
১৯৭০ সালের ৬ এপ্রিল। সবুজবেষ্টিত গাজীপুরের ভাওয়াল অঞ্চলে বসন্তের শেষ সময়। সাদা মেঘের মতো অপরূপ ফুল ফুটেছে গজারি বনে। সেদিন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট গাজীপুরে ‘পাকিস্তান অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি’ উদ্বোধন করেন। স্বাধীনতার পর এ সমরাস্ত্র কারখানাটি ‘বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরি’ বা বিওএফ হিসাবে দেশের অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এর ৫৬ বছর পর, ২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্পে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটের নিকটবর্তী সলিমপুরে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা জলিল টেক্সটাইল মিলের প্রায় ৫৫ একর জমি বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির সম্প্রসারণের জন্য সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
হস্তান্তর চুক্তির স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. একেএম শামছুল ইসলাম ও সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানসহ সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সঠিক পরিকল্পনা নেওয়া হলে সলিমপুর বাংলাদেশের একটি বৃহত্তর প্রতিরক্ষা শিল্প ও প্রযুক্তি ব্যবস্থার সূচনা করতে পারে। তবে সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু কারখানা নির্মাণ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন গবেষণা, প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, বেসরকারি শিল্প, বিশ্ববিদ্যালয়, সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার সমন্বয়।
দীর্ঘ পথচলার ইতিহাস
বাংলাদেশের এ অঞ্চলে সমরাস্ত্র কারখানা স্থাপনের দাবি নতুন ছিল না। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা, ১৯৬৬ সালের ৬ দফার বিস্তারিত ব্যাখ্যায় এবং ১৯৬৯ সালের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফায় পূর্ব পাকিস্তানে সমরাস্ত্র কারখানা স্থাপনের দাবি উঠে আসে। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক দুর্বলতাও স্পষ্ট করে দেয়। এরপর গাজীপুরের চতর এলাকায় সমরাস্ত্র কারখানা প্রতিষ্ঠার (১৯৬৮) কাজ এগিয়ে যায়। চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় (নরিনকো) প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়। এ দেশের মেধাবী সন্তান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জহুর উল ইসলাম এ প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প পরিচালক হিসাবে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন।
শুরুতে মূলত রাইফেল ও গোলাবারুদ উৎপাদনের পরিকল্পনা থাকলেও পরে কারখানার সক্ষমতা বাড়ে। স্বাধীনতার পর বিওএফ বাংলাদেশের সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য সরঞ্জাম উৎপাদন করে আসছে। এখন সলিমপুরে দ্বিতীয় উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ সেই দীর্ঘ পথচলার নতুন অধ্যায়। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুরু হওয়া উদ্যোগটি বাস্তবায়িত করল এ সরকার।
কেন সলিমপুর গুরুত্বপূর্ণ
ভাটিয়ারি ও ফৌজদারহাটের মাঝে অবস্থিত সলিমপুরের অবস্থানের কয়েকটি সুবিধা আছে। এটি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের কাছে। সড়ক ও রেল যোগাযোগও ভালো। ফলে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি পরিবহণ সহজ হতে পারে। ভবিষ্যতে কোনো পণ্য রপ্তানি করা হলে বন্দরকেন্দ্রিক যোগাযোগও কাজে লাগবে; কিন্তু সুবিধার পাশাপাশি ঝুঁকিও বিবেচনা করতে হবে। পুরোনো টেক্সটাইল মিলের ভবনও সরাসরি আধুনিক প্রতিরক্ষা কারখানা হিসাবে ব্যবহার করা যাবে-এমন ধারণা করা ঠিক হবে না। প্রথমে পূর্ণাঙ্গ কারিগরি ও নিরাপত্তা জরিপ প্রয়োজন। যেসব স্থাপনা ব্যবহারযোগ্য, সেগুলো প্রশাসনিক ভবন, প্রশিক্ষণকেন্দ্র, গবেষণাগার বা গুদাম হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে। মূল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনে নতুন ও বিশেষায়িত অবকাঠামো তৈরি করতে হবে।
একটি দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার জন্য দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ বা বড় সংকটের সময় শুধু বিদেশি সরবরাহের ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধ বা সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটের কারণে প্রয়োজনের সময় অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাওয়া কঠিন হতে পারে।
