
১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের পর অনেক স্বপ্ন দ্রষ্টা ও রাষ্ট্রনায়ক গন বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আন্চলিক রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে
প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কাজ করে গেছেন। সময়ের বিবর্তনে বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে। বিগত ২০২৪ সালের ৫ ই আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সঠিক সিদ্ধান্ত ও সাহসী পদক্ষেপের ফলে বাংলাদেশের অবস্থান আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের শীর্ষে একটি কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানে থাকার কারণে এবং এর উদীয়মান অর্থনৈতিক অবকাঠামোর সুবাদে আঞ্চলিক রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু বা 'কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষাকারী' দেশ হিসেবে আবির্ভূত হতে চলেছে। এই অবস্থান অর্জনের জন্য বাংলাদেশ মূলত কয়েকটি প্রধান প্রধান ক্ষেত্রকে কাজে লাগাতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন ।
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক ভাবে অর্থনৈতিক ট্রানজিট ও কানেক্টিভিটি হাব ভূ-বেষ্টিত দেশের প্রবেশদ্বার হিসেবে
নেপাল, ভুটান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর “সেভেন সিস্টার্স “ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একমাত্র ও প্রধান সমুদ্র প্রবেশদ্বার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
মাল্টি মোডাল করিডোর ব্যবহার করে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর, চট্টগ্রামের বে-টার্মিনাল এবং মোংলা বন্দরকে আধুনিক রেল ও সড়ক নেটওয়ার্কের আওতায় এনে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ সেতুতে পরিণত করা সম্ভব। এর ফলে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে এই অঞ্চলের বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু ।
বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর মাঝে দক্ষ ভারসাম্য রক্ষা করে Smart Hedging Strategy পক্ষের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে যেমন চীন, রাশিয়া, ভারত, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো সামরিক জোটে না জড়িয়ে নিছক বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে পারলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে এ অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্রস্থল হিসেবে গণ্য করা হবে ।
পোর্ট ডিপ্লোম্যাসি ব্যবহার করে মাতারবাড়িতে জাপান, বে-টার্মিনালে সিঙ্গাপুর ও দুবাই এবং মোংলায় চীনকে যুক্ত করার মতো বৈচিত্র্যময় নীতি বজায় রাখলে কোনো একক পরাশক্তি বাংলাদেশকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবে না। এটি বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক দরকষাকষির ক্ষমতা বা Bargaining Power বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
ব্লু-ইকোনমি ও সমুদ্র সম্পদের নেতৃত্ববঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে বিশাল সমুদ্রসীমা জয়ের পর বাংলাদেশ যদি নিজস্ব প্রযুক্তিতে ব্লু-ইকোনমি যেমন সমুদ্র সম্পদ আহরণ, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও গভীর সমুদ্রের মাছ ধরা সহ বিভিন্ন খাতের পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারে, তবে এই অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তা ও মৎস্য বাণিজ্যের চালিকাশক্তি হবে বাংলাদেশ।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা সমুন্নত করে বঙ্গোপসাগরে জলদস্যুতা রোধ ও নিরাপদ জাহাজ চলাচলের সুরক্ষায় নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নিজের অপরিহার্য গুরুত্ব প্রমাণ করতে পারলে রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।
আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক জোটকে পুনরুজ্জীবিত করে বিসমটেক ও সার্ক জোট কে কার্যকর করতে হবে। বাংলাদেশ উপ-আঞ্চলিক জোট 'বিমসটেক'-কে শক্তিশালী করার মাধ্যমে ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভুটানের সাথে বহুমাত্রিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি FTA করতে পারে। কার্যত সার্ক অচল হয়ে পড়ার উপক্রম।বিমসটেকের মতো অর্থনৈতিক ফোরামে বাংলাদেশ যদি নেতৃত্ব দিতে পারে, তবে তা আঞ্চলিক রাজনীতিতে ঢাকার প্রভাব বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতানীতিনির্ধারণী ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পরাশক্তিগুলোর চাপ মোকাবিলা করে আঞ্চলিক কেন্দ্রবিন্দু হতে হলে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদী বৈদেশিক নীতি অপরিবর্তিত রাখা জরুরি।
বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশকে আরো শক্তিশালী করে দুর্নীতিমুক্ত ও আধুনিক লজিস্টিকস অবকাঠামো নিশ্চিত করার মাধ্যমে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার Global Supply Chain অংশ হওয়া, যা পরাশক্তিগুলোকে বাংলাদেশে তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখতে উৎসাহিত করবে।
বাংলাদেশ যদি সফলভাবে সবার সাথে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব, কারো সাথে সামরিক বৈরিতা বা দাসত্ব নয় - এই নীতি কঠোরভাবে ধরে রাখতে পারে, তবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবিত করার প্রধান চাবিকাঠি থাকবে ঢাকার হাতেই। এই নীতিটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে "স্মার্ট হেজিং বা ভারসাম্য রক্ষার কৌশল নামে পরিচিত। এ নীতি অনুসরণ করা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে বিরাট “চ্যালেঞ্জ” বটে।
বাংলাদেশ যদি সঠিক নেতৃত্ব ও সঠিক নীতি অনুসরণ করে এ সকল চ্যালেঞ্জ সমুহকে মোকাবেলা করে সফলভাবে এই নীতি বজায় রাখতে পারে, তবে পরাশক্তিগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত না হবার সম্ভাবনাই বেশি। অপরদিকে , সব পরাশক্তিই বাংলাদেশকে নিজেদের পাশে পেতে চাইবে, যা আঞ্চলিক রাজনীতিতে ঢাকাকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু Strategic Balancer হিসেবে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
লেখক : কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, নিউইয়র্ক।