যেভাবে বাংলাদেশের ফুটবলে এলেন মারাত তারেক

স্পোর্টস ডেস্ক
  ০৫ মে ২০২৬, ১৪:২৯

হোয়াটসঅ্যাপে মারাত তারেককে প্রথম বার্তা পাঠানো, সেখান থেকেই শুরু। নিজের পরিচয় দিয়ে সাক্ষাৎকারের আগ্রহ জানানো, কী জানতে চাই তা খুলে বলা। তখন ২২ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার অনুশীলন শেষে সেগুনবাগিচার ক্যাম্পে ফিরছিলেন। ব্যস্ততার মাঝেই সময় দিলেন। কথায় কথায় উঠে এলো তার ভিন্নধর্মী বেড়ে ওঠা, বহুজাতিক পরিচয় আর প্রথমবার বাংলাদেশের ফুটবলে তার পথচলার গল্প।
রাশিয়ান মা ও ক্যামেরুনের বাবা প্রসঙ্গে
রাশিয়ান মা ও ক্যামেরুনিয়ান বক্সার বাবার একমাত্র সন্তান মারাত তারেক। জন্ম ক্যামেরুনে, তবে মাত্র দুই বছর বয়সেই বাবা-মায়ের সঙ্গে পাড়ি জমান রাশিয়ায়। সেখানেই বড় হয়ে ওঠা। বাবা মুহাম্মদ তারেকের পেশা বক্সিং; পেশাদার বক্সার হিসেবে বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন, এখন কোচ হিসেবেও কাজ করছেন। মা নাতালিয়া লিভিনোভা একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।
বাবার হাত ধরে ছোটবেলায় বক্সিং রিংয়ে যাওয়া, খেলার প্রতি আগ্রহ; সবকিছুই ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে টেনেছে ফুটবল। দেশের ঘরোয়া ফুটবলে পিডব্লিউডির হয়ে খেলা মারাত বলছিলেন, ‘বক্সিং রিংয়ে বাবার হাত ধরে যেতাম। বক্সিং ভালোই লাগতো। তবে ফুটবলেই ঝোঁক ছিল বেশি। ফুটবল তো বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় খেলা। বাবার কোচিংয়ের চাকরির সুবাদে সার্বিয়াতে গিয়ে অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। বাবা-মা আমার পেশা নিয়ে কখনও কিছু বলেনি। এমনকি বাবা কখনও বক্সার হওয়ার জন্য বলেনি। আমিও বিভিন্ন দেশ ঘুরে এখন বাংলাদেশে খেলছি। যদিও আমরা থাকি মস্কোয়।’
ঝুকভ-রহিমভদের সাফল্যগাথা
বাংলাদেশের ফুটবলে তারেকের আগমন যেন পুরোনো এক স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। ৯০ দশকে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনী-মোহামেডানে রাশিয়ান কিংবা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের খেলোয়াড়রা দাপট দেখিয়েছে। দুই মিডফিল্ডার সের্গেই ঝুকভ ও অ্যালেক্সি আরিফিয়েভ আবাহনীর হয়ে মাঠ মাতিয়েছেন। আরিফিয়েভ গড়পড়তা মানের হলেও ঝুকভের পারফরম্যান্স ছিল মনে রাখার মতো। আবার মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে বরিস কুজনেৎসভ, জীবতনিকভ, সের্গেই নভিকভ ও আজামত আবদু রহিমভের মতো খেলোয়াড়রা দারুণ স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তাদের পথ ধরে শেখ রাসেলে স্ট্রাইকার এডওয়ার্ড খেলে গেছেন। এবার দীর্ঘ ১৫ বছর পর আবার রাশিয়ান পরিচয়ে বাংলাদেশের লিগে নাম লিখিয়েছেন মারাত তারেক।
