ফিরে দেখা

বাংলাদেশের চা শ্রমিকদের অধিকার আন্দোলনে শ্রমিক নেতা রাজেন্দ্র প্রসাদ বুনার্জী

ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৭ নভেম্বর ২০২৫, ১৪:৩৯
চা–শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে কালো দিন: ১৯৭২ সালের বসন্ত হত্যাকাণ্ড

বাংলাদেশের চা শিল্পাঞ্চলের ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা নিজেরা ছিলেন স্বল্পস্বচ্ছল, কিন্তু নেতৃত্ব দিয়েছেন হাজারো মানুষের অধিকার আন্দোলনে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ফুলছড়া চা বাগানের সন্তান রাজেন্দ্র প্রসাদ বুনার্জী সেই অগ্নিপুরুষদের একজন, যার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় সংগ্রাম, ত্যাগ ও নেতৃত্বের দীপ্তিতে উজ্জ্বল।
তার ৮৬ বছরের জীবন কেবল একজন শ্রমিক নেতার ব্যক্তিজীবন নয়; এটি চা শ্রমিক সমাজের জাগরণের ইতিহাস, আত্মমর্যাদার ইতিহাস, আর বিরুদ্ধ স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অদম্য সাহসের ইতিহাস।
অদম্য ইচ্ছাশক্তির উৎস: ফুলছড়া বাগান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৯৪০ সালের ২০ নভেম্বর ফুলছড়া চা বাগানে জন্ম নেওয়া রাজেন্দ্র প্রসাদ বুনার্জী এক সময় হয়ে ওঠেন পূর্ব বাংলার চা শ্রমিক সমাজের প্রথম উচ্চশিক্ষিত প্রতিনিধি। বাবার নাম দাসিয়া সরদার, যিনি নিজেও শ্রমিক সমাজের দুঃখ-কষ্ট দেখেছেন খুব কাছ থেকে। ১৯৬০ সালে শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া হাইস্কুল থেকে মেট্রিক পাস করে তিনি ভর্তি হন সিলেট এমসি কলেজে। ১৯৬৫ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ইতিহাস গড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে (এলএলবি) ভর্তি হন চা শ্রমিক সমাজের প্রথম শিক্ষার্থী হিসেবে। এরপর ১৯৬৮ সালে তিনি তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর মহকুমার সরিষাবাড়ী থানার সরকারি শ্রমকল্যাণ কেন্দ্রে শ্রমকল্যাণ সংগঠক পদে যোগ দেন মাত্র ১৫০ টাকা বেতনে। কিন্তু তার মন পড়ে থাকে চা শ্রমিক সমাজের মুক্তির সংগ্রামে।
শৈশবেই নেতৃত্বের বীজ: প্রথম ছাত্র সংগঠন গঠনের গল্প
১৯৪৮ সালের ৩ জুন তৎকালীন দক্ষিণ শ্রীহট্ট (বর্তমান মৌলভীবাজার) জেলার কুলাউড়া থানায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘শ্রীহট্ট চা শ্রমিক ইউনিয়ন’ (স্বাধীনতার পর নাম হয় বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন)। প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ছিলেন পূর্ণেন্দু কিশোর সেনগুপ্ত, এমএলএ; সহসভাপতি জীবন সাঁওতাল; সাধারণ সম্পাদক নিকুঞ্জ বিহারী চৌধুরী; সাংগঠনিক সম্পাদক দর্গেশ দেব। ১৯৫৪ সালে কুলাউড়ায় ইউনিয়নের এক সভায় বাবার সঙ্গে গিয়ে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র রাজেন্দ্র প্রথম শ্রমিক অধিকার নিয়ে বক্তৃতা শোনেন। তার মনে প্রশ্ন জাগে শ্রমিকদের ইউনিয়ন আছে, ছাত্রদের কেন নেই?


সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘শ্রীহট্ট জেলা চা শ্রমিক ছাত্র ইউনিয়ন’, যা পরে ছড়িয়ে পড়ে চা বাগানগুলোতে। সিলেটের কলেজে গিয়ে সংগঠনটি আরও বিস্তৃত হয়।
সংগঠন ও রাজনীতির কঠিন বাস্তব: সুলেমানের রোষানল থেকে গণআন্দোলনের উত্থান:
স্টুডেন্ট ইউনিয়নের দাবি তুলতেই তৎকালীন চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা এম সুলেমানের বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়। তবু সংগঠনের ঐক্য ধরে রেখে রাজেন্দ্র নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৬-৬৯ সালে বিভিন্ন বাগানে সম্মেলন, মিছিল ও ঐক্য গড়ে চা শ্রমিক সমাজে নতুন রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটে। ১৯৬৯ সালের আন্দোলনে চা শ্রমিকরা প্রথম সরকারি ন্যূনতম মজুরির স্বীকৃতি পায়, যা শ্রমিক রাজনীতির বড় মাইলফলক।
উত্থানের শীর্ষে ‘রাজেন্দ্র গ্রুপ’: আধুনিক চা শ্রমিক ইউনিয়নের জন্ম
১৯৭০ সালে সুলেমানের পলায়নের পর শ্রীমঙ্গলের ঐতিহাসিক রেলওয়ে মাঠে হাজারো শ্রমিকের সমাবেশে নতুন নেতৃত্ব গঠিত হয়। সেখানেই জন্ম নেয় আধুনিক চা শ্রমিক ইউনিয়ন, এবং সর্বসম্মতিক্রমে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন রাজেন্দ্র প্রসাদ বুনার্জী। এ সময় তিনি ‘মাছ’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন, যদিও জয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী।
যুদ্ধ, নির্যাতন ও আত্মগোপন: ১৯৭১ এর ভয়াল দিনগুলো
মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক সেনাবাহিনী ভাড়াউড়া, খাদিমনগরসহ বহু চা বাগানে হত্যাযজ্ঞ চালায়। ১৯৭১ সালের ৬ জুলাই ফুলছড়া বাগান থেকে রাজেন্দ্র প্রসাদ বুনার্জীকে ধরে সিন্দুরখান ক্যাম্পে নিয়ে নির্মম নির্যাতন করা হয়। পরদিন সাময়িক মুক্ত হলেও তাকে আত্মগোপনে থাকতে হয়।
১৯৭২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর চা শিল্পাঞ্চলের ইতিহাসে ভয়াবহ একটি দিন। সেদিন শ্রমিক নেতা বসন্ত বুনার্জীকে অপহরণ করে নির্যাতন শেষে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের পর বৃহত্তর সিলেটের লাখো চা শ্রমিক জঙ্গি আন্দোলনে ফেটে পড়ে। এর পেছনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের অংশবিশেষের প্রভাব ছিল, এমন অভিযোগ তখন জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে চা বাগান এলাকায় সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, নির্যাতন ও সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়িয়ে পড়ে। বসন্ত ছিলেন মাত্র ১৮ বছরের ছাত্রনেতা, যার আত্মত্যাগ চা শ্রমিক আন্দোলনে এক অনন্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছে। আজও প্রতিবছর ৩০ সেপ্টেম্বর তার শহীদ দিবস পালন করা হয়।
দীর্ঘ নেতৃত্বের ইতিহাস: ২০০৫ সাল পর্যন্ত অদম্য পথচলা
এরপর প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময়—২০০৫ সাল পর্যন্ত তিনি চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি ছিলেন চা শ্রমিক সমাজের প্রথম উচ্চশিক্ষিত, বিশ্লেষণধর্মী, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা। সমালোচনা এসেছে, রাজনীতি বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে তবু তার মতো প্রজ্ঞাবান নেতৃত্ব আর দেখা যায়নি অভিজ্ঞদের এমন অভিমত।
আজ তিনি বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। তার ফুলছড়া বাগানের ঘর এখনও চা শ্রমিক আন্দোলনের স্মৃতি বহন করে জীবন্ত ইতিহাস হয়ে রয়েছে।
রাজেন্দ্র প্রসাদ বুনার্জীর জীবন শুধু একজন ব্যক্তির জীবনী নয়, এটি চা শ্রমিক সমাজের সংগ্রাম, শিক্ষা, রাজনৈতিক চেতনা এবং আত্মমর্যাদার উত্থানের ইতিহাস। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন একটি নিপীড়িত সম্প্রদায়ের শিশু-কিশোরও একদিন ইতিহাস গড়তে পারে। তার নেতৃত্বের উত্তরাধিকার আজও চা শ্রমিক সমাজকে অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়ের জন্য পথ দেখায়।