
যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা যমুনা সুরমা বহমান ,
ততদিন তুমি বেঁচে থাকবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা কারণ তিনি দীর্ঘ শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিকে একতাবদ্ধ করেন, ১৯৭১ সালে ঐতিহাসিক নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করেন এবং আজীবন সংগ্রাম করে বাঙালির আত্মপরিচয় ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন।তিনি ছয় দফা দাবি পেশ করে বাঙালির মুক্তির সনদ তৈরি করেন।১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মাধ্যমে তিনি পুরো জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেন।১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চের শুরুতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।তিনি ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল চালিকাশক্তি ও আজীবন সংগ্রামী নেতা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন, প্রধান আন্দোলনসমূহ এবং বাঙালির স্বাধিকার লড়াইয়ে তাঁর ঐতিহাসিক অবদানগুলোর একটি কালানুক্রমিক ও বিস্তারিত বিবরণ সংকলিত করা হলো । তিনি ১৯৫২ র ভাষা আন্দোলনের ছাত্র রাজনীতি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনে তিনি অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। রাজপথের আন্দোলন থেকে শুরু করে কারাবন্দী অবস্থায় অনশন পালনের মাধ্যমে তিনি বাঙালির ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী অবদান রাখেন।১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালির অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি সংবলিত ঐতিহাসিক দাবি পেশ করেন। এটিকে বাঙালির "মুক্তির সনদ" বা ম্যাগনা কার্টা বলা হয়, যা পরবর্তীতে স্বাধীনতার মূল ভিত্তি তৈরি করে।পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। কিন্তু প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় এবং ১৯৬৯ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসভায় তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে "বঙ্গবন্ধু" উপাধিতে ভূষিত করা হয়।১৯৭০ সালের বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এই বিজয় পাকিস্তানের শাসন কাঠামোতে বাঙালিদের বৈধ রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ তিনি রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার সামনে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।" এই ভাষণটি ছিল মূলত স্বাধীনতার পরোক্ষ ও কৌশলগত দিকনির্দেশনা।
বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের প্রায় ৪,৬০০ দিনেরও বেশি সময় কারাগারে কাটিয়েছেন, কিন্তু বাঙালির অধিকারের প্রশ্নে কখনো শাসকগোষ্ঠীর সাথে আপস করেননি।তিনি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ভিত্তিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের এক শক্তিশালী চেতনা তৈরি করেন।
মুক্তিসংগ্রামের যুদ্ধের পুরোটা সময় তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকলেও তাঁর নাম ও আদর্শই ছিল রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াইয়ের মূল অনুপ্রেরণা।
১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেন। স্বাধীনতার মাত্র এক বছরের মধ্যে, ১৯৭২ সালের ১৬ই নভেম্বর তিনি দেশকে একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক সংবিধান উপহার দেন। তাঁর সফল কূটনৈতিক তৎপরতায় ১৯৭২ সালের মার্চ মাসের মধ্যেই ভারতীয় মিত্রবাহিনী বাংলাদেশ ত্যাগ করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতিসংঘ, ওআইসি, এবং কমনওয়েলথসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, সেতু ও বন্দর পুনর্নির্মাণ করেন এবং ৪ কোটিরও বেশি শরণার্থীকে পুনর্বাসন করেন। তিনি কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন করেন এবং প্রায় ৩৭,০০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ (সরকারি) করেন। আজ হতে ৪৯ বছর আগে (১৭,৮৯৬ দিন)
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের নিজ বাসভবনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একদল বিদ্রোহী সদস্যের হাতে সপরিবারে নিহত হন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ও স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্যও প্রাণ হারান।বাঙালি জাতিকে ইতিহাসের আরেকটি মর্মান্তিক অধ্যায়ের সাক্ষী হতে হলো ।
লেখক : কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।