সারাদেশে অ্যাডহক কমিটি যেনো আনলিমিটেড মেগাবাইট

খেলাধুলাকে খুন করে গেছেন আসিফ মাহমুদ!

নতুনধারা
  ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৩:৫০


৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ক্রীড়াঙ্গনের দায়িত্ব পান আগস্টের অন্যতম নায়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। বয়স কম। বিপ্লবের নেতৃত্ব দেওয়া টগবগে তরুণ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে থাকবেন সোচ্চার, প্রতিবাদী। ক্রীড়াঙ্গনের দায়িত্ব পাওয়ার পর অনেকেই খুশি হন। কিন্তু তাদের সেই খুশি খুশি ভাব বেশি দিন থাকেনি। দ্রুতই হতাশায় নিমজ্জিত হয়।
আসিফ মাহমুদের অদক্ষ নেতৃত্ব আর দুরভিসন্ধি ক্রীড়াঙ্গনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। ফেডারেশনগুলো ঝিমিয়ে পড়ে। শুধু ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোই নয়, গোটা দেশের জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোতেও স্থবিরতা নেমে আসে। মোট কথা তিনি ১৬ মাস দায়িত্ব পালন কালে ক্রীড়াঙ্গনে খেলাধুলা ছিল না বললেই চলে। কারও কারও মতে তিনি খেলাধুলাকে খুন করে গেছেন!
আসিফ মাহমুদের শাসনামলে ক্রীড়া ফেডারশেন এবং বিভাগ, জেলা ও উপজেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর কমিটি ছিল আনলিমিটেড মেগাবাইটের মতো। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ব্যতীত বাকি সবগুলো ভেঙে দিয়ে তিনি অ্যাডহক কমিটি গঠন করেন। এই সব অ্যাডহক কমিটির আবার কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ ছিল না। চিঠির ভাষ্য অনুযায়ী অনন্তকাল। যেন মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর অফারে দেওয়া আনলিমিটেড মেগাবাইটের মতো।
বাস্তবে অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয় একটা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য। যেখানে সর্বোচ্চ ৯০ দিন সময় বেঁধে দেওয়া হয়। এই সময়ের মাঝে অ্যাডহক কমিটি রুটিন কাজ করার পাশাপাশি নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে আসবে। কিন্তু আসিফ মাহমুদ এসব নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করেননি। নিজের ইচ্ছা আর পছন্দমতো লোক দিয়ে কমিটি গঠন করেন।
ক্রীড়াঙ্গনের নির্বাচিত কমিটি ভেঙে দিয়ে অ্যাডহক কমিটি গঠন করতে গিয়েও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া চরম অদক্ষতরা পরিচয় দেন। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পরই প্রচার হয়ে যায় নির্বাচিত কোনো কমিটি থাকবে না। ফলে কমিটি ভেঙে যাওয়ার শঙ্কায় পড়ে ফেডারেশনের কর্মকর্তারা কাজকর্ম থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেন। এর মাঝে আবার অনেক ফেডারেশনের শীর্ষ কর্তারা ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনে দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
অ্যাডহক কমিটি গঠন করতে গিয়ে আসিফ মাহমুদ ধীরে চলো নীতি অনুসরণ করেন। ফেডারেশন এবং জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোর কমিটি দিতে প্রায় এক বছরের মতো সময় নিয়ে নেন। এতে করে যেসব ফেডারেশনের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়নি, তারাও ফেডারেশনের কার্যক্রম থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেন। কারণ তারাও বুঝে গিয়েছিলেন যেকোনো সময় তাদেরও বিদায় নিতে হবে।
