কঠোর আইনের গ্যাঁড়াকলে অভিবাসীরা

ডেস্ক রিপোর্ট
  ০১ মে ২০২৬, ১১:৪২

যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্রেশন আইনে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। অ্যাসাইলাম, ডিপোর্টেশন, ভিসা, গ্রিনকার্ড এমন কি নাগরিকত্ব আইনে আনা হচ্ছে নতুন নতুন বিধি-নিষেধ। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী অভিবাসী এবং যারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসনের অপেক্ষায়, তারা এখন কঠোর আইনের গ্যাঁড়াকলে। এ নিয়ে অভিবাসী সমাজে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা।
সাধারণত যারা তাদের নিজ নিজ দেশে নিরাপদ নন বা জীবননাশের আশঙ্কার মধ্যে থাকেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রে অ্যাসাইলাম বা আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেন। যুক্তরাষ্ট্র সরকারও দীর্ঘকাল ধরে নিরাপত্তা ও জীবননাশের ঝুঁকির বিবেচনায় বিদেশিদের অ্যাসাইলাম দিয়ে আসছে। কিন্তু এ দীর্ঘদিনের প্রথা ও মানবিক নীতি উল্টে দিচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।
‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর এক বিশেষ রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যারা তাদের দেশে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে আছেন এমন ব্যক্তিরা যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর পুনরায় দেশে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে ভীত বোধ করেন যে দেশে ফিরে গেলে তারা পুনরায় নিপীড়নের শিকার হবে, এমনকি তাদেরকে হত্যা করা হতে পারে, এমন ব্যক্তিদের ভিসার আবেদন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট সম্প্রতি এ নতুন বিধিমালার কথা জানিয়েছে, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদনকে পদ্ধতিগতভাবে সীমিত করার একটি বড় পদক্ষেপ।
সম্প্রতি স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সকল দূতাবাস ও কনস্যুলেটে পাঠানো একটি অভ্যন্তরীণ নির্দেশনায় এ কঠোর নিয়ম কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে প্রতিটি নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা আবেদনকারীকে কনস্যুলার কর্মকর্তার মুখোমুখি হয়ে দুটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। প্রশ্নগুলো হলো- ‘আপনি কি আপনার নিজ দেশ বা বসবাসের সর্বশেষ স্থানে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অথবা নিপীড়নের শিকার হয়েছেন?’
এবং ‘আপনি কি আপনার নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার গেলে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বা নিপীড়িত হওয়ার আশঙ্কা করেন? নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার জন্য আবেদনকারীকে অবশ্যই এ দুটি প্রশ্নের উত্তরে মৌখিকভাবে ‘না’ বলতে হবে। কোনো আবেদনকারী যদি ‘হ্যাঁ’ উত্তর দেন কিংবা উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান, তাহলে তাকে কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণের নথিপত্র বা ভিসা প্রদান করা হবে না।
এ নতুন নীতি কেবল ভিসা প্রাপ্তিকে কঠিন করছে না, বরং যারা বর্তমানে ভিসা আবেদন করছেন তাদের জন্য আইনি ফাঁদও তৈরি করছে। নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনো আবেদনকারী যদি ভয় পাওয়ার বিষয়টি লুকিয়ে ভিসা পাওয়ার আশায় মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ‘না’ বলেন এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে অ্যাসাইলামের জন্য আবেদন করেন, তাহলে তাকে ‘ভিসা জালিয়াতি’র দায়ে অভিযুক্ত করা হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে তার ওপর স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা বা নির্বাসনের আইনি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের মতে, অনেক বিদেশি নাগরিক ভিসা আবেদনের সময় তাদের আশ্রয়ের উদ্দেশ্য গোপন করেন, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ পদক্ষেপটি হুট করে নেওয়া হয়নি। গত সপ্তাহে একটি আমেরিকান ফেডারেল আপিল আদালত ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘সীমান্তে অনুপ্রবেশ’ সংক্রান্ত ঘোষণাটিকে বেআইনি বলে রায় দিয়েছিল, যা কার্যত নিপীড়িত মানুষের জন্য আশ্রয়ের পথ পুনরায় উন্মুক্ত করার ইঙ্গিত দিচ্ছিল।