তবে আত্মনির্ভরতার অর্থ এই নয়, বাংলাদেশকে সব ধরনের অস্ত্র ও প্রযুক্তি নিজেই তৈরি করতে হবে। আধুনিক অস্ত্রশিল্প অত্যন্ত জটিল। ইলেকট্রনিকস, অপটিকস, সেন্সর, বিশেষ ধাতু, সফটওয়্যার, বিস্ফোরক প্রযুক্তি এবং উন্নত যন্ত্রপাতির জন্য প্রায় সব দেশই কোনো না কোনোভাবে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। তাই বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত গুরুত্বপূর্ণ কিছু ক্ষেত্রে কৌশলগত স্বনির্ভরতা। এক্ষেত্রে তিনটি প্রশ্ন সামনে রাখা যেতে পারে-কোন সরঞ্জাম বাংলাদেশে সম্পূর্ণভাবে তৈরি করা সম্ভব? কোন সরঞ্জাম বিদেশি প্রযুক্তি নিয়ে দেশে সংযোজন বা যৌথভাবে উৎপাদন করা সম্ভব? আর কোন উচ্চপ্রযুক্তির সরঞ্জাম বিদেশ থেকে কেনাই অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে যুক্তিসংগত? এ বাস্তবভিত্তিক চিন্তা প্রতিরক্ষা শিল্পকে আরও কার্যকর করবে।
শুধু কারখানা নয়, প্রয়োজন গবেষণা
আধুনিক যুদ্ধ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ড্রোন, সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট যোগাযোগ, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। কম খরচের প্রযুক্তিও অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর হয়ে উঠছে। তাই সলিমপুরকে শুধু প্রচলিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক হবে না। এখানে একটি ‘ডিফেন্স রিসার্চ, ডেভেলপমেন্ট এবং ইনোভেশন সেন্টার’ গড়ে তোলা যেতে পারে।
তবে শুধু নতুন একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করলেই গবেষণা হবে না। তাকে কার্যকর করার জন্য সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাতের মধ্যে স্থায়ী যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে। সামরিক বাহিনী তার প্রয়োজন জানাবে। গবেষক ও প্রকৌশলীরা সমাধান তৈরি করবেন। শিল্পপ্রতিষ্ঠান তা উৎপাদন করবে। এরপর সামরিক বাহিনী বাস্তব পরিবেশে পরীক্ষা করবে। এ চক্রটি কার্যকর হলেই একটি সত্যিকারের ডিফেন্স ইনোভেশন ইকোসিস্টেম তৈরি হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি খাতকে যুক্ত করতে হবে
বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্প এখনো প্রধানত রাষ্ট্রীয় খাতনির্ভর। ভবিষ্যতে এ কাঠামো কিছুটা পরিবর্তন করা প্রয়োজন। সব প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সামরিক কারখানায় তৈরি করার প্রয়োজন নেই। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ড্রোন, সফটওয়্যার, যোগাযোগব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স, সাইবার প্রযুক্তি, বিশেষ পোশাক, প্রটেক্টিভ ইক্যুইপমেন্ট, ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পোনেন্ট এবং সিমুলেশন টেকনোলজিতে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী, প্রকৌশলী ও গবেষকদেরও প্রতিরক্ষা গবেষণায় যুক্ত করা যেতে পারে। গবেষণা অনুদান, ফেলোশিপ এবং কম্পেটিটিভ ইনোভেশন প্রোগ্রাম চালু করা যেতে পারে। এতে সামরিক সক্ষমতাও বাড়বে না। প্রতিরক্ষা গবেষণায় উদ্ভাবিত অনেক প্রযুক্তি পরে বেসামরিক শিল্পেও ব্যবহার করা যায়। উন্নত উপকরণ, রোবোটিকস, ইলেক্ট্রনিক্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সেন্সর এবং প্রিসিশন ইঞ্জিনিয়ারিং দেশের বৃহত্তর প্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নিতে পারে। এ ‘টেকনোলজি স্পিলভার’ দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য অস্ত্র রপ্তানির চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
রপ্তানির স্বপ্ন, তবে বাস্তবতা বুঝতে হবে
সলিমপুর প্রকল্পের একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা পণ্য রপ্তানি করা। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান দেশীয় চাহিদা পূরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অস্ত্র, গোলাবারুদ রপ্তানির সম্ভাবনার কথা বলেছেন। এ লক্ষ্য অসম্ভব নয়। তবে অস্ত্র রপ্তানি সাধারণ পণ্য রপ্তানির মতো সহজ নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে সফল হতে হলে পণ্যের মান, মূল্য, নির্ভরযোগ্যতা, খুচরা যন্ত্রাংশ, বিক্রয়-পরবর্তী পরিষেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। ক্রেতা দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো দায়িত্বশীল রপ্তানি ব্যবস্থা। তাই রপ্তানির স্বপ্ন থাকা ভালো, কিন্তু প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত মানসম্পন্ন ও নির্ভরযোগ্য উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা।
প্রয়োজন একটি জাতীয় প্রতিরক্ষা শিল্পনীতি
