কৃষি কূটনীতিতে বাংলাদেশ ও মহাপরিকল্পনা             

আবদূর নূর
ডেস্ক রিপোর্ট
  ১২ আগস্ট ২০২৬, ১৯:৪৩
আপডেট  : ১২ আগস্ট ২০২৬, ১৯:৫৭


বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল কৃষি প্রধান দেশ । এখানকার মাটি ,বায়ু এ মানুষ কৃষি বান্ধব ।ফলে বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য কৃষি কূটনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ।
বাংলাদেশের কৃষি কূটনীতি হলো খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, কৃষি প্রযুক্তির আদান-প্রদান ঘটাতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে অন্যান্য দেশের সাথে কূটনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার একটি কার্যকর মাধ্যম। এর মাধ্যমে জলবায়ু সহনশীল জাত উদ্ভাবন এবং কারিগরি সহায়তা নেওয়া হয়।
কৃষি কূটনীতির প্রধান লক্ষ্য হলো উন্নত দেশের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, জলবায়ু-সহনশীল বীজ ও কারিগরি দক্ষতা অর্জনে যৌথ সহযোগিতা বাড়াতে কাজ করা।
যার ফলশ্রুতিতে খাদ্য নিরাপত্তা লক্ষ‍্য  অর্জন করা যায় । বৈশ্বিক সংকট বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক রেখে নিরবচ্ছিন্ন খাদ্য ও কৃষি উপকরণ আমদানি নিশ্চিত করা।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের নিরাপদ ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের নতুন বাজার খোঁজা এবং রপ্তানি শুল্ক জটিলতা দূর করা।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা FAO বা IRRI-এর মতো বৈশ্বিক সংস্থার সাথে যৌথ প্রকল্প ও টেকসই কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে কাজ করা।
বাংলাদেশের কৃষি কূটনীতির পরিধি বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং রপ্তানি বাজারের প্রসারের সাথে তাল মিলিয়ে দিন দিন আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন চুক্তি ও অংশীদারিত্বের আলোকে এর একটি বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো: 
প্রধান দেশগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতাযুক্তরাষ্ট্র (USA): বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের আধুনিকীকরণ এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে কারিগরি সহায়তা চেয়েছে। এছাড়া, দেশে সয়াবিন চাষের সম্প্রসারণ এবং USDA-প্রত্যয়িত অর্গানিক খাদ্য মার্কিন বাজারে রপ্তানির লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। বাণিজ্য সহজ করতে বাংলাদেশ মার্কিন তুলা ও গম আমদানির প্রক্রিয়াও শিথিল করেছে।
আসিয়ান (ASEAN) ও মালয়েশিয়া: আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে কৃষি অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার সারাওয়াক প্রদেশের সাথে চাল উৎপাদন এবং গবাদি পশু উন্নয়নে একটি যৌথ সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
নেদারল্যান্ডস ও কানাডা: নেদারল্যান্ডসের ওয়াগেনিংগেন বিশ্ববিদ্যালয় এবং কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যৌথভাবে বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও গবেষণা ছড়িয়ে দিতে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি কার্যকর রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে অংশীদারিত্ব (FAO)জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) কারিগরি সহযোগিতা কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশে টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে এবং কৃষি খাতে রূপান্তর আনতে নতুন ৫টি বড় প্রকল্প চালু করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো প্রান্তিক চাষীদের জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানো।
নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক কূটনীতি  থেকে ধান ও বীজ প্রযুক্তি দেশের প্রধান ফসল চালের উৎপাদন বাড়াতে এবং লবণাক্ততা ও খরা-সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবনে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (IRRI)-এর সাথে বাংলাদেশ যৌথ গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে।
কৃষিপণ্য রপ্তানি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বৈশ্বিক বাজার ধরতে বাংলাদেশ বড় ধরনের জোর দিচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষিজাত পণ্য রপ্তানি ১ বিলিয়ন ডলারের কোটা স্পর্শ করেছে। বিশেষ করে ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, শাকসবজি এবং শুকনো খাবার রপ্তানি বৃদ্ধিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার কূটনৈতিক চেষ্টা চলছে।
বর্তমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ ও সার কূটনীতি চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে সার ও জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আমন ও বোরো মৌসুমে সারের নিরবচ্ছিন্ন জোগান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সাথে জরুরি ভিত্তিতে 'সার কূটনীতি' বা সরবরাহ চুক্তি বজায় রাখছে।
বাংলাদেশ সরকার কৃষি সম্প্রসারণ ও উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন ।
বাংলাদেশ সরকারের তৈরি করা এই ২৫ বছর মেয়াদী মহাপরিকল্পনাটির পোশাকি নাম “ট্রান্সফরমিং বাংলাদেশ এগ্রিকালচার: আউটলুক ২০৫০” (Transforming Bangladesh Agriculture: Outlook 2050)। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে প্রণীত এই রোডম্যাপের মূল লক্ষ্য হলো ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের ঐতিহ্যগত কৃষিকে সম্পূর্ণ আধুনিক, জলবায়ু সহনশীল ও বাণিজ্যিক রূপ দেওয়া।এই মহাপরিকল্পনায় মূলত ১৩টি প্রধান থিম বা খাত, ৩৫টি উপখাত এবং দেশের ৬টি এগ্রিকালচারাল হটস্পটকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। 

