লেবার ডে উইকেন্ডে নিউইয়র্কবাসীর নিরাপত্তায় বিশেষ সতর্কতা

ডেস্ক রিপোর্ট
  ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:২০

৭ সেপ্টেম্বর সোমবার যুক্তরাষ্ট্রে উদযাপিত হবে লেবার ডে। সরকারি ছুটির এই দিনকে কেন্দ্র করে টানা তিন দিনের ছুটিতে পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে ভ্রমণ, সৈকত, পার্ক, সুইমিং পুল কিংবা বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন নিউইয়র্কবাসীর অনেকে। কেউ কেউ যাচ্ছেন অন্য স্টেটে, আবার কেউ দেশের বাইরেও ভ্রমণের পরিকল্পনা করেছেন। শুক্রবার থেকেই শুরু হচ্ছে অনেকের ছুটি।
অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবারের লেবার ডে উইকেন্ডে বাইরে বের হওয়ার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। তবে ছুটির আনন্দ যেন দুর্ঘটনা কিংবা বিপদের কারণে বিষাদে পরিণত না হয়, সে জন্য নিউইয়র্কবাসীকে বিশেষ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে নিউইয়র্ক স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব স্টেটের ডিভিশন অব কনজিউমার প্রোটেকশন।
৩ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক সতর্কবার্তায় সংস্থাটি গ্রিল ব্যবহার, পানিতে নিরাপত্তা এবং সাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে। পাশাপাশি পরিবার নিয়ে বাইরে যাওয়ার সময় শিশুদের প্রতি বাড়তি নজর রাখারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
লেবার ডে গ্রীষ্মের অনানুষ্ঠানিক সমাপ্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। এ সময় পরিবার ও বন্ধুবান্ধব একত্রিত হয়ে বারবিকিউ, সাঁতার, সৈকত ভ্রমণ, পার্কে ঘোরাঘুরি ও সাইকেল চালানোর মতো বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। কিন্তু সামান্য অসতর্কতাও এসব আনন্দের আয়োজনকে দুর্ঘটনায় পরিণত করতে পারে।
নিউইয়র্কের সেক্রেটারি অব স্টেট ওয়াল্টার টি. মোসলি বলেন, গ্রীষ্মের শেষ উষ্ণ দিনগুলো উপভোগ করতে নিউইয়র্কবাসী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করলেও প্রয়োজনীয় সতর্কতা না নিলে তারা দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। সাঁতার, গ্রিল ব্যবহার কিংবা সাইকেল চালানো—যে কাজই করা হোক না কেন, নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
স্টেট হেলথ কমিশনার ডা. জেমস ম্যাকডোনাল্ড বলেন, লেবার ডে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ করার সময়, প্রতিরোধযোগ্য দুর্ঘটনার কারণে হাসপাতালে যাওয়ার সময় নয়। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে ছুটির এই সময়ে সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা ও গ্রিল ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
গ্রিল ব্যবহারে বাড়তি সতর্কতা
ন্যাশনাল ফায়ার প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, গ্রিল-সংক্রান্ত দুর্ঘটনায় প্রতি বছর গড়ে ২১ হাজার ৬৮২ জন জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিতে যান। তাই গ্রিল ব্যবহারের আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গ্রিল জ্বালানোর আগে সেটি ভালোভাবে পরীক্ষা করতে হবে এবং গ্রিলের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র কাছাকাছি ও সহজে পাওয়া যায় এমন স্থানে রাখতে হবে।
গ্যাস গ্রিলের হোসে ফাটল, শক্ত হয়ে যাওয়া, ছিদ্র কিংবা গ্যাস লিক রয়েছে কি না পরীক্ষা করতে হবে। সব সংযোগ সঠিকভাবে লাগানো আছে কি না নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে গ্রিল ব্যবহারের আগে তা পরিবর্তন করতে হবে।
