আশুলিয়ায় বিস্ফোরণ

তদন্তে কমিটি, তিন দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা

ডেস্ক রিপোর্ট
  ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩:৩৭


সাভারের আশুলিয়ায় রফতানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা প্রীতি কম্পোজিটে গ্যাস সিলিন্ডারবাহী গাড়িতে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এদিকে দুর্ঘটনার পর সোমবার থেকে তিন দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। সকালে কাজে যোগ দিতে এসে বন্ধের নোটিশ দেখে ফিরে গেছেন শ্রমিকরা।
এ ঘটনায় কারখানার সামনে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

চার সদস্যের তদন্ত কমিটি
সোমবার দুপুরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহিদ কামালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি খুদেবার্তায়  জানান, সহকারী পরিচালক কাজী নজমুজ্জামানের নেতৃত্বে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে ঘটনার সব দিক তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেবে।
তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার দিন নির্বাপণকালীন প্রাথমিক তদন্ত করা হয়েছে। সেই তদন্তের তথ্যও কমিটির প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।

আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ
সোমবার সকালে সরেজমিন দেখা যায়, আগের দিনের বিস্ফোরণে কারখানা ও আশপাশের প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিস্ফোরণের তীব্রতায় গ্যাস সিলিন্ডারের টুকরো ছিটকে গিয়ে আশপাশের প্রায় ৩০টি বাড়ি এবং জামগড়া কবরস্থান পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।
এ ঘটনায় অর্ধশতাধিক মানুষ মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পেয়ে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে আহতের প্রকৃত সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, তদন্ত কমিটি গঠনের আগেই সোমবার ভোর থেকে পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়ে ঘটনাস্থল পরিষ্কার করা হয়েছে। এতে বিস্ফোরণের গুরুত্বপূর্ণ আলামত ধুয়ে-মুছে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
তবে আলামত নষ্টের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

১১টি গাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার নেওয়ার অভিযোগ
বিস্ফোরণের আগে কারখানায় ১১টি গাড়িতে অবৈধভাবে সিএনজি ও এলপিজি সিলিন্ডার ভর্তি করে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। সাভারের লালন সিএনজি পাম্প, হেমায়েতপুর এলপিজি গ্যাস স্টেশন, রেডিও কলোনির সারাহা ফুয়েল স্টেশনসহ স্থানীয় আরও দুটি পাম্প থেকে এসব গ্যাস সংগ্রহ করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
কারখানা সূত্র জানায়, বয়লার মেশিন চালানোর জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে আগের দিন রাতভর সিলিন্ডারগুলোতে গ্যাস ভরা হয়েছিল।
কারখানার একটি সূত্রের দাবি, সিলিন্ডারগুলোর অধিকাংশই ছিল মেয়াদোত্তীর্ণ। দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে সেগুলোর অনেকগুলো প্রায় অকেজো হয়ে পড়েছিল। সিলিন্ডারগুলো গাড়ি থেকে নামানোর সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে বলে সূত্রটি জানায়।
তবে সিলিন্ডারগুলোর মেয়াদ, গ্যাস সংগ্রহের বৈধতা এবং বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
রোববার সন্ধ্যা ৭টার দিকে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার এস সুহি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের প্রীতি কম্পোজিট কারখানায় গ্যাস সিলিন্ডারবাহী গাড়িতে পরপর বিস্ফোরণ ঘটে। এতে আগুন দ্রুত আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং পাঁচটি গাড়িতে আগুন ধরে যায়।
বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে অন্তত সাতজন নিহত হন। আহত হন আরও অন্তত ৪০ জন শ্রমিক ও এলাকাবাসী। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
পরে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় কারখানা কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়নি বলে জানা গেছে।
আশুলিয়া থানার ওসি তরিকুল ইসলাম সোমবার দুপুরে বলেন, এ ঘটনায় সাতজনই মারা গেছেন। দুজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। বাকিদের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা হবে।
তিনি আরও বলেন, কারখানার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এ ঘটনায় আশুলিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। তবে সোমবার দুপুর পর্যন্ত কোনো পক্ষ মামলা করার আবেদন করেনি।
সাভার ফায়ার সার্ভিসের সাভার জোনের ইনচার্জ স্টেশন অফিসার হাফিজুর রহমান জানান, বিস্ফোরণের তীব্রতায় পুরো কারখানা চত্বর ও আশপাশের এলাকা কেঁপে ওঠে। দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
তিনি বলেন, লরির ভেতর ও নিচ থেকে পাঁচজনসহ মোট সাতজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত ৪০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। সিলিন্ডারগুলো যেভাবে স্থানীয়ভাবে ভর্তি করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ অবৈধ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নিহতদের পরিচয় নিয়ে তথ্যের ভিন্নতা
পুলিশ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে নিহতদের পরিচয় শনাক্তের বিষয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ সূত্রে দুজনের পরিচয় শনাক্তের কথা জানানো হলেও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রের বরাতে তিনজনের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে বুলবুল হোসেন (৪৫) ও নজরুল ইসলাম (৪২) কারখানার আশপাশে ফুটপাতে ব্যবসা করতেন বলে জানা গেছে। অপর নিহত মোসাম্মাৎ জয়নব (৫৫) একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নারী। ঘটনাস্থলের পাশেই তার একটি টেইলারিংয়ের দোকান ছিল। তিনি গাজীপুরের কাশিমপুর এলাকার মোহাম্মদ আলীর স্ত্রী।
সোমবার সকালে ময়নাতদন্ত শেষে জয়নবের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অন্যদের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে বলে জানা গেছে। নিহতদের বাকি পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
আশুলিয়ার এ বিস্ফোরণের ঘটনায় অবৈধভাবে গ্যাস সিলিন্ডার ভর্তি, মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহার এবং কারখানা চত্বরে সেগুলো সংরক্ষণের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলের আলামত নষ্টের অভিযোগও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
চার সদস্যের তদন্ত কমিটি আগামী তিন কার্যদিবসে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। তদন্তে বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ, গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের বৈধতা, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উঠে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।