এই মহাপরিকল্পনার মূল বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো :

আধুনিক প্রযুক্তি ও আইটি (IT) নির্ভর কৃষি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ব্যবহার: কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), প্রিসিশন এগ্রিকালচার (নির্ভুল কৃষি), ড্রোনের মাধ্যমে মাঠ পর্যবেক্ষণ এবং ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে।

যান্ত্রিকীকরণ ও শ্রমশক্তি বৃদ্ধি: ফসলের মাঠে মানুষের কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে যান্ত্রিকীকরণ করা হবে। ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতি হেক্টরে খামারের শ্রমক্ষমতা ৩.২৪ কিলোওয়াট থেকে বাড়িয়ে ৫.১৯ কিলোওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই উৎপাদনপ্রাকৃতিক ঝুঁকি মোকাবেলা: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা, বন্যা ও লবণাক্ততার প্রভাব থেকে ফসল রক্ষা করতে বিজ্ঞানভিত্তিক রূপান্তর করা হবে।
জৈব বালাইনাশক ব্যবহার: ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের অন্তত ৭০% আবাদি জমিকে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM) এবং পরিবেশবান্ধব জৈব-বালাইনাশকের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

নিরাপদ খাদ্য ও রপ্তানি বৃদ্ধি (GAP & SPS)GAP শংসাপত্র: আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানির প্রধান শর্ত হলো নিরাপদ খাদ্য। এজন্য ২০২৮ সালের মধ্যে দেশের ৩ লাখ হেক্টর জমিকে গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস (GAP) বা উত্তম কৃষি চর্চা সার্টিফিকেশনের আওতায় আনা হবে।

এসপিএস কমপ্লায়েন্স: রপ্তানি সহজ করতে স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (SPS) শর্তাবলী কঠোরভাবে মেনে চলা হবে, যাতে উন্নত বিশ্বে বাংলাদেশের শাকসবজি ও ফলমূল কোনো বাধা ছাড়াই প্রবেশ করতে পারে।

কোল্ড চেইন ও মূল্য সংযোজন (Value Addition)সমন্বিত কোল্ড চেইন: বর্তমানে বাংলাদেশে বেশিরভাগ কোল্ড স্টোরেজ কেবল আলু সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হয়। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফলমূল ও শাকসবজির অপচয় রোধে প্রান্তিক চাষী-কেন্দ্রিক একটি সমন্বিত কোল্ড চেইন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।

অ্যাগ্রো-প্রসেসিং: কাঁচা পণ্য সরাসরি বিক্রি না করে সেগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে বৈশ্বিক বাজারে রপ্তানি করার জন্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও পুষ্টি নিরাপত্তাপ্রতিটি সংস্থার জন্য আলাদা রোডম্যাপ: কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ১৭টি সরকারি সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা আলাদা ২৫ বছর মেয়াদী কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে, যাতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে পারে।

ডিজিটাল সয়েল কার্ড: মাটির গুণাগুণ ঠিক রাখতে এবং সারের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করতে কৃষকদের জন্য ডিজিটাল সয়েল হেলথ কার্ডের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা আছে ।


লেখক : কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।
আগষ্ট ১২ , ২০২৬ নিউইয়র্ক ।