
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার রেশ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ মিলিটারি কনটিনজেন্ট টু কুয়েত (অপারেশন কুয়েত পুনর্গঠন) ১৯৯১ থেকে কুয়েতে নিয়োজিত রয়েছে। আমি কুয়েত সশস্ত্র বাহিনীতে প্রেষণে (২০০৮-২০১১) কর্মরত ছিলাম। এছাড়া ভ্রমণ ও দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ দেখার সুযোগ হয়। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, রাজনীতি, ভূরাজনীতি ও ঘটনাপ্রবাহ জানার ও বোঝার অনন্য সুযোগ হয়েছিল। এ লেখাটি কোনো বিশ্লেষণ নয়। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ নিয়ে, একজন কুয়েত বা মধ্যপ্রাচ্য ভ্যাটরানের অনুভূতির বিষাদময় উচ্চারণ।
তখন ইরানের পশ্চিমের একটি দেশে কর্মরত। ঢাকা থেকে কুয়েত এয়ারলাইন্সের বিমানটি ইরানের উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে কুয়েতের দিকে। বিমানের ডিসপ্লে স্ক্রিনে ইরানের শহরগুলোর নাম উঠছে। ইরানের সেই শহর জনপদ এখন মার্কিন-ইসরাইল বাহিনীর নির্বিচার বোমার আঘাতে বিধ্বস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত। ইরানের জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ফলে তেহরানের সড়ক যেন আগুনের নদী। এ রাজধানী শহরে পড়ছে বারুদ মেঘের কালো বৃষ্টি।
ইরান মধ্যপ্রাচ্যে আরব দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে মিসাইল ও ড্রোন হামলা করেছে-একটি যুদ্ধ কৌশল হিসাবে। এই যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের সুন্দর কিছু শহর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইরানের মিসাইল ও ড্রোন হামলায়। দাপ্তরিক কাজে আমার দেখা কিছু মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আরব দেশের বিভিন্ন (১৯টি) মার্কিন ঘাঁটিতে থাকা হাজার হাজার মার্কিন সেনা বিদায় নিয়েছে বলে জানা গেছে। এ যুদ্ধে অবিশ্বাস্য একটি ঘটনা ঘটেছে। মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি এফ-১৫ বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। এসব হামলায় আরব দেশগুলোতে মার্কিন স্থাপনার বাইরেও (কোল্যাটেরাল ড্যামেজ) বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র আরব দেশগুলোকে যুদ্ধে টানার কৌশল চালাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পরিকল্পিত উসকানি বা নাশকতা চালাচ্ছে ইসরাইল। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আরব দেশ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে সম্মত হয়নি। এ যুদ্ধের পর আরব দেশগুলো তাদের নিরাপত্তা নিয়ে হয়তো নতুন করে ভাববে।
মধ্যপ্রাচ্যের দৃষ্টিনন্দন শহরগুলোতে এখনো ইরানি ড্রোনের গুঞ্জন। এসব হামলায় নিহত হয়েছে তিনজন ভাগ্যহত বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধা। আরব দেশগুলোতে আমাদের প্রায় পঞ্চাশ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আমাদের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ। যুদ্ধের ফলে এ রেমিট্যান্স যোদ্ধারা এখন শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন। এ পরিস্থিতিতে তাদের পাশে সরকার ও দূতাবাসগুলোকে দাঁড়াতে হবে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে, জ্বালানি সংকট ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিয়ে করণীয় নিয়ে ‘টাস্কফোর্স’ গঠন করা যেতে পারে।
কুয়েতে থাকাকালীন বিখ্যাত যুদ্ধ-সাংবাদিক রবার্ট ফিস্কের ব্যতিক্রমধর্মী রিপোর্টাজ ও বইগুলো চুম্বকের মতো আকর্ষণ করত। বিশেষত তার মাস্টার পিস ‘দ্য গ্রেট ওয়ার অফ সিভিলাইজেশন’ পড়ে কতদিন আমি মানস ভ্রমণ করেছি আফগানিস্তান থেকে মরক্কো পর্যন্ত বিস্তৃত রণাঙ্গন থেকে রণাঙ্গনে। বরার্ট ফিস্ক লেবাননের বৈরুত থেকে প্রায় ৩৭ বছর মধ্যপ্রাচ্যে সাংবাদিকতা করেছেন (মৃত্যু ২০২০)। লেবাননের ওপর তার বিখ্যাত বই ‘পিটি দ্য ন্যাশন : লেবানন অ্যাট ওয়্যার’। উল্লেখ্য, লেবাননের বিখ্যাত কবি কাহলিন জিবরানের কবিতা ‘পিটি দ্য ন্যাশন’ বইটির নামকরণে অনুপ্রাণিত করেছিল। বইটিতে লেবানন যুদ্ধের ট্র্যাজেডি ও বিশেষ করে ইসরাইলি বাহিনীর বর্বরতার কথা নির্মোহভাবে উঠে এসেছে। গত কয়েকদিন ধরে আবার লেবানন জ্বলছে ইসরাইলি বাহিনীর বোমার আঘাতে। নিহত হয়েছে প্রায় ৪০০ লেবাননবাসী।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবের (১৯৭৯) পর শিয়া উত্থানের আশঙ্কা তুলে মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া ও সুন্নি বিভাজন তীব্র হয়েছে। তেল সমৃদ্ধ সুন্নি আরবরা ওই তেলের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বের প্রশ্নে এ দূরত্ব বাড়িয়েছে। এসব বিষয়ের কিছু প্রতিফলন মধ্যপ্রাচ্যে থাকতে দেখেছি।
