ভারত থেকে আনা নিম্নমানের চাল, খালাস আটকে দিয়েছে খাদ্য বিভাগ

ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৯ জুলাই ২০২৬, ০০:০২


ভারত থেকে আমদানি করা নিম্নমানের ও পচা চালের একটি চালান খালাস আটকে দিয়েছে খাদ্য বিভাগ। আমদানি করা সাড়ে ১১ হাজার মেট্রিক টন চালের মধ্যে কিছু চাল ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন সেন্ট্রাল স্টোরেজ ডিপো (সিএসডি) ও লোকাল স্টোরেজ ডিপোতে (এলএসডি) সরবরাহ করা হয়েছে।
জাহাজে থাকা আরও ৮ হাজার টন চাল নেবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। এ নিয়ে চট্টগ্রাম খাদ্য বিভাগে এখন তোলপাড় চলছে।
অভিযোগ রয়েছে, শিপিং এজেন্টসহ দুর্নীতিবাজ একটি চক্র কৌশলে এসব নিম্নমানের এবং পচা চাল আমদানি করার পর সরকারকে গছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিল। এ অনিয়মের পেছনে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের ‘মাফিয়া চক্র’ জড়িত। এসব সিদ্ধ চাল সরবরাহ করেছে ভারতীয় ‘অ্যাগ্রো কর্পস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। আর লোকাল শিপিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছে সেভেন সী’স শিপিং লাইন নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও খাদ্য বিভাগে একচেটিয়া ব্যবসা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এর আগেও নানা অনিয়মের অভিযোগ ছিল বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
নিম্নমানের চাল আনার বিষয় ধরা পড়ার পর খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে তা কোনোরকমে গছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে শিপিং লাইন মালিকপক্ষ; কিন্তু খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। কর্মকর্তারা কোনো অবস্থাতে নিম্নমানের চাল গ্রহণ করা হবে না বলে শিপিং এজেন্টকে সাফ  জানিয়ে দিয়েছে।
গম আমদানি কেলেঙ্কারিতে গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। তৎকালীন সচিব ইসমাইল হোসেনকেও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় অন্তর্বর্তী সরকার; কিন্তু বেশি দামে নিম্নমানের গম আমদানির হোতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।
অভিযোগ রয়েছে, সাধন চন্দ্র খাদ্যমন্ত্রী থাকাকালে রাশিয়া থেকে একের পর এক নিম্নমানের, এমনকি চোরাই গমের চালানও বেশি দামে আমদানি করেছিল চক্রটি সেই। চক্রটি এখনও বহাল তবিয়তে আছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জিটুজি (সরকার টু সরকার) চুক্তির আওতায় গত মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সাড়ে ১১ হাজার মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল নিয়ে ‘এমভি এইচটি পাইওনিয়ার’ জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরের বর্হিনোঙরে পৌঁছে। পরের দিন ভারত থেকে আমদানি করা এই চালের চালান থেকে খাদ্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধি, জেলা প্রশাসকের একজন প্রতিনিধি ও আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকসহ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাব পরীক্ষা করা হয়। নমুনা পরীক্ষায় এসব চাল ‘খাবার উপযোগী’ উল্লেখ করে প্রতিবেদন দাখিলের পর খালাসের অনুমতি দেওয়া হয়। এরপর শুরু হয় চাল খালাস।
বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দুই দিন চাল খালাস চলে। এসব চাল ঢাকার তেজগাঁও সিএসডি, চট্টগ্রামের হালিশহর সিএসডি ও দেওয়ানহাট সিএসডিতে পাঠানো হয়। ঢাকার তেজগাঁও সিএসডিতে ২ হাজার মেট্রিক টন, হালিশহর সিএসডিতে কয়েকশ মেট্রিক টন ও দেওয়ান হাট সিএসডিতে কয়েকশ মেট্রিক টন পাঠানো হয়।
এছাড়া জয়দেবপুর এলএসডিতেও কয়েকশ টন চাল পাঠানো হয়েছে। গত শনিবার ঢাকার তেজগাঁও ও চট্টগ্রামের হালিশহর সিএসডির কর্মকর্তারা এসব চাল গ্রহণ করতে গিয়ে দেখেন-আমদানিকৃত এসব চাল অত্যন্ত নিম্নমানের, পুরোনো ও অনেকটা খাবার অনুপযোগী। তারা বিষয়টি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ও খাদ্য অধিদপ্তরের ডিজিকে অবহিত করেন। পাশাপাশি পরিবহণ ঠিকাদারও চাল নিম্নমানের হওয়ায় পরিবহণ বন্ধ রাখেন।
রোববার থেকে আবার চাল খালাস শুরু হয়। নিম্নমানের চাল পাওয়ায় সোমবার থেকে আবারও চাল খালাস বন্ধ রেখেছে পরিবহণ ঠিকাদাররা। সোমবার পর্যন্ত ৩ হাজার টনের মতো চাল খালাস করা হয়েছে। জাহাজটিতে আরও সাড়ে ৮ হাজার মেট্রিক চাল রয়েছে।
খালাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ‘এমভি এইচটি পাইওনিয়ার’ জাহাজে কয়েকটি হ্যাজ রয়েছে। পাশাপাশি কয়েক ব্লকে সিদ্ধ চাল আনা হয়েছে। কয়েকটি লেয়ারে বা স্তরে নিম্নমানের চালগুলো এমনভাবে কৌশলে আনা হয়েছে- যাতে নমুনা সংগ্রহের সময় ধরা না পড়ে। যার কারণে নমুনা সংগ্রহের সময় নিম্নমানের চাল থাকার বিষয়টি ধরা পড়েনি। নিম্নমানের চালগুলো বিভিন্ন ব্লকের ঠিক মাঝখানে রেখে জাহাজটি লোড করা হয়েছে। যাতে নমুনা সংগ্রহের সময় তা নজরে না আসে।
আশরাফ নামে একজন ঠিকাদার জানান, বন্দরে খালাসকৃত সিদ্ধ চালের জাহাজের চলমান কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। চালের মান অতি নিম্নমানের হওয়ায় এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন তারা। বর্তমানে সিএমএস (চলাচল ও সংরক্ষণ কর্মকর্তা) সরেজমিনে বন্দরে উপস্থিত হয়ে জাহাজের পণ্য পরিদর্শন করছেন। পরবর্তী সিদ্ধান্ত না আসা আসা পর্যন্ত আপাতত জাহাজ থেকে চাল খালাসের কাজ বন্ধ থাকবে বলে জানান তিনি।
সেভেন সী’স শিপিং লাইনের কর্ণধার আলী আকবর বলেন, আমদানি করা এই চাল খারাপ না, তবে একটু লালচে। তবে তিনি পচা ও নিম্নমানের চাল থাকার বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করেন।
বিভাগীয় পরিবহণ ঠিকাদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন বলেন, খারাপ চাল আনার কারণে তেজগাঁও, হালিশহর, দেওয়ান হাট সিএসডি ও জয়দেবপুর এলএসডিতে চাল পরিবহণ বন্ধ করে দিয়েছি। জাহাজ এখন অলসভাবে দাঁড়িয়ে আছে। এসব খারাপ চাল আনার জন্য শিপিং এজেন্টই দায়ী।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক জিএম ফারুক হোসেন পাটওয়ারী জানান, আপনারা জানেন স্যাম্পল সংগ্রহ করার পর চাল খালাস হয়ে থাকে। জাহাজ এমভি এইচটি পাইওনিয়ার আনা চাল নিয়ে ঝামেলা হয়েছে। এ কারণে আমরা খালাস বন্ধ রেখেছি। জাহাজে আমাদের টিম (খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা) গিয়ে কাজ করছে। আমাদের সোজা কথা বিধিবর্হিভূত কোনো চাল গ্রহণ করব না।