প্রোপেন গ্যাস লিক হলে গন্ধ, হিসহিস শব্দ কিংবা ট্যাংকের আশপাশে শুকিয়ে যাওয়া ঘাসের মতো লক্ষণ দেখা যেতে পারে। তবে সব ধরনের গ্যাস লিক সহজে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। লিকের সন্দেহ হলে নিজে পরীক্ষা বা মেরামত করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করলে মূল গ্যাস ভালভ বন্ধ করে যোগ্য পেশাদারের মাধ্যমে গ্রিল পরীক্ষা ও মেরামত করাতে হবে।
গ্রিল নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে এবং গ্রিজ ট্র্যাপও পরিষ্কার রাখতে হবে। এতে আগুন হঠাৎ ছড়িয়ে পড়া কিংবা গ্রিজে আগুন লাগার ঝুঁকি কমে। গ্রিল অবশ্যই সমতল ও স্থিতিশীল স্থানে রাখতে হবে।
গ্যাস গ্রিল জ্বালানোর সময় ঢাকনা খোলা রাখতে হবে, যাতে অতিরিক্ত গ্যাস বের হয়ে যেতে পারে এবং দাহ্য গ্যাস জমে বিস্ফোরণ বা আগুনের ঝুঁকি তৈরি না হয়।
চারকোল গ্রিল ব্যবহারের ক্ষেত্রে চারকোল চিমনি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ পদ্ধতি। কোনো অবস্থাতেই ঘরের ভেতর, গ্যারেজ, কারপোর্ট, বারান্দা, বাড়ির খুব কাছে কিংবা দাহ্য কোনো কাঠামোর নিচে গ্রিল ব্যবহার করা যাবে না।
গ্রিল জ্বালানোর পর সেটি কখনোই একা রেখে যাওয়া উচিত নয়। আগুন হঠাৎ বেড়ে গেলে নিরাপদভাবে সম্ভব হলে ঢাকনা বন্ধ করে অক্সিজেনের প্রবাহ কমাতে হবে এবং গ্যাসের সংযোগ বন্ধ করতে হবে। গ্রিজে আগুন লাগলে কোনো অবস্থাতেই পানি ব্যবহার করা যাবে না। নিরাপদ হলে বেকিং সোডা বা উপযুক্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র ব্যবহার করতে হবে। আগুন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে ৯১১ নম্বরে ফোন করতে হবে।
শিশুদের সবসময় গ্রিল এলাকা থেকে দূরে রাখতে হবে। কারণ গ্রিলের বাইরের অংশও অত্যন্ত গরম হয়ে গুরুতর দগ্ধ হওয়ার কারণ হতে পারে।
প্রোপেন ট্যাংক সংরক্ষণেও সতর্কতা
প্রোপেন ট্যাংক সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। চারকোল ব্যবহারের পরপরই গ্রিল ঘরের ভেতরে নেওয়া যাবে না। কয়লা সম্পূর্ণ নিভে যাওয়া পর্যন্ত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস তৈরি হতে পারে।
তরল প্রোপেন বা এলপি গ্যাসের ট্যাংক সবসময় সোজা অবস্থায় রাখতে হবে। অতিরিক্ত গ্যাসের ট্যাংক গ্রিলের নিচে বা একেবারে কাছে রাখা উচিত নয়। পূর্ণ ট্যাংক ঘরের ভেতরেও সংরক্ষণ করা যাবে না।
গাড়িতে প্রোপেন ট্যাংক পরিবহনের সময় সেটিকে নিরাপদ ও সোজা অবস্থায় রাখতে হবে। পূর্ণ ট্যাংক কখনোই গরম গাড়ি কিংবা ট্রাঙ্কে রেখে দেওয়া যাবে না। অতিরিক্ত তাপে ট্যাংকের ভেতরের গ্যাসের চাপ বেড়ে গিয়ে গ্যাস বের হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
পানিতে নিরাপত্তায় শিশুদের প্রতি বাড়তি নজর
লেবার ডে উইকেন্ডে গরম আবহাওয়ার শেষ সময়টুকু উপভোগ করতে অনেক নিউইয়র্কবাসী সমুদ্রসৈকত, লেক, নদী ও সুইমিং পুলে যান। ফলে এ সময় পানিতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর গড়ে ৪ হাজার ৮৩টি অনিচ্ছাকৃত ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
শিশুদের পানির আশপাশে কখনো একা রাখা যাবে না। সবসময় একজন প্রাপ্তবয়স্ককে ‘ওয়াটার ওয়াচার’ হিসেবে দায়িত্ব দিতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে মোবাইলে টেক্সট করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, বই পড়া, মদ্যপান কিংবা অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত থাকা যাবে না। কয়েক মিনিটের নজরদারির ঘাটতিও মারাত্মক দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
লাইফগার্ড থাকলেও অভিভাবকের সরাসরি নজরদারির বিকল্প নেই।
