আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ

নির্যাতিত হয়ে ৭ বছরে দেশে ফিরেছেন ৭০ হাজার নারী

ডেস্ক রিপোর্ট
  ০৮ মার্চ ২০২৬, ১৫:২৩

ভাগ্য বদলের আশায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে সৌদি আরবে যান কুড়িগ্রামের এক নারী। সেখানে গৃহকর্তার ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন তিনি। পরে জীবন বাঁচাতে আশ্রয় নেন রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসে। দুই মাস পর তিনি দেশে ফেরেন। ফিরে আসা রংপুরের এক নারী জানিয়েছেন, স্বামীর মৃত্যুর পর অভাবের কারণে তিনি সৌদি আরবে যান। যে বাড়িতে কাজ করতেন, সেখানে শুধু বাড়ির লোক নয়, বাইরে থেকে আসা পুরুষরাও নির্যাতন করতেন। প্রতিবাদ করায় তাঁর শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। যশোরের এক নারী জানান, গৃহকর্তা, তাঁর ছেলে, এমনকি ছেলের বন্ধুরাও তাঁকে যৌন নির্যাতন করেছেন।
সংসারে সচ্ছলতার আশায় বিদেশে গিয়ে স্বপ্নভঙ্গের এমন ঘটনা এখন নৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, গত এক দশকে বাংলাদেশি নারী অভিবাসীর সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি হয়রানি, নিপীড়নসহ নানা সংকট নিয়ে ফেরত আসার সংখ্যাও কমেনি। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১০ লাখের বেশি নারী বিদেশে কাজ করছেন। তবে তাদের মধ্যে কতজন ফিরেছেন, এর সঠিক তথ্য নেই। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য বলছে, সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী দেশে ফিরেছেন। তাদের বেশির ভাগই নিপীড়নের অভিযোগ করেছেন। এ ছাড়া অন্তত ৮০০ নারীর লাশ দেশে এসেছে। 
এর বাইরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০১২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ছয় হাজারের বেশি নারী পাচারের শিকার হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে আজ ৮ মার্চ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ সব নারীর জন্য হোক’। 
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের নারী কর্মীরা বিদেশে যাওয়া শুরু করলেও এটি ধারাবাহিক হয়ে ওঠে ২০০৪ সালের দিকে। ২০১৩ সালে প্রথমবার বছরে ৫০ হাজারের বেশি নারী বিদেশ যান। ২০১৫ সালে সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠানোর চুক্তি হওয়ার পর এই সংখ্যা বছরে লাখ পেরিয়ে যায়। করোনা মহামারির দুই বছর বাদ দিলে ২০১৫ থেকে ২০২২ পর্যন্ত প্রতি বছর এক লাখের বেশি নারী বিদেশে গেছেন।
সাত বছরে ফিরেছেন ৭০ হাজার 
বিদেশ থেকে কত বাংলাদেশি নারী ফেরত এসেছেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী ফেরত আসার তথ্য দিচ্ছে ব্র্যাক। এর মধ্যে করোনাকালে ২০২০ সালে ফিরেছেন ৪৯ হাজার ২২ জন। বিমানবন্দরের তথ্য অনুযায়ী, শুধু বন্দি হিসেবে ২০১৯ সালে তিন হাজার ১৪৪ জন, ২০২১ সালে এক হাজার ৮১১ জন, ২০২২ সালে ছয় হাজার ২৯ জন, ২০২৩ সালে ২ হাজার ৯১৬ জন, ২০২৪ সালে তিন হাজার ৩৭৫ জন এবং ২০২৫ সালে ১ হাজার ৮৯১ জন দেশে ফিরেছেন। 
নিপীড়নের অভিযোগ অধিকাংশের 
দেশে ফেরা নারী গৃহকর্মীর অধিকাংশের অভিযোগ, বিদেশে তারা শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনসহ ঠিকমতো খাবার না পাওয়া, চুক্তি অনুযায়ী নিয়মিত বেতন না পাওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের বেশি কাজে নিয়োজিত থাকাসহ নানা সংকটে পড়েন। ব্র্যাক জানিয়েছে, ফেরত আসা নারীর মধ্যে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা অন্তত ১২১ নারীকে তারা সেবা দিয়েছে। এর বাইরে নিপীড়নের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছেন হাজারও নারী।
মৌলভীবাজারের বড়লেখার রিজিয়া বেগম ছয় বছর আগে সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যান। সেখানে দীর্ঘ সময় কাজ করানো, কম খাবার দেওয়া এবং নির্যাতনের শিকার হন তিনি। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে প্রায় পাঁচ বছর তাঁর খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরিবার ভেবেছিলেন তিনি মারা গেছেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার বিমানবন্দরে তাঁকে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টার ও পিবিআইয়ের সহযোগিতায় তাঁর পরিচয় শনাক্তের পর তাঁকে পরিবারের কাছে ফেরানো সম্ভব হয়।
ফেরত আসা নারীরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত কাজের চাপ ও নির্যাতন সামলাতে না পেরে নারীরা পালিয়ে দূতাবাসের সেফ হাউসে আশ্রয় নেন। সৌদি দূতাবাসের বিভিন্ন চিঠিতেও এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রীর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সৌদি আরবের সাবেক এক রাষ্ট্রদূত লিখেছিলেন, ‘এ পর্যন্ত ৫৫ গৃহকর্মী অতিরিক্ত কাজের চাপ, দুর্ব্যবহার বা নির্যাতনের কারণে গৃহকর্তার বাড়ি থেকে পালিয়ে দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েছেন। প্রতিদিনই তিন-চারজন গৃহকর্মী এভাবে আশ্রয় নিচ্ছেন।’ আরেক চিঠিতে নারীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনে আত্মরক্ষামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়াসহ বেশ কটি বিকল্প প্রস্তাব দেন তিনি।
২০১৯ সালের ২৬ আগস্ট সৌদি আরব ফেরত ১১০ নারী গৃহকর্মীর ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দেওয়া হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩৫ শতাংশ নারী শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। ৪৪ শতাংশ নারীকে নিয়মিত বেতন দেওয়া হতো না। দেশে ফিরে আসা নারী শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে মন্ত্রণালয় তাদের ফিরে আসার ১১টি কারণ চিহ্নিত করে। 
নারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বলেন, বিদেশে নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশের নারীর সঙ্গে কথা বলে মোটা দাগে তিনটি ধরন পাওয়া যায়। প্রথমটি কাজ ও বেতনবিষয়ক। নারীর একটি বড় অংশ অভিযোগ করেন তারা ওই দেশের খাবার, পরিবেশ ও আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন না। বেতন ঠিকমতো পান না। একাধিক বাসায় কাজ করতে হয়। দ্বিতীয়ত, নারী যখন মানিয়ে চলতে পারেন না, ঠিকমতো কাজ করতে পারেন না, তখন নিয়োগকর্তা তাঁকে শারীরিক নির্যাতন করেন। তৃতীয়টি যৌন নির্যাতনের ঘটনা। এই নিপীড়ন-নির্যাতন এতটাই বীভৎস, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। যে নারীরা বিদেশে নিপীড়নের শিকার হয়ে ফিরে আসেন, তাদের পাশে অধিকাংশ সময় রাষ্ট্র থাকে না।