মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংকট : রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধাক্কার শঙ্কা বাংলাদেশের

ডেস্ক রিপোর্ট
  ০৯ মার্চ ২০২৬, ১৬:০৭

মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি— রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার পর উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় শ্রমবাজার, বিমান যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের ওপর পড়তে শুরু করেছে। সংঘাতের মধ্যে তিন বাংলাদেশি নিহত এবং সাত জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে আকাশপথে যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় নতুন কর্মী পাঠানো কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু শ্রমবাজারই নয়, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস রেমিট্যান্স প্রবাহেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সে অনিশ্চয়তার শঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রভাব ইতোমধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অচলাবস্থার ঝুঁকি তৈরি করেছে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে শ্রমিক ছাঁটাই, কাজের সুযোগ কমে যাওয়া, কিংবা কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
একইসঙ্গে নতুন করে শ্রমবাজারও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে যে সীমিত স্বস্তি দেখা যাচ্ছে, তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট রেমিট্যান্স আয়ের প্রায় অর্ধেকই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। এসব দেশে প্রায় ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। গত অর্থবছরে শুধু এই অঞ্চল থেকেই এসেছে সাড়ে ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স। তবে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এই আয়ের ধারায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের শীর্ষ আট অর্থনীতিবিদ। শনিবার (৭ মার্চ) বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তারা এসব সুপারিশ তুলে ধরেন।
বৈঠকে অর্থনীতিবিদরা বলেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ অব্যাহত রাখতে হুন্ডি লেনদেনের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একইসঙ্গে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান এবং দক্ষ জনশক্তি রফতানি বাড়ানোর ওপর জোর দেন তারা। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের পরামর্শও দেন তারা।
বৈঠকে প্রবাসী আয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে শ্রমিকদের চলাচল ও কর্মসংস্থানে বিঘ্ন ঘটতে পারে—যার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে রেমিট্যান্স প্রবাহে। এ কারণে প্রবাসীদের জন্য বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও কম খরচে করার উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারা।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।
রবিবার (৮ মার্চ) দুপুরে সিলেট জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ আশঙ্কার কথা জানান।
মন্ত্রী বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে স্বাভাবিকভাবেই রেমিট্যান্স প্রবাহে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। তবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সহায়তায় সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে এবং এর সুফল শিগগিরই দৃশ্যমান হবে বলে আমরা আশা করছি।”
মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘সেখানে থাকা প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এ জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া, আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।’’
রেমিট্যান্সে মধ্যপ্রাচ্যের নির্ভরতা
বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে মধ্যপ্রাচ্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) ভুক্ত ছয়টি দেশ—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও ওমানে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৫ দশমিক ৪০ শতাংশই এসেছে এই ছয়টি দেশ থেকে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে তা বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘ হলে এই প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
শ্রমিক যাতায়াতে বড় ধাক্কা
মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে আকাশসীমা সীমিত বা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শ্রমিক যাতায়াতে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে উপসাগরীয় বিভিন্ন গন্তব্যে নির্ধারিত অনেক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, গত নয় দিনে অন্তত ৩০০টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। রবিবার (৮ মার্চ) একদিনেই বাতিল হয়েছে ২৬টি ফ্লাইট। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সংকটের পর থেকে বাতিল ফ্লাইটের সংখ্যা তিনশ’তে পৌঁছেছে।
দাম্মাম, দোহা, দুবাই, আবুধাবি, শারজাহ ও কুয়েতগামী এসব ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় অন্তত ৫৫ হাজার যাত্রী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ প্রবাসী শ্রমিক।
ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় দেশে ছুটি কাটাতে আসা বহু প্রবাসী কর্মী কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। আবার বিদেশে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত অনেক নতুন শ্রমিকও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে এন্ট্রি ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে
মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অবনতির কারণে কিছু কোম্পানি তাদের কার্যক্রম সীমিত করেছে বা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে। এতে প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
কুয়েতে কর্মরত এক বাংলাদেশি শ্রমিক জানান, অনেক প্রতিষ্ঠানে কাজ বন্ধ থাকায় আয়ের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে নিয়মিতভাবে দেশে অর্থ পাঠানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এদিকে সংঘাতের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে একজন এবং বাহরাইনে একজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এছাড়া কুয়েতে চার জন ও বাহরাইনে তিন জন বাংলাদেশি আহত হয়েছেন।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ধাক্কা লাগতে পারে। কারণ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে, কর্মসংস্থান কমে এবং অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের আয় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, “যুদ্ধ দীর্ঘ হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়বে। এতে শ্রমবাজার সংকুচিত হতে পারে এবং প্রবাসীদের সঞ্চয় কমে যেতে পারে। ফলে দেশে পাঠানো অর্থের পরিমাণও কমতে পারে।”
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, ‘‘বিদেশে যাওয়ার জন্য অনেক শ্রমিক ইতোমধ্যে তিন থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির কারণে তারা বিদেশে যেতে পারছেন না। এতে তাদের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
শ্রমবাজারে নতুন চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা) সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংঘাত দীর্ঘ হলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব টিপু সুলতান বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে নতুন কর্মী নিয়োগ কমে যেতে পারে এবং অনেক শ্রমিক কাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। এতে রেমিট্যান্স প্রবাহেও স্বাভাবিকভাবেই চাপ তৈরি হবে।”
অর্থনীতির জন্য সতর্ক সংকেত
বিশ্লেষকদের মতে, রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক রফতানি বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান দুই উৎস। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শুধু প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকাকেই নয়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামষ্টিক অর্থনীতিকেও চাপের মুখে ফেলতে পারে। এ কারণে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম নীতিগত প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।