্চ) শুরুর বক্তব্য দিয়ে হাজারও প্রশ্নের মুখে পড়েছেন। আওয়ামী লীগের আস্থাভাজন হিসেবে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ পেয়ে তাদের বিরুদ্ধকারী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে শপথ পড়ানো থেকে শুরু করে বর্তমান সরকারপ্রধান, মন্ত্রিসভা, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের শপথও পড়ালেন তিনি। একইসঙ্গে হাজারও বিরোধিতার মাঝেও গত কয়েকবছর ধরে ভিন্ন ভিন্ন সরকারের রাষ্ট্রপতি যেমন আছেন তিনি, তেমনই বিভিন্ন সময়ে প্রশংসাসূচক বক্তব্যও দিতে দেখা গেলো তাকে। সবার মনে প্রশ্ন— কেন তিনি এসব বক্তব্য দিচ্ছেন? তিনি কি আসলেই নিরপেক্ষতার মাপকাঠিতে উতরে যেতে সক্ষম হয়েছেন?
সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কারণে মো. সাহাবুদ্দিন এখনও রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে আছেন। তবে তাকে বিএনপি সরকার কত দিন রাখবে, সে প্রশ্নও উঠেছে। সংসদ বসার আগেই জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তার অভিশংসনের দাবি তুলেছিল। মাত্র দুদিন আগে মঙ্গলবার (১০ মার্চ) রাজশাহী টিচার্স ট্রেনিং কলেজ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এনসিপির বিভাগীয় ইফতার অনুষ্ঠানে দলের আহ্বায়ক ও সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করে গ্রেফতারের দাবি জানান। ওই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘‘আগামী ১২ মার্চ নতুন সংসদের অধিবেশন শুরু হবে। আমরা শুনতে পাচ্ছি, সেদিন ফ্যাসিস্টের রেখে যাওয়া লেজুড় রাষ্ট্রপতি বক্তব্য রাখবেন। আমরা পরিষ্কার বলতে চাই, ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রপতির বক্তব্য শোনার জন্য আমরা সংসদে যাচ্ছি না। আমরা সংসদে যাচ্ছি— সংস্কার আদায় করার জন্য। কবে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে সেটা দেখতে। আমরা বলেছি, অবিলম্বে এই রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করে গ্রেফতারের আওতায় আনতে হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ করে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। হ্যাঁ, বাস্তবায়ন করতে হবে।’’
জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িতদের কেউ কেউ ২০২৪ সালে রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিলেও, বরাবরই তার পদত্যাগের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাকে ফ্যাসিবাদের রাষ্ট্রপতি বলা হলেও সেই রাষ্ট্রপতিই উল্টো বৃহস্পতিবার আওয়ামী সরকারকে ফ্যাসিবাদী সরকার বলে অবহিত করলেন। তিনি যখন এই কথাগুলো বলছিলেন, তখন সংসদ নেতাসহ বিএনপির সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাকে সমর্থন জানান। যদিও এর আগেই রাষ্ট্রপতির ভাষণের শুরুর পরপরই জামায়াত ও এনসিপি ওয়াকআউট করে বেরিয়ে যায়।
জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলাকালে রাষ্ট্রপতির ভাষণকে ঘিরে বিরোধী দলের ওয়াকআউটের পর বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “এই সংসদ জুলাই শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা অনুরোধ করেছিলাম, যারা ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর ছিল, তারা যেন এখানে কোনও বক্তব্য রাখতে না পারে।”
মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করেছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। তিনি কেন সেই সরকারের বিরুদ্ধে এত বিরোধী কথা বললেন? ২০২৪ সালে জুলাই আন্দোলনের মাত্র কয়েক মাস আগে যে নির্বাচন হয়েছিল, সেসময় এই রাষ্ট্রপতিই বলেছিলেন, ‘‘জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের কারণেই নির্বাচন সফল হয়েছে এবং সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পদক্ষেপ সার্থক হয়েছে।’’ তখন তিনি বক্তৃতা শেষ করেছিলেন, ‘জয় বাংলা’ বলে, আর বৃহস্পতিবার সংসদে তিনি বক্তব্য শেষ করেছেন ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে। যে রাষ্ট্রপতিকে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ সরকারের অনুগত হিসেবেই দেখা হয়েছে, তার ভাষণে এবার ভিন্ন সুর। তিনি জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বলেছেন। কেন এই বদলে যাওয়া? বিশ্লেষকরা বলছেন, এর প্রধান কারণ নিয়ম-নীতি। সাধারণত এই ভাষণ রাষ্ট্রপতি নিজে লেখেন না, এটি সরকার বা মন্ত্রিসভা প্রস্তুত করে। রাষ্ট্রপতি সংসদে তা পাঠ করেন এবং পরে সেই ভাষণের ওপর সংসদে আলোচনা হয়। প্রশ্ন উঠেছে, শুধুই কি তাই? সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য, রাজনীতিবিদরা বলছেন—লিখে দেওয়া হলেও নিজের সম্মতি ছাড়া নিশ্চয় রাষ্ট্রপতি কিছু বলেন না। ফলে যা বলেছেন, ধরে নিতে হবে তিনি সম্মতিক্রমেই বলেছেন।
‘ওনার হাতে অপশন ছিল পদত্যাগ করার। সেটা উনি যখন করেননি, তখন এবার নতুন রাষ্ট্রপতির যে নতুন নিয়ম, ওনাকে তো সেটার দিকেই এগিয়ে যেতে হবে’ উল্লেখ করে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘‘নতুন রাষ্ট্রপতির নতুন নিয়মে আসতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে। হয়তো রাষ্ট্রপতি ভাবছেন, যদি তিনি আরেক দফা থাকার ব্যবস্থা করতে পারেন। আত্মমর্যাদা তলানিতে থাকলে এ ধরনের বদলগুলোতেও মানুষ নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারে না। এটা রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে বাজে উদাহরণ তৈরি করলো, তার জন্য ব্যাপারটা ঠিক হয়নি।’’
নতুন রাষ্ট্রপতির নিয়োগ পদ্ধতির বিষয়ে সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘‘আমরা যে নতুন পদ্ধতির কথা বলেছি, সেখানে নিম্নকক্ষ থেকে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগবে এবং উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতিতে যারা থাকবেন, তাদের মতামতও লাগবে। সেক্ষেত্রে কেউ একক মেজরিটি পাবে না এবং দলীয় স্বার্থ হাসিল হবে না। কারণ অন্য দলের সমর্থন লাগবে এবং চাইলেই কেউ সংবিধান যখন তখন সংস্কার করতে পারবে না। সেই বিবেচনায় বিএনপি হয়তো আরও কয়েক মাস পরে রাষ্ট্রপতি নিয়োগের প্রক্রিয়ার দিকে যেতে পারে। এখন রাষ্ট্রপতি যা করছেন, সেটা তার কৌশল হিসেবে দেখছেন তিনি।