এবার আইসিসির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিল যুক্তরাষ্ট্র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২২:৪৭

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সাবেক বিচারপতি নাভি পিল্লাই শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আদালতটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ঘোষিত এ পদক্ষেপের ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইউরোপীয় মিত্রদের কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আইসিসির উপপ্রধান কৌঁসুলি নাজহাত শামীম খান এ নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এর মাধ্যমে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ করা যাবে না। তার ভাষ্য, আন্তর্জাতিক আইনের শাসন এবং একটি স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠানের কাজকে দুর্বল করাই এ নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য। তবে আদালতের তদন্ত, বিচারপ্রক্রিয়া ও অন্যান্য কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত আইসিসি যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার করে থাকে। আদালতটির প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধিতা দীর্ঘদিনের। এর আগে আদালতের কয়েকজন কৌঁসুলি ও বিচারকের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল ওয়াশিংটন। তবে এবারের পদক্ষেপে আদালতকে সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কখনোই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে মার্কিন নাগরিকদের বিচার করতে দেবেন না। এ কারণেই আজ যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। আমরা এই অবাধ্য আদালতের সঙ্গে লেনদেন নিষিদ্ধ করব, তাদের সম্পদপ্রাপ্তি বন্ধ করব এবং কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা পঙ্গু করে দেব।’
আইসিসির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষোভের অন্যতম কারণ ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ ইসরাইলি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা। এ ছাড়া আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে আইসিসির অতীত তদন্ত নিয়েও ওয়াশিংটনের আপত্তি রয়েছে। আদালত অবশ্য জানিয়েছে, ওই তদন্তকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে না।
বিশ্বের ১২৫টি দেশ আইসিসির সদস্য। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব দেশ রয়েছে। ন্যাটোর সদস্যদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক ছাড়া অন্য দেশগুলোও আদালতটির সদস্য। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত এ আদালত আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কিছু লেনদেনে ছাড়
নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় চারটি সাধারণ লাইসেন্স জারি করে। এর মাধ্যমে আইসিসির টেলিযোগাযোগ, সফটওয়্যার, পেনশন পরিশোধ এবং আদালতের আটক ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু লেনদেনের ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়লে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এর ফলে ব্যাংক হিসাব বন্ধ, বিমা সেবা প্রত্যাহার এবং সফটওয়্যার সরবরাহ বন্ধ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আইসিসির কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। পরে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন তা প্রত্যাহার করে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই আদালতের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হয়।
এবার আদালতটির ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে—এমন আশঙ্কায় আইসিসি কর্তৃপক্ষ কয়েক মাস ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এর অংশ হিসেবে দপ্তরের কম্পিউটারে মাইক্রোসফটের সফটওয়্যারের পরিবর্তে উন্মুক্ত উৎসের বিকল্প সফটওয়্যার ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ব্যাংকিং ও স্বাস্থ্যবিমার ক্ষেত্রেও বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির চেষ্টা চলছে।
আইসিসির রেজিস্ট্রার ওসভালদো জাভালা গিলার চলতি সপ্তাহে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে একটি ‘ব্লকিং মেকানিজম’ ব্যবহারের প্রস্তুতি রাখার আহ্বান জানান। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার বহির্দেশীয় প্রভাব থেকে ইউরোপীয় দেশগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

মিত্রদেরও আইসিসির ওপর চাপ বাড়ানোর আহ্বান
মার্কো রুবিও বলেন, আইসিসি এবং আদালত প্রতিষ্ঠার রোম সংবিধিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ সমাধানের সুযোগ দিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপে দেরি করা হয়েছিল। কিন্তু তারা সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
তিনি বলেন, ‘হয় আইসিসি তাদের হুমকি বন্ধ করবে, নয়তো আমরা আইসিসিকে বন্ধ করে দেব। আমরা আশা করি, আমাদের মিত্ররা—যাদের অনেকেই আইসিসির সদস্য এবং নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য মার্কিন সেনাদের ওপর নির্ভরশীল—আদালটিকে নিয়ন্ত্রণে আনবে।’
রুবিও আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এমনভাবে পদক্ষেপটি সাজিয়েছে, যাতে আইসিসির সদস্য দেশগুলো আলোচনার মাধ্যমে মার্কিন উদ্বেগের সমাধান দিতে পারে। এসব উদ্যোগ সফল না হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নোবেলজয়ী নাভি পিল্লাইয়ের সঙ্গে আইসিসির সম্পর্ক
দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ নাভি পিল্লাই ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আইসিসির আপিল বিভাগে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শুক্রবার আন্তর্জাতিক অপরাধবিচার ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান।
নোবেল কমিটি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনের বিচারক ও প্রতিষ্ঠানগুলো যখন রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে, তখন এ পুরস্কারের মাধ্যমে সেসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছে তারা।
কমিটির ভাষ্য, যুদ্ধাপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে—এমন আন্তর্জাতিক আইনব্যবস্থা শান্তিপূর্ণ বিশ্ব প্রতিষ্ঠার অন্যতম পূর্বশর্ত।

সূত্র: রয়টার্স