কারাগারে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় বাড়ছে বন্দি মৃত্যু

ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৫ মার্চ ২০২৬, ১৩:০৫

দেশের কারাগারগুলোতে চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্স সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। এই সংকটের কারণে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে বাড়ছে বন্দিদের মৃত্যু। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার থেকে শুরু করে পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার, কোনও সময়েই এই সমস্যার কার্যকর সমাধান হয়নি। বরং ধাপে ধাপে বেড়েছে মৃত্যুর সংখ্যা।
কারা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসেই ৯৭ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৫৫ জন এবং ফেব্রুয়ারিতে ৪২ জন মারা গেছেন।
এর আগের বছরগুলোতেও মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক ছিল। ২০২৫ সালে মোট ২৭০ জন বন্দির মৃত্যু হয়। এর মধ্যে স্বাভাবিক মৃত্যু ১৫৫ জন, হাসপাতালে নেওয়ার পথে ১১১ জন এবং অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় ৪ জনের।
২০২৪ সালে মৃত্যু হয় ২৬১ জনের। স্বাভাবিক মৃত্যু হয় ১৪০ জনের। হাসপাতালে নেওয়ার পথে ১২০ এবং অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় ১ জনের।
২০২৩ সালে মোট মৃত্যু ছিল ২৯০ জন, স্বাভাবিক মৃত্যু হয় ১৮৭ জনের। হাসপাতালে নেওয়ার পথে ১০১ জন এবং অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় ২ জনের।
এই হিসাবে, ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাস পর্যন্ত মোট ৮২১ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২২ জন বন্দির মৃত্যু ঘটছে।
চিকিৎসক সংকট প্রকট
কারা অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কারাগারগুলোতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ১৪৬টি। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত চিকিৎসক আছেন মাত্র দুইজন। ফলে বন্দিদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
দেশে বর্তমানে ৬৮টি কারাগার রয়েছে। এর মধ্যে মানিকগঞ্জ কারাগার ও রাজশাহী ট্রেনিং সেন্টারে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক রয়েছেন। বাকি কারাগারে সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে খণ্ডকালীন চিকিৎসক দিয়ে সেবা চালানো হচ্ছে।
অ্যাম্বুলেন্স সংকটে বাড়ছে ঝুঁকি
চিকিৎসা সংকটের পাশাপাশি রয়েছে তীব্র অ্যাম্বুলেন্স সংকট। ৬৮টি কারাগারের বিপরীতে অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র ২৭টি। ফলে অসুস্থ বন্দিদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ভাড়া করা গাড়ির ওপর নির্ভর করতে হয়, যা পৌঁছাতে সময় নেয়। এতে পথেই মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে আত্মহত্যা
কারাগারগুলোতে আত্মহত্যার ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বিদ্যমান। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কেরাণীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এক বন্দি আত্মহত্যা করেছেন।
২০২৫ সালে আত্মহত্যা করেছেন ৬ জন বন্দি। ২০২৪ সালে ৩ জন, ২০২৩ সালে ২ জন, ২০২২ সালে ৪ জন এবং ২০২১ সালে ৪ জন বন্দি আত্মহত্যা করেন।
জানতে চাইলে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজনস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, অনুমোদিত চিকিৎসকের সংখ্যা থাকলেও বাস্তবে তা পূরণ হয়নি। বর্তমানে মাত্র দুইজন চিকিৎসক স্থায়ীভাবে কর্মরত আছেন, বাকিরা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন, সার্বক্ষণিক চিকিৎসক থাকলে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে রোগীকে হাসপাতালে পাঠানো সম্ভব হতো, এতে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো যেত।
তিনি আরও জানান, চিকিৎসক সংকট নিরসনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে চিকিৎসক নিয়োগের বিষয়েও আলোচনা চলছে, তবে এখনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।
অ্যাম্বুলেন্স সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় অনেক সময় বাইরে থেকে গাড়ি আনতে হয়, এতে বিলম্ব হয় এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে।
কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, বন্দিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা জনবল ও অবকাঠামোগত সংকটের কারণে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো সমাধানের আশ্বাস দিলেও বাস্তব অগ্রগতি এখনও দৃশ্যমান নয়।