
বিশ্ব মানচিত্রের দিকে তাকালে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় একটি চমৎকার ভাষাগত মিল চোখে পড়ে। সাতটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নামের শেষে জুড়ে আছে একটি সাধারণ প্রত্যয়— ‘স্তান’। কাজাখস্তান থেকে আফগানিস্তান, কিংবা পাকিস্তান থেকে উজবেকিস্তান— এই দেশগুলোর ভৌগোলিক বৈচিত্র্য যেমন বিশাল, তেমনি তাদের নামের পেছনের ইতিহাসও বেশ রোমাঞ্চকর।
‘স্তান’ শব্দের শেকড় যেখানে
‘স্তান’ প্রত্যয়টি মূলত একটি ফারসি শব্দ। তবে এর ব্যুৎপত্তি আরও গভীরে, প্রাচীন ইন্দো-ইরানীয় মূল শব্দ ‘স্তা’ (Sta) থেকে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই একটি মূল শব্দ থেকেই তৈরি হয়েছে সংস্কৃতের ‘স্থান’, লাতিনের ‘Status’ এবং ইংরেজির ‘Stand’ বা ‘Station’।
এ কারণেই এর সঙ্গে বাংলা-সংস্কৃতের ‘স্থান’ শব্দেরও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা আছে। সহজ কথায়, ফারসি ভাষায় ‘স্তান’ মানে হলো কোনো নির্দিষ্ট জাতি বা গোষ্ঠীর ‘ভূমি’, ‘দেশ’ বা ‘বসবাসের স্থান’। ঐতিহাসিক ফারসি ও পারস্য সাংস্কৃতিক প্রভাবের কারণেই এই অঞ্চলগুলোতে ‘স্তান’ একটি সাধারণ ভূমির বা স্থানের নামকরণ প্রত্যয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সার্বভৌম ৭টি ‘স্তান’ ও তাদের পরিচয়
বর্তমানে বিশ্বের মানচিত্রে সরাসরি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সাতটি ‘স্তান’ রয়েছে:
আফগানিস্তান: শাব্দিক অর্থ ‘আফগানদের ভূমি’। প্রাচীন সিল্ক রোডের এই সংযোগস্থলটি ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কাজাখস্তান: আয়তনের দিক থেকে এটি বিশ্বের বৃহত্তম ‘স্তান’ এবং নবম বৃহত্তম রাষ্ট্র। ‘কাজাখ’ শব্দের অর্থ ‘দুঃসাহসী’ বা ‘স্বাধীনচেতা’।
কিরগিজস্তান: ‘কিরগিজ’ শব্দের উৎস হলো তুর্কি শব্দ ‘কিরক’, যার অর্থ ৪০। মনে করা হয়, ৪০টি শক্তিশালী গোত্রের মিলনে এই জাতির উৎপত্তি।
তাজিকিস্তান: পাহাড়-বেষ্টিত এই দেশটি ‘তাজিক’ বা পারস্য বংশোদ্ভূত মানুষের আবাসভূমি।
তুর্কমেনিস্তান: মরুভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এই দেশ ‘তুর্কমেন’ জাতিগোষ্ঠীর নামানুসারে নামকরণ করা হয়েছে।
উজবেকিস্তান: ‘উজবেক’ অর্থ ‘নিজের মালিক নিজে’। মধ্য এশিয়ার জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রাচীন কেন্দ্র বুখারা ও সমরখন্দ এই দেশেই অবস্থিত।
পাকিস্তান: এই নামটির ব্যুৎপত্তি কিছুটা ভিন্ন। এটি ভারত বিভাগের সময় কয়েকটি অঞ্চলের আদ্যক্ষর (P-Punjab, A-Afghania, K-Kashmir, S-Sindh, Tan-Balochistan) নিয়ে গঠিত।
ব্যতিক্রমী দেশ ‘হায়াস্তান’ এর রহস্য
আর্মেনিয়াকে তো আমরা সবাই চিনি। কিন্তু জানলে অবাক হবেন, এই দেশটি নিজেদের ‘আর্মেনিয়া’ নয় বরং ‘হায়াস্তান’ নামে ডাকে। এটি দুটি অংশের সংমিশ্রণ:
হায়া (Haya): পৌরাণিক আদিপিতা ‘হায়ক’ (Hayk) থেকে এসেছে।
স্তান (Stan): সেই একই ফারসি প্রত্যয়।
অর্থাৎ, শাব্দিক অর্থে হায়াস্তান মানে হলো ‘হায়-দের ভূমি’ বা ‘হায়কের বংশধরদের দেশ’। আরও বেশ কয়েকটি দেশ আছে যাদের অন্য ভাষায় 'স্তান' বলা হয়, কিন্তু তাদের সরকারি নামে ‘স্তান’ নেই।