
টানা ১৩ দিনের আলোচনার পর জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে কোনো বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হলো কপ৩০। ব্রাজিলের বেলেম শহরে এবারের জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন বিশ্বজুড়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে কার্যত হতাশ করেছে। এ তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশও। গত রোববার শেষ হওয়া সম্মেলনে একটি চুক্তি পাস হয়। এতে ১৯৪টি দেশ সম্মত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পুরো কাঠামোই ইচ্ছানির্ভর। চাইলে যে কোনো দেশ সরে যেতে পারবে। জলবায়ুকর্মীরা এটাকে সময়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সিদ্ধান্ত বলছেন। বড় ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলোর দাবি ছিল– জীবাশ্ম জ্বালানি পর্যায়ক্রমে বন্ধের রোডম্যাপ, শক্তিশালী অভিযোজন অর্থায়ন এবং স্বচ্ছ জবাবদিহি। কিন্তু এগুলোর বেশির ভাগই অনিশ্চিত।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই জলবায়ু ঝুঁকির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। উপকূল, কৃষিজমি, লবণাক্ততা, নদীভাঙন– সবখানেই জলবায়ু পরিবর্তন চাপ সৃষ্টি করছে। জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে কোনো বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত না হওয়ায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি আরও বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের কৃষি ও উপকূলীয় জনপদে। কিন্তু এবারের সম্মেলনেও অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিতেও নিশ্চিয়তা নেই। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, বহু প্রতিশ্রুতিই কাগজে থেকে গেছে।
এবারের বেলেম জলবায়ু সম্মেলন সম্পর্কে প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্যবিষয়ক গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, নানা দিক থেকে বেলেম সম্মেলন তাৎপর্যপূর্ণ। এই প্রথম আমাজন বনের আদিবাসীদের ভাষা থেকে সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ‘গ্লোবাল মুটিরাও’কে গ্রহণ করা হয়েছে। যদিও সম্মেলনে আমাজনের আদিবাসীদের প্রবেশ করতে না দিয়ে অন্যায় করা হয়েছে। বেলেমে অভিযোজন, ন্যায্য রূপান্তর, ক্ষয়ক্ষতি, এনডিসি, উষ্ণতা বিতর্ক, জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে আলাপ হলেও বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিল বিষয়ে এবারও কোনো অঙ্গীকার হয়নি। বিশ্বনেতাদের এ সময়ক্ষেপণ এবং অঙ্গীকার ভঙ্গের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু ন্যায়বিচারের আন্দোলন গড়ে উঠছে।’
পাভেল পার্থ বলেন, আমাদের দীর্ঘদিনের দাবিকে মেনে নিয়ে বাংলাদেশ এই প্রথমবারের মতো এনডিসিতে এগ্রোইকোলজি, নন-ইকোনমিক লস অ্যান্ড ড্যামেজ, লোকায়ত জ্ঞান, ন্যায্য রূপান্তর ও স্থানীয় অভিযোজনকে যুক্ত করেছে। এক হাজার ৬০০ করপোরেট লবিস্ট, বায়ার ও নেসলের মতো বহুজাতিক কোম্পানির স্পন্সর নিয়ে জলবায়ু সম্মেলন আয়োজনের বিরোধিতা আমরা করেছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ঋণ বা দয়া নয়, অনুদান হিসেবে জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিতের জোর দাবি তুলেছে। বেলেমে বর্ষারণ্য এবং বনবাসীদের নিয়ে নতুন একটি তহবিল গঠিত হয়েছে এবং রাসায়নিক সার থেকে সরে আসার একটি ঘোষণা এসেছে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সুযোগ আছে এসব চুক্তি এবং ঘোষণায় সই করে স্থানীয় জাত ও প্রাকৃতিক চাষাবাদ ও জনগোষ্ঠীভিত্তিক বনব্যবস্থাকে ত্বরান্বিত করতে জলবায়ু অর্থায়ন প্রাপ্তির জন্য প্রমাণসমেত দেনদরবার জোরালো করা।
গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, এখন আমাদের কাজ হবে দেশব্যাপী চর্চিত গ্রামীণ জনগণের লোকায়ত অভিযোজন, দেশীয় প্রাণসম্পদ, স্থানীয় জলবায়ু সংকট, ক্ষয়ক্ষতি– সবকিছুকে সুনির্দিষ্টভাবে নথিভুক্ত করা এবং এলাকাভিত্তিক জলবায়ু কর্মসূচি গ্রহণের ভেতর দিয়ে বৈশ্বিক নানামুখী জলবায়ু অর্থায়ন প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। এটি আমরা ততই ভালোভাবে করতে পারব, যত বেশি আমরা জলবায়ু কর্মসূচিকে ইনক্লুসিভ করতে পারব। সব মন্ত্রণালয় এবং দেশের সব কৃষি প্রতিবেশের জনগণকে একসঙ্গে নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার এবং এনডিসি বাস্তবায়নে কাজগুলো ভাগ করে দায়িত্ব নিয়ে করা দরকার।
একশনএইড বাংলাদেশের জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশনের ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ বলেন, বাংলাদেশের জন্য ন্যায্য রূপান্তরের শক্তিশালী অবস্থান নেওয়া জরুরি। জ্বালানি রূপান্তর কপ সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর নয়, দেশের নিজ উদ্যোগে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বের হয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সরে আসা প্রয়োজন। তিন দেশ– বাংলাদেশ, নেপাল ও ভূটান– গঠন করেছে একটি যৌথ জোট, যা আগামী দিনে জলবায়ু দরকষাকষিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, সরকার ও নাগরিক সমাজের সমন্বয় বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান হবে এবং অর্জনও নিশ্চিত হবে।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, কপ৩০ জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রাপ্তি আংশিক হলেও তাৎপর্যপূর্ণ। অভিযোজন অর্থায়ন বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি, ক্ষতিপূরণ তহবিলে নতুন অনুদান এবং প্রযুক্তিগত সহায়তায় উন্নত দেশগুলোর সহযোগিতার ইঙ্গিত আমাদের জন্য ইতিবাচক। তবে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। প্রতিশ্রুত অর্থ কত দ্রুত এবং কোন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর জন্য ব্যবহারযোগ্য হবে, সেটাই এখন দেখতে হবে।
তিনি বলেন, জলবায়ু-সংবেদনশীল দেশ হিসেবে আমাদের শক্তিশালী কূটনীতি, বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে দাবি উপস্থাপন এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন কাঠামো এখন আরও জরুরি। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফোরামে আমাদের কণ্ঠ আরও জোরালো করতে হবে, যাতে সমুদ্রপৃষ্ঠ উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, পানি সংকট ও নগর বায়ুদূষণের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত সহায়তা নিশ্চিত হয়। কপ৩০ আমাদের সুযোগ দিয়েছে, এখন সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন ও স্থিতিশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করাই মুখ্য লক্ষ্য হওয়া উচিত।
বাংলাদেশি যুব প্রতিনিধি ইয়ুথনেট গ্লোবালের এক্সিকিউটিভ কোঅর্ডিনেটর সোহানুর রহমান গভীর হতাশা প্রকাশ করে বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানি ধাপে ধাপে বন্ধের রোডম্যাপ নেই, ন্যায্য অর্থায়নও নেই। এতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের আরও বড় জলবায়ু বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
বেলেমে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের প্রধান আলোচক ছিলেন বুয়েটের অধ্যাপক ড. এ কে এম সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, কপ৩০ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর প্রয়োজনীয় প্রত্যাশা পুরোটা পূরণ করতে পারেনি। অভিযোজন অর্থায়ন হতে হবে শক্তিশালী। কারণ, বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলো ইতোমধ্যে চরম আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবে জীবন ও জীবিকা হারানোর ঝুঁকিতে।
সূত্র: সমকাল