আদালত আশ্রয়প্রার্থীদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার ওই সরকারি আদেশ আটকে দিলে ট্রাম্প প্রশাসন এখন কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে ভিসা নিয়ন্ত্রণ করে আশ্রয়ের পথ রুদ্ধ করার কৌশল নিয়েছে।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। ‘রিফিউজিস ইন্টারন্যাশনাল’-এর প্রেসিডেন্ট জেরেমি কোনিডিক এ নীতিকে নিপীড়িত মানুষের সুরক্ষার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ‘সম্পূর্ণ বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আপনি যখন কাউকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করছেন ‘‘আপনি কি নিপীড়িত?’’ এবং তারা ‘‘হ্যাঁ’’ বললে আপনি তাদের নিজ দেশে থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন, তখন বুঝতে হবে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর নিপীড়িতদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল নয়।’বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এ নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার ফলে জার্মানির নাৎসি আমলের ইহুদি, স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের সোভিয়েত ভিন্নমতাবলম্বী কিংবা ১৯৭০-এর দশকের ইরানি নাগরিকদের মতো মানুষরা আজকের দিনে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ পেতেন না।এ বিষয়ে স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, মার্কিন ভিসা কোনো মৌলিক অধিকার নয়, বরং এটি একটি বিশেষ সুবিধা। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, তাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই ট্রাম্প নির্বাহী আদেশ ১৪১৬১-এ কঠোর অভিবাসন স্ক্রিনিংয়ের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারই অংশ হিসেবে এর আগে ১২টি দেশের নাগরিকদের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ও নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকদের ওপর আংশিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ছাত্র ভিসা বা প্রযুক্তি কর্মীদের ক্ষেত্রেও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যাচাই-বাছাইসহ নানা কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে।এখন স্টেট ডিপার্টমেন্টের এই নতুন নীতি কার্যকর হওয়ায় বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার মানুষ, বিশেষ করে সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী, সংখ্যালঘু গোষ্ঠী এবং পারিবারিক নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভিন্ন দেশে নতুন জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখতেন।
যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব বাতিল ইস্যুতে নতুন বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব বাতিল বা ‘ডিন্যাচারালাইজেশন’ ইস্যুতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস (ডিওজে) সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে জন্ম নেওয়া এমন কিছু নাগরিককে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে নাগরিকত্ব বাতিলের মামলা করার প্রস্তুতি চলছে। নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে ৩৮৪ জনকে এই প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হতে পারে।
ধারণা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ শুরু হবে। আইন অনুযায়ী, কেউ যদি মিথ্যা তথ্য দিয়ে, জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে, ভুয়া বিবাহের মাধ্যমে অথবা গুরুতর অপরাধ গোপন রেখে নাগরিকত্ব অর্জন করে থাকেন, তাহলে আদালতের মাধ্যমে তার নাগরিকত্ব বাতিল করা যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার পর সংঘটিত গুরুতর অপরাধও এই প্রক্রিয়ার ভিত্তি হতে পারে।ডিওজে গত বছর একটি অভ্যন্তরীণ নির্দেশনায় এ ধরনের মামলার সংখ্যা বাড়ানোর ওপর জোর দেয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা প্রসিকিউটরদের এখন এসব মামলা সক্রিয়ভাবে অনুসরণ করতে বলা হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত প্রায় ১২০টি ডিন্যাচারালাইজেশন মামলা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। নতুন করে চিহ্নিত ৩৮৪ জনকে এই উদ্যোগের প্রথম ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।সাবেক ফেডারেল প্রসিকিউটর ফ্রান্সেস হেকস এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এই উদ্যোগের পেছনে নীতিগত অগ্রাধিকার রয়েছে।
তবে প্রশাসনের দাবি, এটি কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং বিদ্যমান ফেডারেল আইন বাস্তবায়নের অংশ।বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিকত্ব বাতিল একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া, যা সাধারণত খুব সীমিত ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হয়। তবে এর পরিসর বাড়ানো হলে তা অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। আইনগতভাবে, একজনের নাগরিকত্ব বাতিল হলে তিনি তার আগের অভিবাসন অবস্থায় ফিরে যান এবং পরবর্তীতে বহিষ্কারের মুখোমুখি হতে পারেন।
এছাড়া, এই ধরনের দেওয়ানি মামলায় ফৌজদারি মামলার মতো সরকার-নিযুক্ত আইনজীবী পাওয়ার সুযোগ থাকে না—যা নিয়ে অধিকারকর্মীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।সাম্প্রতিক কয়েকটি মামলায় দেখা গেছে, যৌন অপরাধ, ভুল তথ্য প্রদান এবং কর জালিয়াতির অভিযোগে নাগরিকত্ব বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।ইতিহাস বলছে, নাগরিকত্ব বাতিল নতুন কোনো বিষয় নয়।
২০শ শতাব্দীতে রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক এবং শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধেও এই আইন প্রয়োগ করা হয়েছিল। পরে সুপ্রিম কোর্টেরএকাধিক রায়ে এর ব্যবহার সীমিত করা হয়। পরবর্তীতে বারাক ওবামা প্রশাসনের সময় এই প্রক্রিয়া কিছুটা বাড়ে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তা আরও জোরালোভাবে প্রয়োগ করা হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই উদ্যোগ কতদূর বিস্তৃত হবে, তা এখনও অনিশ্চিত। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনের প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও সীমারেখা নিশ্চিত করা না হলে এটি বড় ধরনের নীতিগত বিতর্কে রূপ নিতে পারে।
এইচ-১বি ভিসায় বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব : নতুন বিলে বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি ভিসা নীতিতে বড়সড় পরিবর্তনের লক্ষ্যে নতুন একটি বিল পেশ হয়েছে কংগ্রেসে, যা ঘিরে শুরু হয়েছে তুমূল আলোচনা ও উদ্বেগ। ‘এন্ড এইচ-১বি ভিসা অ্যাবিউজ অ্যাক্ট অফ ২০২৬’ নামে প্রস্তাবিত এই বিলে সাময়িকভাবে তিন বছরের জন্য এইচ-১বি ভিসা প্রদান বন্ধ রাখা এবং বর্তমান লটারি পদ্ধতি বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। বিল অনুযায়ী, বর্তমানে বছরে ৬৫ হাজার ভিসা ইস্যুর সীমা কমিয়ে ২৫ হাজারে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
পাশাপাশি, আবেদনকারীদের জন্য ন্যূনতম বার্ষিক বেতন ২ লাখ ডলার নির্ধারণ, নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আনার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা এবং একাধিক চাকরিতে যুক্ত হওয়ার ওপর কড়াকড়ি আরোপের কথাও বলা হয়েছে। প্রস্তাবে আরো উল্লেখ রয়েছে, তৃতীয় পক্ষের স্টাফিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশি কর্মীদের নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে। একইসঙ্গে, বিদেশি কর্মী নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে লিখিতভাবে জানাতে হবে যে সমমানের দক্ষ কোনো মার্কিন নাগরিক পাওয়া যায়নি এবং নতুন নিয়োগের জন্য কাউকে ছাঁটাই করা হয়নি।
