
প্রিয় বাংলাদেশ- ষড়ঋতুর ছয় রূপে রূপায়িত অসংখ্য নদী, হাওড়, বাওড় খাল, বিল ও ঝিল সমৃদ্ধ বিশ্ব মানচিত্রের বক্ষে খোচিত একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। এর জন্মের নেপথ্যে যেমন রয়েছে বীরোচিত গৌরবময় ইতিহাস তেমনি অবারিত ভূখণ্ড জুড়ে রয়েছে নয়নাভিরাম শ্যামল প্রকৃতির মনোরম সৃষ্টি লীলা। এদেশের মানুষের মানবীয় অনুভূতি এই শ্যামল প্রকৃতির কমল স্পর্শে অবগাহিত হয়ে এক অনন্য সাধারণ সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে যা বঙ্গীয় সংস্কৃতি নামে বিশ্বে সমাদৃত। আবহমানকাল হতে এ অঞ্চলের মানুষের আবেগ-অনুভূতি জারি, সারি, ভাওয়াইয়া,ভাটিয়ালি, বাউল, মুর্শিদি, মারেফতি, পুঁথি, গীতি, কাব্য, গদ্য, নাট্য, নৃত্য, চারু, কারু প্রভৃতি সৃজনশীল শিল্পে রূপায়িত হয়ে আবর্তিত হয়ে আসছে। সংস্কৃতির এমন সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় শৈল্পিক রূপায়ন বিশ্বে সত্যিই বিরল কিংবা নজিরবিহীন!
একেক ঋতুর একেক রূপময়তায়
এখানকার প্রকৃতি রূপময়ী হয়ে ওঠে। তখন ঋতুর রঙে রঙিন হয়ে ওঠে মানুষের মনও। যেমন, শ্রাবণের ছন্দময় অঝোর বরষায় যখন প্রকৃতি সজীব হয়ে ওঠে তখন মানুষের মনও প্রকৃতির তালে নান্দনিক হয়ে ওঠে যা চারু, নৃত্যে, গানে, কাব্যে প্রতিফলিত হয়। প্রকৃতি'র এমন ধ্রুপদী রূপে প্রভাবিত হয়েই শিক্ষক বিউটি রানী পাল সম্প্রতি তার স্কুল ক্যাম্পাসে ধারনকৃত একটি রিল ভিডিও নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করেন। তাতে তিনি নব্বই দশকের কাব্যিক কথামালার একটি জনপ্রিয় গান ' শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে..' জুড়িয়ে দেন। পরবর্তীতে তা ভাইরালও হয়। কিন্তু তাতে একশ্রেণির ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর দ্বারা তিনি ব্যাপক সমালোচনা এবং ট্রলের শিকার হন। একপর্যায়ে তিনি নিরাপত্তার স্বার্থে থানায় জিডি করেন। তথ্যমতে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের পাঠদান, শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা, নাচ-গানের মাধ্যমে শিখন পাঠ , বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশবিষয়ক নানা কার্যক্রমের ভিডিও নিজের ফেসবুকে প্রকাশ করে আসছেন। অর্থাৎ, একজন শিক্ষকের যে ধরনের পারফরম্যান্স থাকা উচিত এর অনেকটাই তার মধ্যে আছে। বলা হয়- ' A good teacher is a good actor ' । ২০১৬ সালে তিনি সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষকও নির্বাচিত হন। তবে সমালোচনা ও ট্রলের বিপরীতে শিক্ষক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিককর্মী সহ সমাজের নানা শ্রেণি পেশার মানুষ সেই গান তাদের স্ব-স্ব সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করে তাকে সমর্থন জানিয়ে ট্রলের বিরুদ্ধে লাগাতার ভাবে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। প্রতিবাদের জোয়ারে সমালোচকরা একপ্রকার ভেসেই যাচ্ছে! সামগ্রিক বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ প্রায় সকল গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার পায়। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও ঐ গানের মাধ্যমে সৃজনশীল প্রতিবাদ জানাচ্ছে।ইতোমধ্যে বিউটি রাণী পালের প্রতি সংহতি জানিয়েছে ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক’ নামের সংগঠন।সংগঠনটির কয়েকজন সদস্য জনপ্রিয় এই গানের সাথে রিল ভিডিও তৈরী ও প্রচার করে তার প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। এমনকী প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীও এমন সৃজনশীলতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন যা সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে।
এটা বললে অত্যুক্তি হবেনা যে, আমাদের মনোসামাজিক (pschyco-socio) অবক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ ধর্মীয় সংকীর্ণতা।অর্থাৎ, ধর্মকে সাধারণ মানবীয় উদারতায়( যা ধর্মের মৌলিকত্ব) না ভেবে সাম্প্রদায়িক ও কুসংস্কারিক চিন্তায় ভাবলেই ধর্ম সংকীর্ণতায় আটকে যায়। তখন আহত হয় ধর্মের মাহাত্ম্য।
বলাবাহুল্য, শিক্ষায় স্বজাতীয় সংস্কৃতির চর্চা অপরিহার্যভাবে থাকা সমীচীন। এতে শিক্ষা পরিপুষ্ট ও উৎকর্ষিত হয়। ফলে সে শিক্ষায় যেমন স্বদেশ প্রেম জাগে তেমনি জাগে মানবিক মূল্যবোধ। শিক্ষা তখন ফলপ্রসু হয়ে স্বমহিমায় পূজনীয় হয়ে ওঠে। শিক্ষাকে মানবিকতায় পরপুষ্ট করতে সাংস্কৃতিক চর্চার বিকল্প নেই। অপসংস্কৃতি নয় বরং সৃজনশীল সংস্কৃতিই পারে সমাজ ও সভ্যতাকে সভ্যতর করে তুলতে।
প্রসঙ্গত, শিক্ষার্থীদের সুকুমারবৃত্তি বিকাশের ক্ষেত্রে সংগীত ও খেলাধুলার বিকল্প নেই। স্বভাবজাত তথা প্রবৃত্তিগত ভাবেই শিশুরা এ দু'য়ের প্রতি আকৃষ্ট থাকেন। কালজয়ী গ্রীক দার্শনিক মহামতি এ্যারিস্টটল শিক্ষায় শরীরচর্চা ও সংগীতের ওপর জোরালো ভাবে গুরুত্বারোপ করেছেন। শিশুদের সুকুমারবৃত্তি বিকাশের লক্ষে সরকার প্রাথমিক শিক্ষায় সংগীত ও শরীর চর্চা বিষয়ক শিক্ষক নিয়োগের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেও তা মৌলবাদীদের তীব্র অবাস্তব অভিযোগের মুখে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়ায় যা খুবই দুঃখজনক বটে। স্পষ্টতই এ সকল মৌলবাদীরা শিশুর স্বভাবজাত সৃজনশীল অধিকারকে নিঠুর ভাবে কেড়ে নিয়েছে যা কখনোই গ্রহনযোগ্য হতে পারে না। এতে শুধু শিশুর অধিকারকেই কেড়ে নেওয়া হয়নি উপরন্তু রাষ্ট্রের সৃজনশীল ভিত্তিমূলকেই প্রজন্ম পরম্পরা ধ্বংস করা হয়েছে যা দেশ ও জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে নিয়ে আসবে বৈকি! কেননা, সভ্য ও টেকসই সমাজ বিনির্মানে শিশুর সৃজনশীল শিক্ষার বিকল্প নেই। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ। সরকারের মতো এমন বিশাল রাস্ট্রযন্ত্র কেন এ হেন সংখ্যালঘু মৌলবাদীদের পশ্চাৎমুখী দাবির কাছে বারবার নতি স্বীকার করছে!? তবে কী রাস্ট্র এদের কাছে জিম্মি? নাকি সরকার? নাকি উভয়ই? এ প্রশ্ন এখন জনমনে বেশ জ্বলন্ত!