যদিও জুকভ কিংবা রহিমভের মতো উঁচুমানের খেলোয়াড় তিনি নন। তবে রাশিয়ান রক্ত বইছে তার শরীরে। বাংলাদেশে একসময় রাশিয়ান খেলোয়াড়রা মাঠ মাতিয়েছেন তা ভালোই জানা তারেকের। সেটা মনে করিয়ে দিতেই তিনি জানালেন, ‘হ্যাঁ, আমি এটা জানি। বাংলাদেশে বড়মাপের রাশিয়ান খেলোয়াড়রা খেলেছে। এখানে ফুটবলের ঐতিহ্য আছে। শুনেছি দর্শকও হতো তখন। ফুটবলের প্রতি আলাদা করে ক্রেজও ছিল। এখন এখানে এসে তা কম দেখছি।’
বাংলাদেশ ফুটবল লিগে দ্বিতীয় পর্বে খেলছেন তারেক। তবে পিডব্লিউডির হয়ে তিন গোলও করেছেন। চাইছেন রাশিয়ান ঐতিহ্য ধরে রাখতে কিছু একটা করে দেখানোর। তার ভাষায়, ‘দেখুন আমি এখানে প্রথম খেলছি। চাইবো কিছু একটা করতে। এরই মধ্যে কয়েকটি ম্যাচও শেষ হয়েছে। আমার দল এমনিতে ধুঁকছে। আগে চাইবো পারফরম্যান্স দেখিয়ে দলকে রেলিগেশন থেকে সেভ করতে। তারপর চাইবো একের পর এক গোল করতে। যেন সবাই মনে রাখে।’
টানা দুই বিশ্বকাপে রাশিয়া নেই!
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে সামরিক আগ্রাসনের কারণে ফিফা ও উয়েফা রাশিয়াকে সব আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করেছে। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে কাতার ২০২২ বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ ইউরোসহ আসন্ন ২০২৬ বিশ্বকাপেও রাশিয়া অংশ নিতে পারেনি।ফুটবলের বড় মঞ্চে নিজের দেশ রাশিয়ার অনুপস্থিতি তাকে ব্যথিত করে। আক্ষেপ নিয়ে তারেক বলেছেন, ‘আমরা ফুটবল প্রিয় দেশ। টানা দুই বিশ্বকাপে না খেলতে পেরে আমরা ব্যথিত। বিশ্বকাপে রাশিয়ার না থাকাটা অনেক কষ্টের এটা বলে বোঝানো যাবে না। শুধু বিশ্বকাপ নয় আমাদের খেলোয়াড়রা ফিফার ক্লাব কাপেও খেলতে পারছে না। এই যেমন কনফারেন্স লিগে আগে খেললেও চার বছর ধরে এখন নেই।’
বাংলাদেশের চেয়ে ভারতের ফুটবল সুসংগঠিত
ভারতের আই লিগে রিয়েল কাশ্মিরের হয়ে খেলে ঢাকায় এসেছেন মারাত তারেক। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ ও ভারতের ফুটবলের মান বা পার্থক্য কেমন- তা নিয়ে। ভারতের দ্বিতীয় স্তরের লিগ খেলে তারেকের মনে হয়েছে বাংলাদেশের চেয়ে ওরা বেশ সুসংগঠিত। তারেকের মূল্যায়ন, ‘আমি ওখানে আই লিগে খেলেছি। ওদের মাঠ কিংবা আয়োজনে কোনও সমস্যা সেভাবে চোখে পড়েনি। সুসংগঠিত মনে হয়েছে। বাংলাদেশের শীর্ষ লিগ তুলনায় কিছুটা পিছিয়ে। সেটা মাঠ বা অন্য সব নিয়ে বলতে পারেন। তবে খেলার মানের দিক দিয়ে দুই দেশের তেমন পার্থক্য দেখছি না।’
ঢাকা ও মস্কোর জ্যাম একই!

ঢাকার জ্যাম দেখে মোটেও অবাক হননি তারেক। মস্কোতে নাকি এমন জ্যাম দেখে অভ্যস্ত তিনি। তা সেটা কেমন জানতে চাইলে তারেক বললেন, ‘মস্কোতে অফিস ছুটির সময় অনেক জ্যাম হয়। ঢাকাতেও একই অবস্থা। তবে এখানে একটু বেশি মনে হয়। এছাড়া গরমও বেশি। আর্দ্রতাও। খাওয়া-দাওয়া তেমন সমস্যা হচ্ছে না। চিকেন কিংবা হলদু রাইস (চাইনিজ) খাচ্ছি। অবসরে বিলিয়ার্ড খেলছি। ক্লাবেই সময় কাটে বেশ।’