২০২৫ সালে কী বদল? : ১৯৯০ সাল থেকে শুরু হয়েছিল এই এইচ-১বি ভিসা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চাকরি করতে আসার প্রথা। প্রতি বছর গড়পড়তা ৮৫ হাজার ভিসা দেওয়া হতো।২০২৫ সালে যে নিয়মে অনেক বদল আনেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।তিনি যে সেদেশে ‘অভিবাসী’ চান না, তা চিরকালই ওপেন সিক্রেট রেখেছেন ডন। যে জন্য ২,৫০০ ডলার থেকে প্রথমে লাখ ডলারের ‘বোঝা’, তারপর সোশ্যাল মিডিয়া ওয়ালে নজরদারি— একের পর এক ‘ক্লজ’ চাপিয়ে ক্রমশ তিনি ভারতীয় তথা বিশ্ববাসীর এই ভিসা পাওয়ার পথে আরো কাঁটা বিছিয়ে দিয়েছেন তিনি। এতেই শেষ নয়, এর সঙ্গেই লেবার কন্ডিশন অ্যাপ্লিকেশান (এলসিএ) কস্ট-সহ সংশ্লিষ্ট অন্য খরচ চাপানো হয়েছে এইচ-১বি ভিসা অ্যাপ্লিকেশান এর জন্য।
এর আগেই ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিওরিটি (ডিএইচএস) কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতি প্রকাশ করে জানিয়েছেন, চিরাচরিত লটারি সিস্টেম-এ বদল আসতে চলেছে ২০২৭ সালের সিজন শুরু হওয়ার পর। যেখানে প্রস্তাবিত নিয়মে বলা হয়েছে, এতদিন যেখানে র‍্যানডম লটারির মাধ্যমে বেছে নেওয়া হতো যোগ্য প্রার্থী, সেখানে কার্যকর হতে চলেছে বিশেষ ‘ওয়েটেড সিলেকশন প্রসেস’। যেখানে শুধুমাত্র ভাগ্যের বদলে, মেধাকে প্রধান বিচার্য বিষয় হিসেবে ধরা হবে।
নতুন নিয়মে চারটি ক্যাটিগরি তৈরি করা হবে সরকার নির্ধারিত ওয়েজ টিয়ার-এর ভিত্তিতে। যে কর্মীকে তার মেধার ভিত্তিতে সর্বাধিক বেতন দিতে আগ্রহী মার্কিন সংস্থা কর্তৃপক্ষ, তাকে ‘লেভেল-৪’ এ রাখা হবে। এ ভাবে তার থেকে কম পে-প্যাকেজ এর কর্মীকে যথাক্রমে ৩-২-১ লেভেলে তালিকাভুক্ত করা হবে। ৪ লেভেলে থাকা সম্ভাব্য কর্মীর নাম যেখানে লটারিতে চার বারের জন্য ‘এনলিস্ট’ করা হবে, সেখানে ‘লেভেল-৩’ এর কর্মীকে ৩ বার, ২-এর কর্মীকে ২ বার— এভাবে তা কমতে থাকবে এবং স্বাভাবিক ভাবেই সংখ্যাতত্ত্বের নিয়ম মেনে চার বার তালিকাভুক্ত হওয়ার দরুণ, ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে সেই মেধাবী কর্মীর জন্য, যাকে সর্বাধিক বেতন দিতে আগ্রহী সংস্থা কর্তৃপক্ষ। এ ভাবে ‘সেরার সেরা’ মেধাকেই শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঠাঁই দিতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন।
কেন চিন্তায় ইউএস সংস্থাগুলো?কমার্স সেক্রেটারি হাওয়ার্ড লুটনিক বা হোয়াইট হাউস স্টাফ সেক্রেটারি উইল স্কার্ফ দাবি করেছেন, এইচ-১বি ভিসা দুর্নীতির আখড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার ফলে দেশের মাটিতেই চাকরি পাচ্ছিলেন না মার্কিন নাগরিকেরা। সেই প্রথা বন্ধ করার জন্যই এই পদক্ষেপ।
বিশ্বের সেরা একাধিক ইউনিভার্সিটি রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখান থেকে ফ্রেশ গ্র্যাজ়ুয়েট’দের নিয়োগ করা যেতেই পারে। যে সূত্র ধরেই ‘এন্ড এইচ-১বি ৃ.২০২৬’ বিলে দাবি করা হয়েছে, এই ভিসা দেওয়ার জন্য কর্মীর নাম প্রস্তাব করার আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে লিখিতভাবে জানাতে হবে, যে কর্তৃপক্ষ সমমানের শিক্ষিত কোনো মার্কিন কর্মী পাননি এবং এই নতুন বিদেশিকে রোস্টারে নেওয়ার জন্য কাউকে ছাঁটাইও করা হয়নি সংস্থা থেকে।বিশেষজ্ঞদের দাবি, নতুন নিয়মে ভিসা আবেদনে বহুগুণ বেশি টাকা খরচ সমস্যার একটা পার্ট।