পরিলক্ষণীয়, অভ্যুত্থান পরবর্তী আমাদের সংস্কৃতি চর্চার ওপর একের পর এক আঘাত হানা হয়েছে যা গভীর উদ্বেগের এবং হতাশার বটে। তৌহিদী জনতার ব্যানারে এক শ্রেণীর ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠী প্রচলিত ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদি পালনে বাধা প্রদান করে আসছে। এভাবে এক প্রকার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী বাউল-পালা গানের অনুষ্ঠানাদীও। দেশব্যাপী উপর্যুপরি আঘাত হানা হয়েছে বাউল শিল্পীদের উপর। বাদ যায়নি শিল্পকলার অনুষ্ঠানাদিও। আমাদের আবহমান বাঙালি সংস্কৃতি মূলত অসাম্প্রদায়িক সর্বজনীন মানবিক মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত; আর এখানেই সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্ঠীর গাত্রদাহ। তাত্ত্বিক ভাবেই তারা অসাম্প্রদায়িক সর্বজনীন মানবিকতায় বিশ্বাসী নয়। তাদের এই বিরোধিতা হীনরাজনৈতিক ধারায়ও চর্চিত হয় যা কখনো কখনো ভয়ংকর ও ঘৃণ্য ভাবে দৃশ্যমান হয়। 'জুলাই' এর গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের উদাসীনতায় অথবা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতায় দেশের আবহমান সংস্কৃতির ঐতিবাহী দুই বাতিঘর- 'উদীচী' ও 'ছায়ানট' এ ধর্মান্ধ সম্প্রদায়িকগোষ্ঠী নজিরবিহীন হামলা চালায়। সেখানে আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির বহু সংবেদনশীল স্মৃতিচিহ্ন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণাদি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করা হয় যা তদানীন্তন পশ্চিমপাকিস্তানী শাসকের দ্বারাও সম্ভব হয়নি। হামলাকারীদের চিহ্নিত করে আজো বিচারের আওতায় আনা হয়নি যা গভীর উদ্বেগ ও হতাশার বটে। অর্থাৎ, জাতিকে তার সংস্কৃতির ধারা থেকে বিচ্যুত করে চিরপক্ষাঘাতগ্রস্ত করে পশ্চাৎপদে ফেলে রাখাই হল এদের মূল উদ্দেশ্য। এই অপচেষ্টা তারা '৪৭ পরবর্তী হতে বংশ পরম্পরা চালিয়ে আসছে। অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে, '২৪ এর অভ্যুত্থান সৃষ্টিই হয়েছে ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে নয় বরং কালচারাল ফ্যাসিজম ও কালচারাল ফ্যাসিস্টের তকমা লাগিয়ে মুলতঃ চিরায়ত মাতৃসংস্কৃতি তথা বাঙালি সংস্কৃতি ধ্বংস করার জন্য। একই সাথে বাঙালিসংস্কৃতি প্রসূত দেশ ও জাতির ইতিহাস ঐতিহ্য চিরতরে নির্মূল করে অতীত অন্ধকারে দেশ ও জাতিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য! অভ্যুত্থানোত্তর এটাই তাদের দীর্ঘ লালিত মোক্ষম সুযোগ বলে তারা মনে করছে। সংস্কৃতির আকাশে আজ ঘন কালো মেঘের ঘনঘটা! বিষ্ময়ের বিষয় হলো- যে সকল কালচারাল এ্যাক্টিভিস্টরা '২৪ এর গণ অভ্যুত্থানকে প্রমোট করেছিল তারা কেউ এখন শিল্প-সংস্কৃতির এমন চরমতম অসহায় বেহাল দশায় পাশে দাঁড়াচ্ছেন না! সরব হচ্ছেন না কালচারাল ফ্যাসিস্ট প্রতিরোধের নামে মূলত কালচার রেজিস্ট এ মত্ত এ সকল কালচারাল কিলারদের বিরুদ্ধে! তাদের এ হেন দায়িত্বজ্ঞানহীন অপ্রত্যাশিত আচরণ সচেতন মহলকে রীতিমতো মর্মাহত ও হতবাক করেছে!
'২৪ এর অভ্যুত্থান পরবর্তী 'নতুন বন্দোবস্তের বাংলাদেশ' এর নামে তথাকথিত সংস্কারবাদী একটি শ্রেণি (যারা অভ্যুত্থানের সম্মুখ সারি) রাজনৈতিক ও সামাজিক চর্চায় যখন প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে চরম অশালীন ভাষার অপসংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট, তখন অসামাজিকতার বিরুদ্ধে গানে গানে এমন অভিনব সৃজনশীল প্রতিবাদ সংস্কৃতির মেঘাচ্ছন্ন কালো আকাশে একরাশ আলোকচ্ছটার জানান দিয়েছে। বার্তা দিয়েছে যে, কিছু ধর্মান্ধ, বিকৃতবাদী, হীনমন্য ও পশ্চাৎপদী বাদে সমাজের অধিকাংশ মানুষের সাংস্কৃতিক সুকুমারবৃত্তি লুপ্ত নয়, বরং সুপ্ত। তা জাগাতে শুধু প্রয়োজন সাংস্কৃতিক ধারার সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি যার মহাজাগরণ ঘটেছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের সমকালে।
লেখক- কলামিস্ট, গবেষক, প্রাবন্ধিক।