কক্সবাজার বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক টার্মিনালে পরীক্ষামূলক ফ্লাইট শুরু

ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০৭


কক্সবাজার বিমানবন্দরের নবনির্মিত আন্তর্জাতিক টার্মিনাল দিয়ে পরীক্ষামূলক ফ্লাইট পরিচালনা শুরু হয়েছে। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) প্রায় ১৮ হাজার বর্গমিটার আয়তনের আধুনিক টার্মিনালটি দিয়ে প্রথমবারের মতো ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়।
নতুন টার্মিনাল চালুর প্রথম দিনে পর্যটকদের মধ্যেও উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। টার্মিনালের পরিচ্ছন্নতা, প্রশস্ত জায়গা ও দ্রুত লাগেজ পাওয়ার সুবিধায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা।
যাত্রাকালের সাক্ষী আবদুর রহমান নামে এক যাত্রী বলেন, ঢেউয়ের আদলে নির্মিত টার্মিনালটি বেশ ভালো লেগেছে। পুরোনো টার্মিনালের চেয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বেশি এবং হয়রানিও কম হয়েছে। সহজেই লাগেজ পাওয়া গেছে। কক্সবাজারের মতো পর্যটন কেন্দ্রে এমন পরিবেশ আরও আগেই প্রয়োজন ছিল।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতা জয়নাল আবেদীন হাজারি বলেন, দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে ও আধুনিক আন্তর্জাতিক টার্মিনাল নিয়ে বিশ্বমানের সেবার জন্য প্রস্তুত কক্সবাজার বিমানবন্দর। অক্টোবর থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আধুনিক আন্তর্জাতিক টার্মিনালে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গড়া এ টার্মিনাল কক্সবাজারের আকাশপথের যোগাযোগ, পর্যটন ও অর্থনীতিতে কতটা পরিবর্তন আনবে, নজর এখন সেদিকেই।
দেখা গেছে, সমুদ্রের বুক চিরে তৈরি রানওয়ের শেষপ্রান্ত যেন মিশে গেছে সমুদ্রের সঙ্গে। অক্টোবর থেকে এই রানওয়েতে বড় আকারের বিদেশি উড়োজাহাজ ওঠানামার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, সম্প্রসারণ করা অংশসহ কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ের মোট দৈর্ঘ্য এখন ১০ হাজার ৭০০ ফুট। এর প্রায় ১ হাজার ৭০০ ফুট সমুদ্রের ওপর ব্লক বসিয়ে তৈরি করা হয়েছে। নতুন রানওয়েতে বড় আকারের ওয়াইড-বডি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ অবতরণের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে উন্নত করা হয়েছে রানওয়ে ও এয়ারফিল্ড লাইটিং ব্যবস্থা। সমুদ্রের ওপরের অংশেও স্থাপন করা হয়েছে প্রয়োজনীয় লাইটিং অবকাঠামো। রানওয়েটিকে ক্যাটাগরি-২ অপারেশনের উপযোগী করার কাজও সম্পন্ন হয়েছে।
কক্সবাজার বিমানবন্দর রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর এম মোশাররফ হোসেন বলেন, বিদ্যমান রানওয়ের ওপর অ্যাসফাল্টের ওভারলে দেওয়ার কাজ শেষ হয়েছে। এক্সটেনশনসহ মোট ১০ হাজার ৭০০ ফুট রানওয়ের নির্মাণকাজও সম্পন্ন হয়েছে। রানওয়ে, লাইটিং ও সংশ্লিষ্ট সব কাজ শেষ হওয়ায় এটি এখন শুধু উদ্বোধনের অপেক্ষায়।
সূত্রমতে, এর আগেও কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হয়েছিল। তবে কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে তা স্থায়ী হয়নি। এবার বড় পরিসরের অবকাঠামো নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক অপারেশনের প্রস্তুতি চলছে।
