
জুনটিন্থ উপলক্ষে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানী একটি বিশেষ স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ করেছেন, যেখানে প্রখ্যাত শিল্পী ড. লোরেনজো পেস -এর জীবন, শিল্পকর্ম এবং কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের ইতিহাসের প্রতি তাঁর অবদানের কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রামাণ্যচিত্রটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফোলি স্কয়ারে স্থাপিত তাঁর বিখ্যাত ভাস্কর্য মানবিক চেতনার জয়, যা কৃষ্ণাঙ্গ নিউইয়র্কবাসীদের সংগ্রাম, স্থিতিস্থাপকতা এবং উত্তরাধিকারের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৯ জুন প্রামাণ্যচিত্রে ড. পেস তাঁর পারিবারিক ইতিহাস, দাসপ্রথার নির্মম বাস্তবতা এবং শিল্পের মাধ্যমে ইতিহাস সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে আবেগঘন স্মৃতিচারণ করেন। তিনি একটি লোহার তালার কথা উল্লেখ করেন, যা তাঁর প্রপিতামহ স্টিভ পেসকে আলাবামায় দাসত্বের সময় শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখতে ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই তালাকেই তিনি তাঁর আমেরিকান ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেন।
ড. পেস বলেন, শিল্প কেবল সৌন্দর্যের প্রকাশ নয়; এটি মানুষের ইতিহাস ও মানবতার দলিল। শিল্পীদের কারণেই আমরা হাজার বছর আগের মিশরীয়, গ্রিক কিংবা রেনেসাঁ যুগের ইতিহাস জানতে পারি। তাঁর মতে, কৃষ্ণাঙ্গদের ইতিহাসও শিল্পের মাধ্যমে সংরক্ষিত হওয়া জরুরি।
আফ্রিকান বুরিয়াল গ্রাউন্ডের ইতিহাস-প্রামাণ্যচিত্রে ১৯৯১ সালে আবিষ্কৃত ঐতিহাসিক আফ্রিকান ব্রুরাইল গ্রাউন্ড -এর ইতিহাসও তুলে ধরা হয়েছে। ম্যানহাটনের এই স্থানে ১৬৩০ থেকে ১৭৯৫ সালের মধ্যে সমাহিত চার শতাধিক আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষের দেহাবশেষ পাওয়া যায়। এটি উত্তর আমেরিকায় মুক্ত ও দাসত্বে আবদ্ধ আফ্রিকানদের সবচেয়ে বড় এবং প্রাচীন খননকৃত সমাধিক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত।
এই আবিষ্কার নিউইয়র্কের ইতিহাস সম্পর্কে নতুন উপলব্ধির জন্ম দেয় এবং শহর নির্মাণে দাসত্বে আবদ্ধ আফ্রিকানদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে সামনে নিয়ে আসে। পরবর্তীতে সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যাতে সমাহিত ব্যক্তিদের স্মৃতি সংরক্ষিত থাকে।
চার শতাধিক শিল্পীর মধ্যে নির্বাচিত হন ড. পেস-নিউইয়র্ক সিটির সাংস্কৃতিক বিষয়ক দপ্তরের পারসেন্ট ফর দ্য আর্ট কর্মসূচির আওতায় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য শিল্পীদের কাছ থেকে নকশা আহ্বান করা হয়। চার শতাধিক শিল্পীর প্রস্তাবের মধ্য থেকে চূড়ান্তভাবে ড. লরেঞ্জো পেস নির্বাচিত হন।
ভাস্কর্যটির নকশা তৈরির সময় তিনি পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ব্যবহৃত চিওয়ারা নামের এক প্রতীকী হরিণাকৃতির অবয়ব থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করেন। তাঁর নির্মিত ভাস্কর্যে একটি চিওয়ারা পানির মধ্যে ভাসমান নৌকার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। নৌকাটি আফ্রিকানদের নিউইয়র্কে আগমন, অভিবাসন এবং দাসপ্রথার ইতিহাসের প্রতীক।
প্রায় পাঁচতলা সমান উচ্চতার এবং ৩০০ টন ওজনের এই বিশাল ভাস্কর্যটি আজ নিউইয়র্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনশিল্পকর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়।
নিউইয়র্কের ইতিহাস কৃষ্ণাঙ্গদের ইতিহাস ছাড়া অসম্পূর্ণ-মেয়র মামদানি তাঁর বক্তব্যে বলেন, জুনটিন্থে আমরা শুধু দাসপ্রথার অবসানই স্মরণ করি না, আমরা সেই সব কৃষ্ণাঙ্গ নিউইয়র্কবাসীকেও সম্মান জানাই, যারা স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছেন, এই শহর গড়ে তুলেছেন এবং গণতন্ত্রকে আরও বিস্তৃত করেছেন। ড. পেসের শিল্পকর্ম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার সবার জন্য নিশ্চিত করার কাজ এখনও সম্পূর্ণ হয়নি।
তিনি আরও বলেন, ফোলি স্কয়ারে স্থাপিত মানবিক চেতনার জয়- (ট্রিয়ুমপা অব দ্য হিউম্যান স্প্রিরিট) আজ এমন একটি প্রতীকী স্থান হয়ে উঠেছে, যেখানে মানুষ একটি আরও ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে একত্রিত হয়।
ড. পেস তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, এই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের অভিজ্ঞতা তাঁকে শিল্পচর্চার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর অনুপ্রেরণা দিয়েছে। তাঁর বিশ্বাস, পূর্বপুরুষদের আত্মিক আশীর্বাদই তাঁকে এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ করে দিয়েছে।
জুনটিন্থ উপলক্ষে প্রকাশিত এই প্রামাণ্যচিত্রটি নিউইয়র্কের কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, সংগ্রাম ও অবদানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন এবং নতুন প্রজন্মের কাছে সেই ইতিহাস তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।