
বেকারত্বের সংকট ও বেকার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তার উদ্ভব ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই ।
বেকার সমস্যার উদ্ভব এবং এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ প্রধানত অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপের শিল্প বিপ্লব Industrial Revolution এবং আধুনিক পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকাশের মাধ্যমে ঘটেছিল।কৃষিভিত্তিক সমাজে মানুষ সাময়িক কর্মহীন হলেও "বেকার" নামক কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধারণার অস্তিত্ব ছিল না। শিল্পায়ন যখন সমাজকে মজুরি-ভিত্তিক শ্রমে রূপান্তরিত করে, তখনই এই সমস্যাটি একটি স্থায়ী রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের রূপ নেয়। বেকারত্বের বিবর্তনের মূল ধাপগুলো শিল্প বিপ্লব ও আধুনিক মজুরি প্রথা যা ১৮ শতকে শুরু হয় ।ইংল্যান্ডের 'এনক্লোজার অ্যাক্টস' Enclosure Acts এর মাধ্যমে সাধারণ কৃষকদের জমি দখল করে নেওয়া হয়। Enclosure Act বা বেষ্টনী আইন হলো ১৮ ও ১৯ শতকে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কর্তৃক পাশ করা কিছু আইনের সমষ্টি। এই আইনগুলোর মাধ্যমে পূর্বে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত থাকা গ্রামের যৌথ বা সাধারণ জমিগুলো ‘common land’ বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলা হয় এবং ধনী জমিদারদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করা হয় ।ফলে তারা জীবিকার জন্য পুরোপুরি কারখানার মজুরির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল ।
বাষ্পীয় ইঞ্জিন ও যান্ত্রিক তাঁতের আবিষ্কারের ফলে হাজার হাজার ঐতিহ্যবাহী তাঁতি ও কারিগর এক রাতে কাজ হারিয়ে ইতিহাসের প্রথম বড় 'প্রযুক্তিগত বেকারত্ব' Technological Unemployment এর শিকার হয়।
Technological unemployment ‘প্রযুক্তিগত বেকারত্ব’ হলো এমন এক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, যেখানে প্রযুক্তির উন্নয়ন, অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয়করণ
বা নতুন যন্ত্রপাতির আবিষ্কারের ফলে মানুষ তার চাকরি বা কর্মসংস্থান হারায় | সহজ কথায়, যখন কোনো মানুষের কাজ একটি রোবট, সফটওয়্যার বা মেশিন কম খরচে এবং দ্রুত গতিতে করতে শুরু করে, তখন সেই মানুষটি যে বেকারত্বের শিকার হন, তাকেই টেকনোলজিক্যাল আনএমপ্লয়মেন্ট বলা হয়.বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস John Maynard Keynes ১৯৩০ সালের দিকে এই পরিভাষাটি প্রথম জনপ্রিয় করে তোলেন।
শিল্প বিপ্লবের সময় ১৮১১-১৬ সাল ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের কারিগরেরা যখন দেখেন যে, যান্ত্রিক তাঁত বা Power Loom আসার কারণে তারা চাকরি হারাচ্ছেন, তখন তারা ক্ষিপ্ত হয়ে কারখানার মেশিন ভাঙচুর শুরু করেছিলেন। এদেরকে 'লুদাইত' বলা হয় । এটি ছিল ইতিহাসের অন্যতম প্রথম বড় প্রযুক্তিগত বেকারত্বের উদাহরণ।
বেকারত্ব শব্দের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ১৯ শতকের শেষভাগে ,১৮৮০-এর দশকের আগে ইংরেজি অভিধানে 'Unemployment' বা বেকারত্ব শব্দটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল না। কাজ না থাকাকে তখন ব্যক্তিগত অলসতা, ভাগ্য বা অপরাধ যাকে ভবঘুরেপনাহিসেবে দেখা হতো।১৮৮৯ সালে যুক্তরাজ্যে এবং ১৮৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম সরকারিভাবে "বেকার" Unemployed শব্দটিকে একটি অর্থনৈতিক পরিভাষা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, যা এটিকে একটি পদ্ধতিগত সামাজিক সমস্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
সরকারি ও আইনি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ শ্রম এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠা লাভ করে ১৯০৯ সালে ।যুক্তরাজ্যে উইলিয়াম বেভারিজের উদ্যোগে প্রথম সরকারি ‘লেবার এক্সচেঞ্জ’ বা কর্মসংস্থান ব্যাংক তৈরি হয়, যা বেকারদের তালিকাভুক্ত করা শুরু করে।
ব্রিটেন ১৯১১ সালে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জাতীয় 'বেকারত্ব বীমা আইন' National Insurance Act পাস করে। এর মাধ্যমে কর্মহীন নাগরিকদের রাষ্ট্রীয় ভাতা দেওয়া শুরু হয়, যা বেকারত্বকে সম্পূর্ণ আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
১৯২৯ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মহামন্দার বা Great Depressionসময় আমেরিকা ও ইউরোপের এক-চতুর্থাংশ মানুষ চাকরি হারায়।ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস প্রমাণ করেন যে, বেকারত্ব কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, এটি বাজারের কাঠামোগত ত্রুটি। এর ফলে ১৯৩৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে Social Security Act পাসের মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করাকে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। social security Act হলো ১৯৩৫ সালের ১৪ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাস হওয়া একটি ঐতিহাসিক আইন। প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট মহামন্দার সময় দেশের বয়স্ক, বেকার, প্রতিবন্ধী ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিতে এই আইন চালু করেছিলেন।
মুদ্দাকথা হলো মানুষের জমি থেকে বিচ্যুতি এবং কারখানার মজুরি-নির্ভর অর্থনীতির সৃষ্টিই বেকার সমস্যাকে একটি বৈশ্বিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।
চলবে.....
লেখক : কবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক