
বাংলাদেশের আয়ের খাতে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ বিশাল যোগান দিয়ে থাকে।সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ বহির্বিশ্ব থেকে রেকর্ড পরিমাণ ৩ হাজার ৫৫৬ কোটি ২০ লাখ বা ৩৫.৫৬ বিলিয়নমার্কিন ডলার রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় পেয়েছে।৩৫.৫৬ বিলিয়ন ডলার যা সর্বোচ্চ রেকর্ড । ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট আয় ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলার।২০২৩-২৪ অর্থবছরে আয় ২৩.৯১ বিলিয়ন ডলার। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে প্রতি বছরই রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়ছে ।
বাংলাদেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৬২ শতাংশই আসে মাত্র ৫টি দেশ থেকে । সৌদি আরব বরাবরের মতোই শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। ১১ মাসের হিসাবে প্রায় ৫২৭ কোটি ৯৭ লাখ মার্কিন ডলার । যুক্তরাজ্য UK দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। মাঝে মে মাসে এটি একক মাস হিসেবে শীর্ষেও উঠেছিল ।সংযুক্ত আরব আমিরাত UAEরেমিট্যান্স প্রেরণে তৃতীয় শীর্ষ দেশ।মালয়েশিয়া তালিকার চতুর্থ স্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র USAপঞ্চম শীর্ষ প্রবাসী আয়ের উৎস।
শীর্ষ রেমিট্যান্স গ্রহণকারী জেলাসমূহবাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোট রেমিট্যান্সের অর্ধেকেরও বেশি ৫২.৯২% আসে মাত্র তিনটি জেলায় -ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা।
ঢাকা জেলা শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে , আয় প্রায় ১৩.৪৭ বিলিয়ন ডলার । ঢাকায় অনেক প্রধান কার্যালয় বা ব্যাংকিং হাবের কারণে কেন্দ্রীয় হিসাব এখানে বেশি দেখায়। চট্টগ্রাম জেলা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স অর্জনকারী , আয় প্রায় ৩.২৭ বিলিয়ন ডলার । কুমিল্লা জেলা তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে , আয় প্রায় ২.০৮ বিলিয়ন ডলার । অন্যান্য শীর্ষ জেলা সমূহের মধ্যে শীর্ষ ১০-এর বাকি জেলাগুলো হলো যথাক্রমে সিলেট, নোয়াখালী, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, টাঙ্গাইল এবং মুন্সীগঞ্জ।
বাংলাদেশে প্রতি বছর হিসাব বহির্ভূত বা হুন্ডির মতো অবৈধ চ্যানেলে ঠিক কত ডলার রেমিট্যান্স আসে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ও সর্বসম্মত আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান নেই।তবে বিভিন্ন গবেষণা, অর্থনীতিবিদ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাক্কলন অনুযায়ী, মোট রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক পথে আসে বলে অনুমান করা হয়।বিভিন্ন খাতের প্রাক্কলন ও বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতি বছর প্রায় ৫ বিলিয়ন থেকে শুরু করে ২০ বিলিয়ন ডলার বা তার বেশি সমপরিমাণ অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে লেনদেন বা হিসাবের বাইরে থেকে যায়। কিছু গবেষণায় অনানুষ্ঠানিক প্রবাহ মোট বৈধ প্রবাহের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়। হুন্ডির মাধ্যমে টাকা লেনদেনের প্রধান কারণ মূলত দেশ থেকে অর্থ পাচার (আন্ডার-ইনভয়েসিং বা ওভার-ইনভয়েসিং এর মাধ্যমে বাণিজ্য জালিয়াতি) এবং প্রবাসীদের কাছে খোলা বাজারে ডলারের বেশি দর পাওয়ার লোভ অবৈধ বা হিসাব বহির্ভূত চ্যানেলগুলোকে উৎসাহিত করে।সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সরকারের কড়াকড়ি ও আইন প্রয়োগের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা বেশ ভালো রকম বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরকারি মাধ্যমে বা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রধান সুবিধাগুলো হল আর্থিক সুবিধা ও প্রণোদনা ও নগদ প্রণোদনা প্রাপ্তি ।বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠালে সরকার সরাসরি ২.৫% নগদ আর্থিক সহায়তা বা বোনাস দেয়।ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত বোনাস দান করে । অনেক ব্যাংক গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে সরকারি প্রণোদনার বাইরে আরও বাড়তি শতাংশ বোনাস প্রদান করে।উচ্চ বিনিময় হার ও প্রদান করে ।সরাসরি ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠালে বর্তমান সময়ে অফিশিয়াল ও প্রতিযোগিতামূলক ডলার রেট পাওয়া যায়।নিরাপত্তা ও মানসিক শান্তিতে শতভাগ নিরাপদ থাকা যায়।ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানোর কারণে অর্থ হারানোর বা প্রতারিত হওয়ার কোনো ঝুঁকি থাকে না । প্রেরিত অর্থ সরাসরি সুবিধাভোগীর ব্যাংক হিসাব বা মোবাইল ব্যাংকিং যেমন: বিকাশ, নগদ , রকেট এর মাধ্যমে অ্যাকাউন্টে নিরাপদে পৌঁছে যায়। ফলে গ্রাহক নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন। বৈধ চ্যানেলে আসা অর্থ সম্পূর্ণ সাদা বা বৈধ টাকা হিসেবে গণ্য হয়, যা নিয়ে পরবর্তীতে কোনো আইনি জবাবদিহিতা থাকে না।দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ-সুবিধাঋণ প্রাপ্তিতে সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বৈধ পথে নিয়মিত রেমিট্যান্স পাঠালে দেশে প্রবাসী ঋণ, গৃহনির্মাণ ঋণ বা ব্যবসা শুরুর জন্য ব্যাংক থেকে সহজে লোন পাওয়া যায়। ওয়েজ আর্নার্স বন্ড, প্রাইজবন্ড বা প্রবাসী সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে উচ্চ মুনাফা আয়ের সুযোগ থাকে।
সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স প্রেরণকারী ব্যক্তি সরকার কর্তৃক বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা সিআইপি হিসেবে স্বীকৃতি এবং বিশেষ নাগরিক সুবিধা পান। যেমন , সিআইপি কার্ডধারী প্রবাসীরা সচিবালয়ে প্রবেশ, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ, বিমানের টিকিট বুকিংয়ে অগ্রাধিকার এবং বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের মতো উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সুযোগ-সুবিধা পান।
বাংলাদেশ সরকার প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি এবং লাইফলাইন হিসেবে মূল্যায়ন করে থাকেন ।
এছাড়াও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন নীতি নির্ধারণী বক্তব্যে প্রবাসীদের রেমিট্যান্স যোদ্ধা বা দেশের অর্থনীতির সূর্যসন্তান হিসেবে অভিহিত করা হয়।
প্রবাসীদের বিদেশে যাওয়ার ঋণ এবং দেশে ফিরে আসার পর ব্যবসা করার জন্য সরকার বিশেষায়িত 'প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক' প্রতিষ্ঠা করেছে ।
এ ব্যংক এর মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার জন্য কম সুদে অভিবাসন ঋণ এবং বিদেশ ফেরত কর্মীদের দেশে ব্যবসা ও পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ 'পুনর্বাসন ঋণ' প্রদান করা হয় ।
বাংলাদেশের সরকারি হিসাব এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আনুমানিক ১ কোটি ৫০ লক্ষ থেকে ১ কোটি ৫৫ লক্ষ ১৫০ থেকে ১৫৫ লক্ষ প্রবাসী বাংলাদেশি বসবাস ও কর্মরত আছেন । যাদের ঘাম ঝরানো উপার্জন দেশের অর্থনীতিতে অক্সিজেন জোগাচ্ছে এবং তাঁদের জন্য বাংলাদেশ গর্বিত ।
২৬ আগস্ট ২০২৬ ,নিউইয়র্ক
লেখক: কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।