মিসর ভ্রমণে এসে একবার সুয়েজ খাল পেরিয়ে সিনাই যাওয়া হলো। আর ৬০ কিলোমিটার গেলেই পৌঁছে যেতাম রাফায়। এরপরই ফিলিস্তিনের গাজা। গণহত্যাকারী ইসরাইলি বাহিনীর বোমায় এ প্রাচীন জনপদ সম্পূর্ণভাবে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। নিহত হয়েছে প্রায় ৭৫ হাজার মানুষ। তবে প্রকৃতির প্রতিশোধ বলে কথা আছে। ইরানি মিসাইলের আঘাতে এখন পুরো ইসরাইলে ধ্বংসের ক্ষত দৃশ্যমান।
পৃথিবীর সবচেয়ে সম্পদশালী অঞ্চল ‘মধ্যপ্রাচ্য’ অশান্তির আগুনে জ্বলছে ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধ থেকে। এরপর ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধ, ১৯৮২ সালের লেবানন যুদ্ধ, ১৯৯০ ইরাকের কুয়েত দখল, ১৯৯১ সালে বহুজাতিক বাহিনীর ইরাক আক্রমণ, ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আগ্রাসন, উগ্রপন্থি আইএসের তাণ্ডব, ইয়েমেন যুদ্ধ, গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসন এবং সবশেষে ইরান যুদ্ধ।
মধ্যপ্রাচ্যে কি এভাবেই চলবে মৃত্যুর অনন্ত মিছিল? এখানে কি কোনোদিন শান্তি আসবে না। এ বিষয়ে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে লেখক রবার্ট ডি কাপলানের কথাটা মনে পড়ল-‘দ্য মোস্ট জিওগ্র্যাফিকালি সেন্ট্রাল এরিয়া অফ দ্য ড্রাইল্যান্ড ইজ অলসো দ্য মোস্ট আনস্ট্যাবল’ (দ্য রিভেঞ্জ অফ জিয়োগ্র্যাফি)।
কুয়েতে আমার শিশুকন্যার (কার্মেল স্কুল) সহপাঠীনি-বান্ধবী ছিল ইরানের মিষ্টি মেয়ে জাহরা। যুদ্ধের প্রথম দিনে দক্ষিণ ইরানের মিনাবে একটি এলিমেন্টারি বালিকা বিদ্যালয়ে মার্কিন বোমার আঘাতে মৃত্যুবরণ করেছে কমপক্ষে ১৭০ জন ছাত্রী। আমার দেখা জাহরার মতো ১৭০টি ইরানি ফুল ঝরে পড়ল।
গাজায় গণহত্যাকারী ইসরাইলি বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে কমপক্ষে ২০ হাজার ফিলিস্তিনি শিশু। ১৯৯০ দশকে ইরাকি জনগণের ওপর চরম দুর্ভোগ নেমে আসে। জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার ফলে প্রায় ৫ লাখ ইরাকি শিশু খাদ্য-চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুবরণ করে বলে মনে করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে কি শিশু হত্যার এ উৎসব বন্ধ হবে না?
গত ১১ দিনে ইরানে অকল্পনীয় ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। অবকাঠামোর পর এবার ধ্বংস করা হচ্ছে পানি শোধনাগার ও তেলের স্থাপনা। কিন্তু ইরান বীরদর্পে প্রতিরোধ চালাচ্ছে। হামলার পর তাদের জাতীয় ঐক্য আরও সংহত হয়েছে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পারস্যরাজ রেজা শাহ পাহলভির নিমন্ত্রণ পেয়ে ১৯৩২ সালে ইরান ভ্রমণ করেন। ইরান-মুগ্ধ কবি ইরানের ঐক্য নিয়ে লিখেছেন-‘পারস্য সম্পূর্ণ এক, তার সভ্যতার মধ্যে কোনো আকারে ভেদবুদ্ধির ছিদ্র নেই। আঘাত পেলে সে পীড়িত হয়, কিন্তু বিভক্ত হয় না’ (পারস্য যাত্রী)।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিন নিয়ে বড় ধরনের সমস্যার কথা (ভয়ংকর বিস্ফোরণ) দূরদর্শী রবীন্দ্রনাথ ১৯৩০ সালেই উল্লেখ করেছিলেন। ১৯৩০ সালে জুয়িশ স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার পক্ষ থেকে একজন সাংবাদিক ফিলিস্তিনের বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘ইহুদি অধিকারবাদী নেতারা যদি ফিলিস্তিনের ইহুদিদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে আরবদের স্বার্থ থেকে পৃথক করে দেখতে চান, তাহলে পবিত্র ভূমিতে ভয়ংকর বিস্ফোরণ ঘটবে।’
আমেরিকার বিখ্যাত প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন তার প্রথম ভাষণে (১৮০১) বলেছিলেন-‘এই জাতি (আমেরিকা) বিশ্বের শ্রেষ্ঠ আশা।’ অথচ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যনীতি আশার পরিবর্তে লাখো কোটি মানুষের হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যৌথ হামলা একটি উচ্চ ঝুঁকির ভূ-রাজনৈতিক বাজি।
একদিকে ইরানে মার্কিন স্থল অভিযানের প্রস্তুতির কথা শোনা যাচ্ছে। একইসঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা-মধ্যস্থতার কথাও শোনা যাচ্ছে। রাশিয়া ও কাতার এ ক্ষেত্রে কাজ করছে বলে জানা যায়। এ যুদ্ধে কেউ জয়ী হবে না। এ যুদ্ধকে না বলতে হবে। বন্ধ হোক ইরানের ওপর এই মহা অন্যায়ের যুদ্ধ। শান্তি নামুক ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য।
মো. বায়েজিদ সরোয়ার : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, গবেষক ও বিশ্লেষক
সূত্র: যুগান্তর