আবার যেসব ফেডারেশনে অ্যাডহক কমিটি দেওয়া হয়, সেই সব ফেডারেশনের অধিকাংশই অনেকটা নির্জীব ছিল। জেলা এবং বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোর অবস্থা ছিল আরও করুণ। ২০২৪ সালের ২১ আগস্ট সব বিভাগ, জেলা ও উপজেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলো ভেঙে দিয়ে অ্যাডহক কমিটি গঠন করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু কমিটি আর দেওয়া হয়নি। কমিটিবিহীন বিভাগ, জেলা ও উপজেলা সংস্থাগুলোতে অন্ধকার নেমে আসে। কমিটির অভাবে কোনো জেলা খেলার আয়োজন করতে চাইলেও, কমিটি না থাকায় সম্ভব হয়নি। পরে সেই সব কমিটি দেওয়া হয় ৭/৮ মাস পার হওয়ার পর। 
কমিটি দেওয়ার ক্ষেত্রে আসিফ মাহমুদ অদ্ভুত কিছু নিয়ম আবিষ্কার করেন। প্রজ্ঞাপন জারি করে জানানো হয় অ্যাডহক কমিটি হবে ৭ সদস্যের। কমিটিতে কারা থাকবে, সে ব্যাপারেও নির্দেশনা দেওয়া হয়। যেখানে ছিল ছাত্র প্রতিনিধি এবং সাংবাদিক থাকার বিষয়টিও। ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোতে অ্যাডহক কমিটি গঠন করার লক্ষ্যে আসিফ মাহমুদ ৫ সদস্যের একটি সার্চ কমিটিও গঠন করে দিয়েছিলেন।
কিন্তু কমিটি দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় সার্চ কমিটির প্রস্তাবনাও রাখা হয়নি। তাদের দেওয়া কমিটির শতকরা ৪০ ভাগই পরিবর্তন করে আসিফ মাহমুদ নিজের পছন্দের নাম দিয়েছেন বলে নাম প্রকাশ না করে জানান সার্চ কমিটির এক সদস্য। উদাহরণ হিসেবে তিনি শুটিং ফেডারেশনের কমিটির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা যে কমিটি দিয়েছিলাম একমাত্র সাধারণ সম্পাদক ছাড়া বাকি সবাইকে বাদ দেওয়া হয়। তাদের সেই কমিটির একজন জি এম হায়দারের নামে পরে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠে।’
সার্চ কমিটির দেওয়া নামের তালিকায় পরিবর্তনের কাজটি করেন আসিফ মাহমুদের হয়ে সাইফুল ও মাহফুজ নামে তার দুই এপিএস। তারা যেসব নাম দিয়েছেন ক্রীড়াঙ্গনে সেসব ব্যক্তিরা ছিলেন সম্পূর্ণ অপরিচিত। কোনো কমিটি দেওয়ার সময় সদস্যদের নামের পাশে তাদের পরিচিতি ছিল। আবার কোনো কোনো সময় কোনো রকম পরিচিতি ছিল না। এখানে অনেকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও আছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাবেক মহাসচিব সিরাজউদ্দিন মো. আলমগীর বলেন, ‘আসিফ মাহমুদ ক্রীড়াঙ্গনকে খুন করে গেছেন। তিনি গণতন্ত্রের কথা বলে ক্রীড়াঙ্গনে এসে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক কাজ করেছেন। অ্যাডহক কমিটি করতে গিয়ে তিনি কোনো নিয়ম-কানুনই মানেননি। জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার গঠনতন্ত্রে স্পষ্ট উল্লেখ আছে অ্যাডহক কমিটি হবে ৯০ দিনের। কিন্তু তিনি কিসের বলে অ্যাডহক কমিটি গঠন করে অনির্দিষ্টকালের জন্য মেয়াদ দিয়ে দেন। এটি তার দুরভিসন্ধি ছিল। আমাদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ৯০ দিন পর এসব অ্যাডহক কমিটি অবৈধ হয়ে গেছে। এরপর যারা কাগজপত্র কিংবা চেকে যারা স্বাক্ষর করেছেন, তারা অবৈধভাবে করেছেন। আদালতে মামলা করলে তাদের জেল-জরিমানা হবে। আবার তারা যেসব কমিটি দিয়েছেন তাদের অনেককেই আমি চিনি না। অথচ আমি দীর্ঘদিন থেকে ক্রীড়াঙ্গনে জড়িত। কম-বেশি সবাইকে চিনি। এটি করেছে আসিফ মাহমুদ গংয়ের সাইফুল-মাহফুজরা। আর্থিক লেনদেন হয়েছে। বিভিন্ন কমিটিতে এসব ব্যক্তিদের নাম দিয়ে তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন রকম সুযোগ-সুবিধা নেওয়া হয়েছে।’