
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিশ্বমঞ্চে এটিই তাঁর প্রথম ভাষণ। নিউইয়র্ক সময় বিকেল ৬টা ১৬ মিনিটে শুরু হয়ে ৬টা ৩৭ মিনিটে তাঁর এই ঐতিহাসিক ভাষণ শেষ হয়।
ভাষণে তিনি বৈশ্বিক শান্তি, কূটনীতি, অভিবাসীদের অধিকার, শিক্ষাখাতে সংস্কার এবং প্রযুক্তির সমতা নিশ্চিত করার ওপর জোরালো আহ্বান জানান।
ভাষণের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সকল শহীদ মুক্তিযোদ্ধা এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পথ ধরে গত ১২ ফেব্রুয়ারির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।
বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের স্মৃতিকাতরতার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই বিশ্বমঞ্চেই তাঁর পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দেশ ও জনগণের পক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন। আজ তিনিও দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষায় এবং শান্তিময় বিশ্ব প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় এই মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন।
চলমান বৈশ্বিক সংকটের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মানবসৃষ্ট সংঘাতের ফলে আজ বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে রয়েছে এবং জ্বালানি ও মুদ্রাস্ফীতির সংকট তৈরি হয়েছে। যেকোনো সংঘাতের সমাধান অস্ত্র দিয়ে নয়, বরং আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। পাশাপাশি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের অধিকারের প্রতি বাংলাদেশ অবিচল সমর্থন পুনর্বক্ত করে।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্যের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতার নীতিতে অটল রয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের সাহসী ভূমিকা এবং নারী শান্তিরক্ষীদের অংশগ্রহণের কথা তিনি বিশেষভাবে তুলে ধরেন।
দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন ও শিক্ষাব্যবস্থার রূপরেখা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে এবং আগামী ৫ বছরের মধ্যে তা জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক স্তরে বিনামূল্যে দুপুরের খাবার, পোশাক বিতরণ এবং সিলেবাসে প্রথমবারের মতো ‘স্পোর্টস’ যুক্ত করার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ করে তুলতে নেওয়া নানা পদক্ষেপের কথা জানান তিনি।
ডিজিটাল বিভাজন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, আজকের ডিজিটাল বিভাজন যেন আগামী দিনের এআই বিভাজনে পরিণত না হয়। প্রযুক্তি ও গবেষণার সুযোগ সবার নাগালের মধ্যে আনতে এবং এ বিষয়ে জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে দেশের গণতান্ত্রিক ধারা, মানবাধিকার, সুশাসন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে এবং প্রতিটি শিশু তাদের সব সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পাবে।’
পরিশেষে ‘সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়ে এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের সব নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে তিনি তাঁর ভাষণ শেষ করেন।