
ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ভবনের ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিতর্কিত ভাস্কর্য। ৮ দশমিক ৫ ফুট উঁচু এই ভাস্কর্যটি ২৩ ক্যারেট স্বর্ণপাত দিয়ে আচ্ছাদিত এবং এতে ট্রাম্পকে নগ্ন অবস্থায় উপস্থাপন করা হয়েছে। ভাস্কর্যটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘দ্য অরেঞ্জ প্লেগ’, আর এটি ‘কিং অব ইনজাস্টিস’ বা ‘অন্যায়ের রাজা’ নামেও পরিচিত। খবর সিএনএন এর।
ভাস্কর্যটির নির্মাতা ডেনিশ শিল্পী জেন্স গালশিয়ট। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) এটি উন্মোচনের পর তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প সোনা পছন্দ করেন। এক অর্থে আমি মনে করি, এই ভাস্কর্যটি তার ভালোই লাগবে।’
তামার তৈরি ভাস্কর্যটিতে ট্রাম্পকে এক দুর্বল ও ক্লান্ত মানুষের কাঁধের ওপর বসে থাকতে দেখা যায়। তার উরু ও ঝুলে পড়া পেট সেই ব্যক্তির মাথা ঘিরে রয়েছে। এক হাতে তিনি একটি লম্বা গলফ ক্লাব এবং অন্য হাতে ন্যায়বিচারের প্রতীক দাঁড়িপাল্লা ধরে আছেন।
ভাস্কর্যের বেদিতে লেখা রয়েছে, ‘আমি একজন মানুষের পিঠে বসে আছি। সে আমার বোঝায় ডুবে যাচ্ছে। তাকে সাহায্য করার জন্য আমি সবকিছু করব—শুধু তার পিঠ থেকে নেমে আসা ছাড়া।’
শিল্পী গালশিয়টের ভাষ্য অনুযায়ী, এই শিল্পকর্মের মাধ্যমে তিনি পরিবেশ ও আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার প্রতি ট্রাম্পের নীতিকে সমালোচনার মুখে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প আমার বিশ্বাসের অনেক বিষয়কে ধ্বংস করছেন।’
তবে এই প্রদর্শনীকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এটি স্পন্সর করেছেন ডেনমার্কের রাজনীতিক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য পের ক্লাউসেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নিয়ম অনুযায়ী, সদস্যরা নির্ধারিত স্থানে প্রদর্শনী আয়োজন করতে পারেন, যদিও সব প্রদর্শনী অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মতি প্রয়োজন হয়।
পার্লামেন্টের বিধিমালায় এমন কোনো প্রদর্শনী অনুমোদন করা হয় না, যা উসকানিমূলক, আপত্তিকর বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মৌলিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। তবে অনুমোদন দেওয়া মানেই প্রদর্শনীর বিষয়বস্তুর প্রতি পার্লামেন্টের আনুষ্ঠানিক সমর্থন নয়।
তবুও গালশিয়ট মনে করেন, এই অনুমোদন ইউরোপীয় আইনপ্রণেতাদের এক ধরনের নীরব সমর্থনের ইঙ্গিত বহন করে। তার মতে, অনেক আমেরিকান যেমন ট্রাম্পকে একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ও হাস্যকর একটি চরিত্র হিসেবে দেখেন, তেমনি অধিকাংশ ইউরোপীয়ও তাকে সেভাবেই দেখেন।
রাজনৈতিক বার্তাধর্মী শিল্পকর্মের জন্য পরিচিত গালশিয়ট এর আগেও ‘পিলার অব শেম’ নামে তিয়েনআনমেন স্কয়ার হত্যাকাণ্ডের শিকারদের স্মরণে একটি স্মারক নির্মাণ করেছিলেন, যা ২০২১ সালে হংকংয়ের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ট্রাম্পকে নগ্নভাবে উপস্থাপনের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি ডেনিশ লেখক হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের বিখ্যাত গল্প ‘দ্য এম্পেররস নিউ ক্লোদস’-এর প্রতি ইঙ্গিত। গল্পটিতে এক আত্মমুগ্ধ সম্রাটকে নগ্ন অবস্থায় শোভাযাত্রা করতে দেখা যায়। গালশিয়টের ভাষায়, ‘স্বৈরশাসকেরা নিজেদের নিয়ে মানুষকে হাসতে দেখতে পছন্দ করেন না।’
বর্তমান প্রদর্শনীটি বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলবে বলে জানা গেছে। এর সঙ্গে এক হাজারের বেশি থ্রিডি-প্রিন্ট করা ক্ষুদ্র সংস্করণও প্রদর্শন করা হচ্ছে, যা দর্শনার্থীদের মধ্যে ‘প্রতিবাদী প্রতীক’ হিসেবে বিতরণ করা হচ্ছে।
প্রদর্শনীর উদ্যোক্তা পের ক্লাউসেন ডেনমার্কের সমাজতান্ত্রিক রেড-গ্রিন অ্যালায়েন্স দলের সদস্য। তিনি বলেন, ‘বিশ্বে ক্ষমতা কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। ট্রাম্প যেভাবে আচরণ করছেন, তা ইউরোপের মানুষের জন্য বড় একটি সমস্যা। আমি চাই ইউরোপে এ বিষয়ে আরও আলোচনা হোক এবং আমরা কীভাবে তার প্রভাব মোকাবিলা করতে পারি তা নিয়ে ভাবা হোক।’
ক্লাউসেনের দাবি, চরম ডানপন্থী কিছু গোষ্ঠী ছাড়া অধিকাংশ মানুষের প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক ছিল। তার মতে, ‘পার্লামেন্টে এমন প্রদর্শনীর সুযোগ থাকা গুরুত্বপূর্ণ, যার সঙ্গে সবাই একমত নাও হতে পারেন।’
গালশিয়ট এর আগে মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্স এবং ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত কপ-৩০ জলবায়ু সম্মেলনেও ‘দ্য অরেঞ্জ প্লেগ’ প্রদর্শন করেছিলেন। আগামী মাসে তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য কপ-৩১ সম্মেলনেও এটি প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে, ভাস্কর্যটি নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেননি ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত ‘কোয়েস্টরস’ কমিটি প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রদর্শনীটির অনুমোদন দিয়েছে। তাদের কাজ হলো প্রদর্শনীগুলো বিদ্যমান বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই করা।
শিল্পী গালশিয়ট তার বিখ্যাত ‘পিলার অব শেম’ এবং নতুন এই ট্রাম্পবিরোধী ভাস্কর্যের মধ্যে একটি মিলও খুঁজে পান। তার ভাষায়, ‘দুটো কাজই মূলত ক্ষমতাবান ও ক্ষমতাহীন মানুষের সম্পর্ক নিয়ে।’