সলিমপুর প্রকল্প সফল করতে হলে বিচ্ছিন্নভাবে একটি কারখানা তৈরি করলে হবে না। বাংলাদেশের একটি দীর্ঘমেয়াদি ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্ট্র্যাটেজি’ প্রয়োজন। এ নীতিতে ঠিক করতে হবে কোন প্রযুক্তি দেশে তৈরি করা হবে, কোন ক্ষেত্রে বিদেশি অংশীদার নেওয়া হবে, কোথায় টেকনোলজি ট্রান্সফার প্রয়োজন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কীভাবে যুক্ত হবে এবং গবেষণার অর্থায়ন কীভাবে হবে। প্রতিরক্ষা ক্রয়নীতিও এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। বিদেশ থেকে বড় অস্ত্র বা সরঞ্জাম কেনার সময় যেখানে সম্ভব টেকনোলজি ট্রান্সফার, লোকাল অ্যাসেম্বলি, রক্ষণাবেক্ষণ সামর্থ্য এবং স্থানীয় জনবলের প্রশিক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। একইসঙ্গে প্রয়োজন সুশাসন। প্রতিরক্ষা খাতে নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা অবশ্যই থাকবে। কিন্তু তার পাশাপাশি মান নিশ্চিতকরণ, ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টিবিলিটি, পারফরম্যান্স অ্যাসেসমেন্ট এবং কার্যকর প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থা প্রয়োজন।
পুরোনো শিল্পের নতুন জীবন
সলিমপুর উদ্যোগের একটি প্রতীকী গুরুত্বও রয়েছে। ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত যে জলিল টেক্সটাইল মিল একসময় শিল্পায়নের অংশ ছিল, সেটি ২০০৪ সালে বন্ধ হয়ে যায় এবং দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকে। এখন সেই ভূমি একটি নতুন জাতীয় শিল্প উদ্যোগের ভিত্তি হতে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, সরকার বন্ধ হয়ে যাওয়া বিভিন্ন ধরনের কলকারখানা নতুনভাবে ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে। সাবেক শ্রমিকদের কোনো বৈধ পাওনা বা দায়দায়িত্ব বাকি থাকলে তা ন্যায়সংগতভাবে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণের সময় পুরোনো মানুষের অধিকারও সম্মান করা হয়।
এ লেখকের সঙ্গে দুই প্রতিষ্ঠানেরই একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসাবে একসময় জলিল টেক্সটাইল মিল রক্ষার প্রচেষ্টায় আইনি লড়াইয়ে যুক্ত ছিলাম। আবার বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির ডেপুটি কমান্ড্যান্ট হিসাবে বিওএফের সম্প্রসারণ পরিকল্পনার সঙ্গেও কাজ করার সুযোগ হয়েছে। তাই সলিমপুরের এ পরিবর্তন আমার কাছে শুধু একটি নতুন শিল্প প্রকল্প নয়; এর সঙ্গে আমার পেশাগত জীবনের দুটি অধ্যায়ও যেন এক জায়গায় এসে মিলেছে।
শেষ কথা
বর্তমান সরকার সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। জলিল টেক্সটাইল মিলের জমি বিওএফের সম্প্রসারণে ব্যবহার সেই বৃহত্তর প্রচেষ্টারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে দেখা যেতে পারে।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়ন, সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সামরিক খাতে বাজেট বৃদ্ধি ও সামরিক বাহিনীর উন্নয়নের বিষয়গুলো গণপরিসরে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। বিশেষত সামাজিক মাধ্যমে এক ধরনের ঝড় উঠেছে।
গাজীপুর থেকে সলিমপুরের যাত্রা শুধু দুটি স্থানের গল্প নয়, এটি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ। সলিমপুরে নতুন কারখানা নির্মাণ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কারখানা নির্মাণই শেষ কথা নয়। প্রকৃত সাফল্য আসবে যখন উৎপাদনের সঙ্গে গবেষণা, প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনবল, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি শিল্প, সুশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা যুক্ত হবে। বাংলাদেশের লক্ষ্য সব অস্ত্র নিজে তৈরি করা হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি করা, বিদেশি নির্ভরতার ঝুঁকি কমানো এবং একটি শক্তিশালী জাতীয় প্রযুক্তি ভিত্তি গড়ে তোলা।
১৯৭০ সালে গাজীপুরে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালের সলিমপুর সেই যাত্রাকে নতুন দিকে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সলিমপুর এখন একটি সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনাকে টেকসই জাতীয় সক্ষমতায় রূপান্তর করাই হবে আসল পরীক্ষা। গাজীপুরের সমরাস্ত্র কারখানাটির উদ্বোধনী ফলকে (১৯৭০) কবি নজরুলের বিখ্যাত একটি কবিতার লাইন উৎকীর্ণ ছিল।
‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাপার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুশিয়ার’
নতুন পর্যায়ে বাংলাদেশে প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশে বিভিন্ন বাধা ও চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। আশা করি, সরকার ও সামরিক কর্তৃপক্ষ এসব বাধা ও চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে প্রতিরক্ষা শিল্পকে পরিকল্পিত ও শক্তিশালীভাবে গড়ে তুলবেন। পাহাড়, অরণ্য ও সমুদ্র তীরবর্তী ফৌজদারহাট-সলিমপুরে ফুটুক প্রতিরক্ষা শিল্পের সুরভিত নতুন ফুল।
মো. বায়েজিদ সরোয়ার : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরির সাবেক ডেপুটি কমান্ড্যান্ট
সূত্র: যুগান্তর