
যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, নেতৃত্বের দর্শন এবং নাগরিক অংশগ্রহণের চেতনাকে ধারণ করে নির্মিত বহুল প্রতীক্ষিত ওবামা প্রেসিডেনশিয়াল সেন্টারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে শিকাগোতে। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) শহরের ঐতিহাসিক সাউথ সাইডের জ্যাকসন পার্কে আয়োজিত বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদ্বোধন করা হয় এই বিশাল প্রকল্পের।
প্রায় এক দশকের পরিকল্পনা, নকশা প্রণয়ন, তহবিল সংগ্রহ, আইনি লড়াই এবং নির্মাণকাজ শেষে বাস্তবায়িত এই সেন্টারকে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও নাগরিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। শুক্রবার (১৯ জুন) থেকে এটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাবেক ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা, সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, বিল ক্লিনটন ও জর্জ ডব্লিউ. বুশ, বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের গভর্নর, কংগ্রেস সদস্য, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, শিল্পী এবং হাজারো আমন্ত্রিত অতিথি।
অনুষ্ঠানে আবেগঘন বক্তব্যে বারাক ওবামা বলেন, “এটি কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নয়, এটি একটি কর্মশালা। এখানে মানুষ নেতৃত্ব শিখবে, নতুন ধারণা তৈরি করবে এবং সমাজ পরিবর্তনের জন্য একসঙ্গে কাজ করবে।”
তিনি বলেন, “গণতন্ত্র কোনো দর্শক খেলা নয়। নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া গণতন্ত্র শক্তিশালী হতে পারে না। ওবামা প্রেসিডেনশিয়াল সেন্টার সেই অংশগ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে কাজ করবে।”
শুধু লাইব্রেরি নয়, নাগরিক নেতৃত্বের কেন্দ্র
ওবামা প্রেসিডেনশিয়াল সেন্টার প্রচলিত প্রেসিডেনশিয়াল লাইব্রেরির ধারণা থেকে অনেকটাই আলাদা। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য প্রেসিডেন্টদের লাইব্রেরি যেখানে মূলত নথিপত্র ও ঐতিহাসিক দলিল সংরক্ষণের কেন্দ্র, সেখানে ওবামা সেন্টারকে পরিকল্পনা করা হয়েছে একটি জীবন্ত নাগরিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে।
প্রায় ১৯ দশমিক ৩ একরজুড়ে বিস্তৃত ক্যাম্পাসে রয়েছে—
* অত্যাধুনিক প্রেসিডেনশিয়াল জাদুঘর
* ওবামা ফাউন্ডেশনের আন্তর্জাতিক সদর দপ্তর
* কমিউনিটি ও সিভিক এনগেজমেন্ট সেন্টার
* পারফর্মিং আর্টস ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের স্থান
* শিকাগো পাবলিক লাইব্রেরির শাখা
* শিশু ও তরুণদের শিক্ষামূলক কার্যক্রমের ব্যবস্থা
* উন্মুক্ত সবুজ পার্ক ও বিনোদন এলাকা
* সম্মেলন, গবেষণা ও নেতৃত্ব উন্নয়ন কেন্দ্র
প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
চারতলা জাদুঘরে ওবামার জীবন ও আমেরিকার ইতিহাস
সেন্টারের অন্যতম আকর্ষণ চারতলা বিশিষ্ট জাদুঘর। এখানে বারাক ও মিশেল ওবামার শৈশব, পারিবারিক জীবন, কমিউনিটি সংগঠক হিসেবে কাজ, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণা, হোয়াইট হাউসে আট বছরের শাসনকাল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমসাময়িক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি তুলে ধরা হয়েছে।
ইন্টারঅ্যাকটিভ ডিজিটাল প্রদর্শনী, ভার্চুয়াল অভিজ্ঞতা, মাল্টিমিডিয়া উপস্থাপনা এবং ডিজিটাল আর্কাইভের মাধ্যমে দর্শনার্থীরা ওবামা প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, বৈদেশিক নীতি, স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার, জলবায়ু উদ্যোগ এবং নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নানা দিক সম্পর্কে জানতে পারবেন।
এখানে ওবামার প্রেসিডেন্সির সময় ব্যবহৃত বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন, ব্যক্তিগত স্মারক, বক্তৃতার খসড়া এবং নির্বাচনী প্রচারণার সামগ্রীও সংরক্ষণ করা হয়েছে।
শিকাগোর সঙ্গে ওবামার আত্মিক সম্পর্ক
ওবামা প্রেসিডেনশিয়াল সেন্টারের জন্য শিকাগোর সাউথ সাইডকে বেছে নেওয়ার পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ইতিহাস।
১৯৮০-এর দশকে কমিউনিটি সংগঠক হিসেবে ওবামার রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সূচনা হয় এই এলাকায়। এখানেই তিনি স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কাজ করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নাগরিক অধিকার নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন।
অন্যদিকে, মিশেল ওবামার শৈশব ও বেড়ে ওঠাও এই অঞ্চলে। ফলে সাউথ সাইডের মানুষের সঙ্গে ওবামা পরিবারের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক এই প্রকল্পকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি
বিশ্লেষকদের মতে, ওবামা প্রেসিডেনশিয়াল সেন্টার কেবল একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়; এটি শিকাগোর দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের একটি বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
প্রকল্পটির নির্মাণকাজে কয়েক হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। আগামী বছরগুলোতে পর্যটন, হোটেল, রেস্টুরেন্ট, খুচরা ব্যবসা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রসারের মাধ্যমে আরও হাজারো নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শিকাগো সিটি প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর লাখ লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটক এই সেন্টার পরিদর্শনে আসবেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।
নাগরিক সম্পৃক্ততার নতুন বার্তা
রাজনৈতিক বিভাজন, সামাজিক মেরুকরণ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থাহীনতার বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ওবামা প্রেসিডেনশিয়াল সেন্টারকে অনেকেই একটি প্রতীকী উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একজন সাবেক প্রেসিডেন্টের উত্তরাধিকার সংরক্ষণের প্রকল্প নয়; বরং নাগরিক অংশগ্রহণ, তরুণ নেতৃত্ব গড়ে তোলা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ শক্তিশালী করার একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
ওবামা ফাউন্ডেশনের ভাষায়, “এই সেন্টার অতীতকে স্মরণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে।”
শুক্রবার ১৯ জুন থেকে দর্শনার্থীদের জন্য দরজা খুলে যাচ্ছে এই সেন্টারের। উদ্বোধনী সপ্তাহ উপলক্ষে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নেতৃত্ব উন্নয়ন কর্মশালা, বিশেষ প্রদর্শনী এবং তরুণদের অংশগ্রহণমূলক বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ওবামা প্রেসিডেনশিয়াল সেন্টার আগামী দশকগুলোতে শুধু শিকাগোর নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও গণতান্ত্রিক চর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।