রানওয়ের পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৯৫৫ বর্গমিটারের আধুনিক আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল। যাত্রী ও লাগেজের নিরাপত্তায় রয়েছে সাতটি স্ক্যানার, আধুনিক মেটাল ডিটেকশন ব্যবস্থা এবং হোল্ড ব্যাগেজের জন্য আলাদা স্ক্যানিং সুবিধা। যাত্রীদের দ্রুত সেবা দিতে রয়েছে ১৪টি চেক-ইন কাউন্টার ও ১০টি ইমিগ্রেশন ডেস্ক। লাগেজ সংগ্রহের জন্য রয়েছে দুটি আধুনিক ব্যাগেজ ক্লেইম বেল্ট।
এছাড়া যাত্রীদের চলাচলের সুবিধায় চারটি এসকেলেটর ও ছয়টি লিফট স্থাপন করা হয়েছে। টার্মিনালে রয়েছে লাগেজ হ্যান্ডলিং সিস্টেম, বোর্ডিং ব্রিজসহ বিভিন্ন আধুনিক সরঞ্জাম।
কক্সবাজার আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল প্রকল্পের মেকানিক্যাল প্রকৌশলী মো. নুর নবী বলেন, টার্মিনালে হোল্ড ব্যাগেজ স্ক্যানিংয়ের জন্য চারটি এবং কেবিন ব্যাগেজের জন্য তিনটি স্ক্যানার রয়েছে। সিকিউরিটি কন্ট্রোল এরিয়ায় রয়েছে হোল্ড ব্যাগেজের সেকেন্ডারি স্ক্যানিং ব্যবস্থা। পাশাপাশি রয়েছে আধুনিক মেটাল ডিটেকশন ও ব্যাগেজ কন্ট্রোল সিস্টেম। পাসপোর্ট কন্ট্রোল ও ইমিগ্রেশন এলাকাতেও রয়েছে প্রয়োজনীয় স্ক্যানিং সুবিধা।
যাত্রীসেবার পাশাপাশি পুরো টার্মিনাল ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করতে বিদেশি বিভিন্ন সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছে। এসব সরঞ্জামের টেস্টিং ও কমিশনিংয়ের কাজও শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশের (বেবিচক) সাবস্টেশন প্রকৌশলী মো. সোহেল রানা বলেন, প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ যাত্রী পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনালের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। প্রয়োজনীয় বিদেশি সরঞ্জামও স্থাপন করা হয়েছে। লাগেজ হ্যান্ডলিং সিস্টেম, বোর্ডিং ব্রিজ ও ব্যাগেজ বেল্টসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতির টেস্টিং ও কমিশনিংও শেষ হয়েছে। যাত্রীসেবায় সোমবার পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হলে শুধু বিদেশি পর্যটকই আকৃষ্ট হবে না, কক্সবাজারের অর্থনীতিতেও নতুন গতি আসবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম হয়ে বিদেশে পাঠানো শুঁটকি, সবজি ও অন্যান্য পণ্য কক্সবাজার থেকেই মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে সরাসরি পাঠানোর সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের পাশাপাশি ট্রানজিট ও রিফুয়েলিং সুবিধা চালু করা গেলে রাজস্ব আয়ের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। তবে এজন্য দ্রুত কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, কার্গো ব্যবস্থাপনা, লজিস্টিক সুবিধা ও প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা জরুরি।
কক্সবাজারের পর্যটন উদ্যোক্তা ও তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইসের পরিচালক আবদুল কাদের মিশু বলেন, অবকাঠামোর বড় অংশের কাজ শেষ হলেও আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের নিয়মিত ফ্লাইট এবং পর্যাপ্ত যাত্রী নিশ্চিত করা একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে। হাজার কোটি টাকার এ অবকাঠামো কক্সবাজারের পর্যটন, যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে, আগামী দিনের আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলেই তার উত্তর মিলবে।
কক্সবাজার বিমানবন্দরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. গোলাম মোর্তজা হোসেন জানান, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করতে আমরা প্রস্তুত। জনবলও পর্যাপ্ত রয়েছে। সোমবার থেকে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।