
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একসঙ্গে থাকলেও আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জোট টিকবে কিনা— তা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। কেউ বলছেন, স্থানীয় নির্বাচনে শরিকদের ছাড় দেবে না জামায়াত। আবার কেউ মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচনের মতো সমঝোতা হবে।
ইতোমধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ ৬ সিটিতে মেয়র পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছে এনসিপি। তারা মাঠে প্রচারণাও শুরু করেছে। অপরদিকে জামায়াত জানিয়েছে, তফসিল ঘোষণার পর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করা হবে।
তবে এরই মধ্যে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের এক অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) মেয়র পদে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমের নাম অনানুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। অপরদিকে, একই পদে এনসিপি আগেই আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। ফলে সমঝোতা না হলে দুই দলের প্রার্থীদের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেখা যেতে পারে।
এর মধ্যেই সোমবার (৪ মে) জামায়াত-সমর্থিত সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, “এনসিপিকে বিদায় জানানোর সময় হয়েছে।” এতে জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। এ নিয়ে উভয় পক্ষের অ্যাক্টিভিস্টরাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে নানা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন।
তবে দুই দলের দায়িত্বশীল পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা দেখাতে চায় উভয় দলই। ফলে এককভাবে নির্বাচন করার আলোচনা জোরালো হচ্ছে। যদিও এনসিপির একটি অংশ ঢাকার অন্তত একটি সিটিতে সমঝোতা চায়।
এ বিষয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “কেন্দ্র থেকেই মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে, তফসিলের পর তা প্রকাশ করা হবে।”
সমঝোতা নাকি প্রতিদ্বন্দ্বিতা?
এনসিপির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, তারা জোটগতভাবে নির্বাচনে আগ্রহী হলেও জামায়াতের কাছ থেকে ঢাকার অন্তত একটি সিটিতে ছাড় চান। বিশেষ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিষয়ে আপসের সুযোগ দেখছেন না তারা।
দলের এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা কৌশলগত কারণে ৬ সিটিতে প্রার্থী ঘোষণা করেছি। তবে শেষ পর্যন্ত জোট অক্ষুণ্ন রাখতে চাই। এ ক্ষেত্রে কিছু সিটিতে সমঝোতার আলোচনা হয়েছে।”
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন, নির্বাচিত হলে ঢাকা দক্ষিণের বাসিন্দাদের আর ময়লার বিল দিতে হবে না। পাশাপাশি ঢাকাকে দখল ও দূষণমুক্ত করার কথাও জানান তিনি।
জামায়াতের তৃণমূলে অসন্তোষ
জামায়াতের তৃণমূল পর্যায়ে এনসিপির প্রার্থীদের নিয়ে এক ধরনের অসন্তোষ রয়েছে। তাদের দাবি, ঢাকা দক্ষিণে সাদিক কায়েম ছাড়া অন্য কাউকে মেনে নেওয়া হবে না। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের এক নেতা বলেন, “আমরা ইতোমধ্যে সাদিক কায়েমকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঠিক করেছি। এ বিষয়ে সমঝোতার সুযোগ নেই।”
দক্ষিণে সাদিক কায়েমকে নিয়েও ধোঁয়াশা
গত শুক্রবার (১ মে) ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের মেয়র প্রার্থী হিসেবে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমের নাম ঘোষণা করে দলটির ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখা। এ নিয়ে নানা আলোচনা চলার মাঝে বিকালে বিবৃতি দেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস এ এম ফরহাদ। তিনি জানান, সাদিক কায়েম এখনও শিবিরের পদে আছেন। সে হিসেবে এখনই কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ তার নেই। তাই আবারও প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে জামায়াত কি সাদিক কায়েমের বিকল্প কাউকে ভাবছে? তাহলে কি এনসিপিকে ছাড় দেওয়ার কোনও সম্ভাবনা আছে? আর দিলেও জামায়াতের তৃণমূল সেটা মেনে নেবে কিনা সে প্রশ্নও আসছে।
দুই দলের নেতাদের ব্যাখ্যা
সিটি নির্বাচন ঘিরে কোনও মতানৈক্য তৈরি হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে দুই দলের নেতারা দুই ধরনের কথা বলছেন। এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত বলেন, “আমরা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। পরবর্তী সময়ে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অবস্থান নির্ধারণ হবে।” ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবিরের মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এটি তার ব্যক্তিগত মতামত।”
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। তফসিল ঘোষণার পর দলীয় সিদ্ধান্ত জানানো হবে। জাতীয় নির্বাচনের মতো জোট হওয়ার সম্ভাবনা কম।”
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন