
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ঘিরে নিউইয়র্কে এখন কর্মব্যস্তত দেশ-বিদেশের সাংবাদিকদরা। সেই ফাঁকে বাংলাদেশ থেকে আসা সাংবাদিক ও নিউইয়র্কে কর্মরত সাংবাদিকদের আড্ডার আয়োজন করে নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাব। জ্যাকসন হাইটসের একটি রেস্টুরেন্টে ২২ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার রাতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি মনোয়ারুল ইসলাম। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মমিন মজুমদার ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাথির খান ফারুকী। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরসঙ্গী হিসেবে আগত বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব।
আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদ এ খান, উপদেষ্টা সম্পাদক আনোয়ার হোসাইন মনজু, প্রবীণ সাংবাদিক মনজুর আহমেদ, মঈনুদ্দীন নাসের, মাহমুদ খান তাসের, সাঈদ তারেক, এবিএম সালেহ উদ্দীন, মূলধারার রাজনীতিক অ্যাটর্নি মঈন চৌধুরী, এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজ যুক্তরাষ্ট্রের পরিচালক ফখরুল আলম এবং নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি চৌধুরী সারোয়ারুল হাসান, প্রবীণ সাংবাদিক শামসুল হক, নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ সিরাজ, আই অন টিভির প্রেসিডেন্ট রিমন ইসলাম, এনটিভি’র উত্তর আমেরিকা ব্যুরো চিফ ফরিদ আলম, গাউছুল আজম বিপু, আরিফুল ইসলাম মামুন, আবুল কাশেম, সুলতানা রহমান, আলমগীর হোসেন, শান্ত বিশ্বাস ও প্রবাসের বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকেরা। এছাড়া ছিলেন বাংলাদেশ ডিফেন্স জার্নাালের সম্পাদক ও প্রকাশক আবু রুশদ এআরএম শহিদুল ইসলাম, কেরামতউল্লাহ বিপ্লব, নুরুল আলম রোকন সহ দেশের অনেক সাংবাদিক।
গল্প, স্মৃতিচারণ, পেশাগত অভিজ্ঞতা বিনিময় আর হাসি-আড্ডায় জমে ওঠে নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাব আয়োজিত ‘সাংবাদিক আড্ডা’। দেশ ও প্রবাসের সাংবাদিকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আয়োজনটি রূপ নেয় প্রাণবন্ত এক মিলনমেলায়।
বাংলাদেশ থেকে আগত এবং নিউইয়র্কে কর্মরত সাংবাদিকেরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হন। দীর্ঘদিন পর পুরোনো সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা হওয়ায় অনেকেই ফিরে যান স্মৃতির পাতায়। সাংবাদিকতা জীবনের মজার, কঠিন ও স্মরণীয় নানা অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেন তাঁরা। ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতায় কাজ করলেও পেশাগত যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে আলোচনায়। অংশগ্রহণকারীরা আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের আয়োজন দেশ ও প্রবাসে কর্মরত সাংবাদিকদের মধ্যে যোগাযোগ, সৌহার্দ্য ও পেশাগত সম্পর্ক আরও জোরদার করবে।ইতিহাসের বই পড়ুন
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দানকালেকাদের গনি চৌধুরী বলেন, সাংবাদিকতা হচ্ছে সত্যের আরাধনা। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, সাংবাদিকের কাজ সত্যকে খুঁজে বের করা এবং সে সত্যকে রক্ষা করা। সত্য না থাকলে আস্থা থাকে না, আর আস্থার অভাব হলে গণতন্ত্র থাকে না। সাংবাদিকতা হবে পুরোপুরি সত্যতার ভিত্তিতে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে মিথ্যা কিংবা অর্ধ-সত্যের কোনো স্থান নেই। এ ক্ষেত্রে আপসেরও কোনো সুযোগ নেই।সংবাদপত্র দেশের জনগণ ছাড়া কারও কাছে দায়বদ্ধ নয়। কালোকে কালো আর সাদাকে সাদা বলাই সাংবাদিকতার মূল মন্ত্র। কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, দাসত্বের সাংবাদিকতাকে মানুষ ঘৃণা করে।
গত ১৭ বছরে আমরা অনেক সাংবাদিককে দাসত্বের সাংবাদিকতা করতে দেখেছি। এর কারণে ফ্যাসিবাদী শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।সাংবাদিকদের মর্যাদাকে তারা ম্লান করে দিয়েছে।তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট গণঅভ্যুত্থান এ বিষয়টি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা দেখেছি—যারা দীর্ঘদিন ধরে দলীয় ব্যানারের আড়ালে সাংবাদিকতা করেছেন, ক্ষমতার সঙ্গে আঁতাত করে জনগণের স্বার্থ বিসর্জন দিয়েছেন, তারা শেষ পর্যন্ত জনগণের রোষানল থেকে বাঁচতে পারেননি। কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, কেউবা হত্যা মামলার আসামি হয়ে কারাগারে গেছেন। অনেকে আজও পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এই বাস্তবতা আমাদের সামনে এক অমোঘ সত্য হাজির করেছে—সাংবাদিকতা কখনো দলীয় ব্যানারের ভিত্তিতে টিকে থাকতে পারে না।
জনগণের আস্থা হারানো মানে সাংবাদিকতার মৃত্যু। সাংবাদিকতা কোনো মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা নয়। এটি একটি সম্মানের পেশা। তিনি বলেন, সাংবাদিকতার পথ কখনোই সহজ বা মসৃণ ছিল না। বর্তমানে গণমাধ্যমে যে অনুকুল পরিবেশ বিরাজ করছে, তা অব্যাহত থাকলে সাংবাদিকরা আরও বেশি সত্য তুলে ধরতে পারবেন। তবে যা ইচ্ছা তা লিখলেই সাংবাদিকতা হয় না। যা মুখে আসবে তা বলাই বাকস্বাধীনতা নয়। স্বাধীনতার পাশাপাশি সাংবাদিকদের দায়িত্বশীলতার কথাও মনে রাখতে হবে। গণমাধ্যমের সংখ্যা দ্রুত বাড়ার প্রসঙ্গে বিএফইউজে মহাসচিব বলেন, এসব মিডিয়া সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে। অধিকাংশ মিডিয়ার প্রাতিষ্ঠানিকতা নেই। তারা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা না করে ব্যবসায়ীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে নানাভাবে হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইল করা অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। মোবাইল ফোন হাতে নিয়েই অনেকে সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছেন। এর ভয়াবহতা থেকে কেউই নিরাপদ নয়। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করেও সামাজিকভাবে মানুষকে হেয়প্রতিপন্ন করা হচ্ছে।
এসব বন্ধে আইনের সঠিক প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, অপসাংবাদিকতা ও হয়রানি রোধে আইনের যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। তবে একই সঙ্গে আইন যেন অপব্যবহার না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময়ে সাগর-রুনিসহ অনেক সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন। কথায় কথায় সাংবাদিকদের চাকরীচ্যুত করা হয়। সাংবাদিকরা জনগণের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে কথা বললেও কর্মক্ষেত্রসহ কোথাও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। একই সঙ্গে চাকরির নিশ্চয়তাও নেই।
সাংবাদিক সমাজের বিভাজন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিএফইউজে মহাসচিব। তিনি বলেন, ‘আজকে আমাদের মাঝে বহু বিভাজনের কারণে আমরাই দুর্বল হচ্ছি। সরকার ও মালিকরা এর সুযোগ নেন। তিনি সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সাংবাদিক সমাজ ঐক্যবদ্ধ হলে গণমাধ্যমের অনেক সমস্যা দূর করা সম্ভব হবে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা যাবে।
দীর্ঘদিন পর পুরোনো সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা হওয়ায় অনেকেই ফিরে যান স্মৃতির পাতায়। সাংবাদিকতা জীবনের মজার, কঠিন ও স্মরণীয় নানা অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেন তাঁরা। গল্প, হাসি, স্মৃতিচারণ এবং পেশাগত অভিজ্ঞতা বিনিময়ে পুরো আয়োজন হয়ে ওঠে আন্তরিক ও প্রাণবন্ত।