সাঁতার না জানা শিশু, ৪৮ ইঞ্চির কম উচ্চতার শিশু এবং দুর্বল সাঁতারুদের উপযুক্ত লাইফ জ্যাকেট পরানো উচিত। শুধু ওয়াটার উইং বা বাতাসভরা ভাসমান খেলনাকে লাইফ জ্যাকেটের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
শিশুর সাঁতারের পোশাকের রঙও গুরুত্বপূর্ণ। পানিতে সহজে শনাক্ত করার জন্য উজ্জ্বল রঙের পোশাক ব্যবহার করা ভালো। বিশেষ করে হালকা রঙের তলার অংশের পুলে নিয়ন গোলাপি বা নিয়ন কমলা রঙের পোশাক বেশি দৃশ্যমান হতে পারে।
ছোট শিশুদের অগভীর পানির নির্ধারিত খেলার এলাকায় রাখা নিরাপদ। লাইফগার্ড ও পার্কের কর্মীদের নির্দেশনা সবসময় মেনে চলতে হবে।
কেউ পানিতে বিপদে পড়লে সে সবসময় চিৎকার করবে বা হাত নাড়বে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারও মাথা নিচু হয়ে থাকা, মুখ পানিতে ডুবে থাকা, চোখ বন্ধ থাকা, পা সোজা নিচের দিকে থাকা কিংবা সাঁতার কাটার চেষ্টা করেও সামনে এগোতে না পারার মতো লক্ষণ দেখা গেলে দ্রুত লাইফগার্ডকে জানাতে হবে।
সাইকেল চালানোর সময় হেলমেট বাধ্যতামূলক সতর্কতা
লেবার ডে উইকেন্ডে সাইকেল চালানোর সময়ও নিরাপত্তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইনস্যুরেন্স ইনস্টিটিউট ফর হাইওয়ে সেফটির তথ্য অনুযায়ী, মোটরযান দুর্ঘটনায় প্রতি বছর মৃত্যুর প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশই সাইকেল আরোহী। শিশু সাইকেল আরোহীদের মৃত্যুর হার দীর্ঘমেয়াদে কমলেও ২০ বছর বা তার বেশি বয়সী সাইকেল আরোহীদের মৃত্যুর সংখ্যা ১৯৭৫ সালের তুলনায় প্রায় পাঁচগুণ বেড়েছে।
সাইকেল চালানোর সময় অবশ্যই উপযুক্ত হেলমেট ব্যবহার করতে হবে। হেলমেট মাথায় আরামদায়ক হলেও শক্তভাবে বসতে হবে। চিবুকের স্ট্র্যাপ সঠিকভাবে বাঁধা এবং সমতল অবস্থায় থাকতে হবে। হেলমেট কপালের ওপর সমতলভাবে পরতে হবে; পেছনের দিকে হেলিয়ে রাখা যাবে না।
হেলমেট কেনার সময় যুক্তরাষ্ট্রের কনজিউমার প্রোডাক্ট সেফটি কমিশনের সাইকেল হেলমেট নিরাপত্তা মান পূরণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। হেলমেটে প্রস্তুতকারকের অনুমোদন ছাড়া স্টিকার, কভার কিংবা অতিরিক্ত কোনো জিনিস লাগানো উচিত নয়। এগুলো হেলমেটের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে কিংবা ক্ষতি আড়াল করতে পারে।
দুর্ঘটনার সময় আঘাত শোষণ করা হেলমেট দেখতে ভালো থাকলেও তা পুনরায় ব্যবহার করা উচিত নয়। সামান্য বা অদৃশ্য ক্ষতিও হেলমেটের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। হেলমেটে ফাটল, ক্ষয় বা দৃশ্যমান কোনো ক্ষতি দেখা গেলে সেটি পরিবর্তন করতে হবে। প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরও নতুন হেলমেট ব্যবহার করা উচিত।
ট্রাফিক আইন মেনে চলার আহ্বান
সাইকেল চালানোর সময় ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে। সাইকেল আরোহীদের মোটরযান চালকদের মতোই সড়কের নিয়ম ও দায়িত্ব মেনে চলা জরুরি। সাইকেল চালানোর সময় ট্রাফিকের একই দিকে চলতে হবে। অন্যদিকে পথচারীদের ট্রাফিকের বিপরীত দিকে হাঁটার পরামর্শ দেওয়া হয়।
সম্ভব হলে ব্যস্ত সড়ক এড়িয়ে নির্ধারিত সাইকেলপথ, পার্ক কিংবা ট্রেইল ব্যবহার করা উচিত। গাড়িচালক, সাইকেল আরোহী ও পথচারী—সবাইকে পরস্পরের প্রতি সতর্ক ও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
নিউইয়র্ক স্টেট ডিপার্টমেন্ট অব স্টেটের ডিভিশন অব কনজিউমার প্রোটেকশন নিউইয়র্কবাসীকে মনে করিয়ে দিয়েছে, লেবার ডে উইকেন্ডের আনন্দ যেন কোনো প্রতিরোধযোগ্য দুর্ঘটনার কারণে বিষাদে পরিণত না হয়। পরিবার নিয়ে গ্রিল, সাঁতার কিংবা সাইকেল চালানোর আগে কয়েকটি মৌলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করলেই ছুটির দিনগুলো আরও নিরাপদ ও আনন্দময় করে তোলা সম্ভব।