
নিচে ছুটবে ট্রেন, আর তার ওপর গড়ে উঠবে নতুন জনপদ— ১২ হাজার সাশ্রয়ী আবাসন, স্কুল, পার্ক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র। তৈরি হতে পারে প্রায় ৩০ হাজার কর্মসংস্থান। কুইন্সের বিশাল সানিসাইড রেলইয়ার্ডের ওপর এমন একটি নতুন নগর গড়ে তুলতে চান নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি। কিন্তু প্রায় শত বছর ধরে আলোচনায় থাকা এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের বড় চাবিকাঠি এখন ওয়াশিংটনের হাতে। প্রয়োজন ২১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ফেডারেল সহায়তা এবং একাধিক কেন্দ্রীয় অনুমোদন। সেই সহযোগিতা পেতেই ২১ সেপ্টেম্বর সোমবার গ্রেসি ম্যানশনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে আবারও প্রকল্পটি তুলে ধরেছেন মামদানি। অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি মেলেনি, তবে দুই প্রশাসন আলোচনা আরও এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে নিউইয়র্কে থাকা ট্রাম্প সোমবার মেয়রের সরকারি বাসভবনে মামদানির সঙ্গে বৈঠক করেন। রাজনৈতিক ও নীতিগতভাবে দুই নেতার অবস্থানে বড় পার্থক্য থাকলেও নিউইয়র্কের আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সহযোগিতার ক্ষেত্র খোঁজার বিষয়টি বৈঠকে গুরুত্ব পায়।
পশ্চিম কুইন্সের প্রায় ১৮০ একর সানিসাইড রেলইয়ার্ড কোনো খালি জমি নয়। এর ওপর দিয়ে অ্যামট্র্যাক, লং আইল্যান্ড রেল রোড ও নিউ জার্সি ট্রানজিটের ট্রেন চলাচল করে। পরিকল্পনা হলো ট্রেন চলাচল সচল রেখেই রেলইয়ার্ডের বড় অংশের ওপর বিশাল ডেক নির্মাণ করা। সেই ডেক কার্যত নতুন জমিতে পরিণত হবে, যেখানে ধাপে ধাপে গড়ে উঠবে আবাসন ও নাগরিক অবকাঠামো।
মামদানি প্রশাসনের পরিকল্পনায় এখানে ১২ হাজার সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণের কথা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ হাজার হবে মিশ্র-আয়ের আবাসন। পাশাপাশি স্কুল, পার্ক, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। সিটি হলের হিসাবে, প্রকল্পটি প্রায় ৩০ হাজার ইউনিয়নভুক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে।
প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থায়ন। সক্রিয় রেললাইনের ওপর বিশাল প্ল্যাটফর্ম নির্মাণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং প্রকৌশলগতভাবে জটিল। গত ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকেও মামদানি প্রকল্পটির জন্য ২১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ফেডারেল সহায়তা চেয়েছিলেন। সিটি হলের হিসাবে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে নিউইয়র্কের অন্যতম বৃহৎ আবাসন ও অবকাঠামো বিনিয়োগে পরিণত হতে পারে।
সোমবারের বৈঠকে ট্রাম্প কোনো অর্থায়নের ঘোষণা দেননি। তবে প্রকল্পটির সম্ভাবনাও নাকচ করেননি। সানিসাইডকে নিজের পরিচিত এলাকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রেলইয়ার্ডটির উন্নয়ন নিয়ে প্রায় ৫০ বছর ধরে আলোচনা চলছে। এবার হয়তো পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বৈঠকের পর মামদানি জানান, সিটি হলের আবাসন ও পরিচালন দল এবং হোয়াইট হাউসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন পর্যায়ের আলোচনা শুরু হবে। তবে প্রকল্পটি বাস্তবে রূপ দিতে এখনো ‘অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে’ বলেও স্বীকার করেন তিনি।
সানিসাইড নিয়ে এমন উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা অবশ্য নতুন নয়। ১৯১০ সালে রেলইয়ার্ডটি চালুর পর বিভিন্ন সময়ে সেখানে আবাসন, ট্রানজিট টার্মিনাল, কনভেনশন সেন্টার ও স্টেডিয়াম নির্মাণের ধারণা সামনে এসেছে। ১৯৮৪ সালে ট্রাম্প নিজেও সেখানে একটি ফুটবল স্টেডিয়াম নির্মাণের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেছিলেন। ২০২০ সালে প্রকাশিত হয় সানিসাইড ইয়ার্ড মাস্টার প্ল্যান।
এবার নিউইয়র্কের তীব্র আবাসন সংকট মোকাবিলাকে সামনে রেখে মামদানি সেই পুরোনো পরিকল্পনাকে নতুন করে এগিয়ে নিতে চাইছেন। তাঁর প্রশাসনের বৃহত্তর পরিকল্পনায় আগামী এক দশকে দুই লাখ নতুন সাশ্রয়ী আবাসন তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।
প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ১২ হাজার ৪৯১টি সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ বা সংরক্ষণের অর্থায়ন করা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে সাশ্রয়ী আবাসনে ২২ বিলিয়ন ডলারের মূলধনী বিনিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে সানিসাইডের চ্যালেঞ্জ অন্য মাত্রার। নিউইয়র্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেল অবকাঠামো সচল রেখেই তার ওপর নতুন ভূমি তৈরি করতে হবে। এর সঙ্গে রয়েছে ফেডারেল ও স্থানীয় অনুমোদন, পরিবেশগত পর্যালোচনা, প্রকৌশল নকশা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রশ্ন। এসব জটিলতার কারণেই বহু দশক ধরে পরিকল্পনায় থাকলেও প্রকল্পটি নির্মাণপর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
সোমবারের ট্রাম্প-মামদানি বৈঠক কোনো চূড়ান্ত চুক্তি এনে দেয়নি। তবে দীর্ঘদিন নকশা ও আলোচনায় আটকে থাকা সানিসাইড প্রকল্পকে আবার সিটি হল ও হোয়াইট হাউসের যৌথ আলোচনার টেবিলে নিয়ে এসেছে।