
রোববার মধ্যরাত থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে চোখ রাখা দায়। ঘুরে ফিরে জামায়াতে ইসলামীর বহিষ্কৃত নেতা ও সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী, ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনের ছবি সামনে আসছে। কেউ কেউ সেই তরুণীকে সাইবার বুলিং করছেন, কেউ করছেন কড়া সমালোচনা আবার কেউ তার আর্থ-সামাজিক অবস্থান ব্যাখ্যা করে মত দিচ্ছেন। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে সেই তরুণী এখন আর বেঁচে নেই। কেন তার এই পরিণতি?
মরিয়মের মরদেহ উদ্ধার
গেলো রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার পর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের (১৯) মরদেহ উদ্ধার হয়। এ ঘটনায় মরিয়মের স্বামী গাজী নজরুল, তার প্রথম স্ত্রী ও এক স্বজনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেছেন তার বাবা। গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রীকে এ মামলায় গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গাজী নজরুলকে ৪ দিনের ও তার প্রথম স্ত্রীকে ১ দিনের রিমান্ডেও নেওয়া হয়েছে।
মরিয়মের বাবার আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা
মামলার এজাহারে মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ অভিযোগ করে বলেছেন, গত জুনে জিএম নজরুল ইসলামের সঙ্গে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী তার মেয়ের বিয়ে হয়। বিয়ের পর মরিয়ম স্বামী ও তার প্রথম স্ত্রী মোছা. মাকছুদা ইসলামের সঙ্গে ন্যাম ভবনের ওই বাসায় বসবাস করছিলেন। বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো বলে তিনি বিভিন্ন সময় পরিবারের সদস্যদের মোবাইল ফোনে জানিয়েছিলেন।
মরিয়মের বাবা আরও বলেন, রোববার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল ফোন করে দ্রুত বাসায় যেতে বলেন। পরে তিনি তার শ্যালিকা সুফিয়াকে সঙ্গে নিয়ে সিএনজিতে করে ন্যাম ভবনের বাসায় যান। সেখানে গিয়ে জানতে পারেন, বাসার একটি কক্ষে মরিয়ম ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলে আছেন। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল।
এজাহারে তিনি আরও উল্লেখ করেন, মরিয়মের বিছানার ওপর হাতে লেখা নোট পাওয়া যায়। সেখানে তিনি অনেক কিছু লিখে রেখেছেন।
তার রেখে যাওয়া কিছু লেখা নোটও যুক্ত করেছেন এতে।
মরিয়মের সেই ‘সুইসাইড নোট’ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, মরিয়ম বেশ কয়েকটি নোটে হতাশা, বঞ্চনা, পারিবারিক কলহ এবং গাজী নজরুলের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা, মায়া এসব লিখে গেছেন।
যেভাবে জানা যায় তাদের ‘অসম বিয়ের’ কথা
গাজী নজরুল জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়ন নিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। গত জুলাই মাসে তার ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে এক তরুণীর সঙ্গে তাকে দেখা যায়। এ ঘটনার পর ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। পরে ২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করে। দলটির পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্পিকার, নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠিও দেওয়া হয়।
গাজী নজরুল ইসলাম প্রথমে গড়িমসি করলেও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মরিয়ম খাতুন সঙ্গে তার বিয়ের বিষয়টি স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, গত ১৭ জুন পারিবারিকভাবে এবং তার প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে মাসুম বিল্লাহর বাসভবনে মরিয়ম সঙ্গে তার বিয়ে হয়। যারা তার সামাজিক মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নৈতিক চরিত্র ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে এই ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার করছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বানও জানান।
শুধু তাই নয় এই সংসদ সদস্যের প্রথম স্ত্রীও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও বার্তায় তার স্বামীর বিরুদ্ধে মিথ্যা-অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে জানান।
এমপি গাজীর নৈতিক স্খলন
একজন সংসদ সদস্যের তার চেয়ে বয়সের এত বেশি ব্যবধানের একজন তরুণীর সঙ্গে প্রেম এবং বিয়ে নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের দোকান পর্যন্ত। অভিযোগ উঠে ক্ষমতার অপব্যবহার, নৈতিক স্খলন, পারিবারিক বিষয়াদি, রাজনৈতিক পরিচয়, নারীদের পর্দা করা নিয়ে তার আগের বক্তব্যসহ নানান বিষয়।
নৈতিক স্খলনের অভিযোগে দল থেকেও বহিষ্কার হন এই জামায়াত নেতা। যদিও তিনি পরে বলেন, কাগজে-কলমে সব জায়গায় তার নাম আছে।
মরিয়মের কী দোষ?
অন্যদিকে, বুলিংয়ের শিকার হতে হয় মরিয়ম খাতুনকে। অর্থলোভ, সামাজিক অবস্থানের কথা না ভাবা, চাকরি পাওয়ার আশা, এরকম নানান অভিযোগের তীর ছোড়া হয় তার দিকে। তার বাবা আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা করেছেন, আসলে সেদিন কী ঘটেছিল মরিয়মের সঙ্গে সেটি আদালতে প্রমাণ সাপেক্ষ। তবে পরিবারে অশান্তি, সামাজিক চাপ, নিজের ওপর অভিমান এসব কারণই কি মরিয়মকে চলে যেতে হলো?