দ্বিতীয় সমস্যা পে-প্যাকেজ সংক্রান্ত। আগে বিদেশ থেকে কর্মী আনলে যেখানে মাসে গড়ে ৪.৮৫ লাখ টাকা মাইনে দিলেই হতো, সেখানে মার্কিন শ্রম আইন মেনে বেতন দিতে গেলে অঙ্কটা বেশ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। ফলে বিষয়টা দোধারি তরোয়ালের মুখে পড়ার মতো অবস্থা হয়ে পড়েছে সংস্থাগুলোর জন্য।আরো সমস্যা রয়েছে। বিশ্বখ্যাত সব মার্কিন সংস্থাগুলোর কর্তৃপক্ষ ধরে ধরে ‘পিক অ্যান্ড চুজ়’ করে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে সেরা মাথাগুলো তুলে আনতেন। যারা সংস্থার শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে সাহায্য করতেন। এখন তাদের বাদ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকেই কর্মী নিতে হলে, মেধার প্রশ্নে আগামী দিনে কতটা কম্প্রোমাইজ় করতে হবে, আশঙ্কা থাকছে সেখানেও।
ভারতীয়রা চাপে কেন? খুবই সহজ। যে জন্য মার্কিন সংস্থাগুলো ‘উদ্বিগ্ন’, ঠিক সেই কারণেই চাপ বাড়ছে ভারতে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৫ সাল থেকে প্রতি বছরই বার্ষিক এইচ-১বি ভিসার কোটার ৭১ শতাংশ রয়েছে ভারতীয়দের দখলে। তাই কতটা কাটছাঁট হতে চলেছে, তা নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই রাতের ঘুম উড়ে গেছে সবারই।ট্রাম্পপন্থীদের দাবি, মেক আমেরিকা গ্রেট এগেন-এর যে স্লোগান তুলেছিলেন ট্রাম্প, এইচ-১বি ভিসা পথে সিঁদ কেটে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে অন্যতম প্রধান বাধা ভারতীয়রা। দলে দলে ভারতীয় প্রতি বছর মার্কিন মুলুকে আসায় নিজভূমে পরবাসী হয়ে চাকরি পাচ্ছেন না ইউএস সিটিজেনরাই।
‘অধিকতর নিরাপত্তা যাচাই’: আবেদন প্রক্রিয়া ধীর হতে পারে
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় নতুন করে কঠোর নিরাপত্তা যাচাই ব্যবস্থা চালু করেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন নির্দেশনায় অভিবাসন আবেদনকারীদের জন্য ‘এনহ্যান্সড’ বা উন্নত ব্যাকগ্রাউন্ড চেক বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যা ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে।
ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্র্যাশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস) জানিয়েছে, এখন থেকে সব ফিঙ্গারপ্রিন্টভিত্তিক আবেদন আরও বিস্তৃত ফেডারেল ডাটাবেজের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। এ প্রক্রিয়ায় ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)-এর নতুন প্রজন্মের আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ব্যবহার করে আবেদনকারীদের অপরাধ-ইতিহাসসহ বিভিন্ন তথ্য আরও গভীরভাবে সংগ্রহ করা হবে। নতুন নির্দেশনায় ইউএসসিআইএস কর্মকর্তাদের স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছেÑযেসব আবেদন নতুন নিরাপত্তা যাচাই সম্পন্ন হয়নি, সেগুলোর অনুমোদন দেওয়া যাবে না। ফলে গ্রিন কার্ড, স্থায়ী বসবাস এবং নাগরিকত্বের জন্য জমা থাকা বহু আবেদন সাময়িকভাবে স্থগিত বা ধীরগতির শিকার হতে পারে।
অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, ২৭ এপ্রিল থেকে এই ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে। ইতোমধ্যে জমা দেওয়া কিছু আবেদনের ক্ষেত্রেও পুনরায় আঙুলের ছাপ সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা আবেদনকারীদের জন্য অতিরিক্ত সময় ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা তৈরি করতে পারে। প্রশাসনের দাবি, এই পদক্ষেপ জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার এবং অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের বৃহত্তর কৌশলের অংশ। তবে মানবাধিকারকর্মী, নাগরিক অধিকার সংগঠন এবং ধর্মীয় নেতারা এই উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন।
তাদের মতে, এ ধরনের কঠোর যাচাই প্রক্রিয়া ন্যায্য বিচারপ্রাপ্তি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং সংখ্যালঘুদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে।ইউএসসিআইএস এক বিবৃতিতে বলেছে, নতুন নিরাপত্তা যাচাইয়ের কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাময়িক বিলম্ব হতে পারে, তবে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে তারা আশা করছে।