ইরানকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক মহড়ার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের

ডেস্ক রিপোর্ট
  ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৩:৫৭

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে কয়েক দিনব্যাপী সামরিক মহড়ার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যাকে ‘আর্মাডা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, সেই বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন–এর নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী নৌবহর ইতোমধ্যে ওই অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে। এই পদক্ষেপকে ইরানের প্রতি ওয়াশিংটনের স্পষ্ট শক্তি প্রদর্শন হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, ইরানে সরকারবিরোধী গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযানের ফলে ব্যাপক প্রাণহানির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে প্রয়োজনে নতুন করে সামরিক হামলার পথও খোলা রাখা হয়েছে। দেশটিতে বহু মানুষ আটক রয়েছেন এবং তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের বিমান শাখা এয়ার ফোর্সেস সেন্ট্রাল মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) এক বিবৃতিতে জানায়, তারা কয়েক দিনব্যাপী একটি প্রস্তুতি মহড়া পরিচালনা করবে। এই মহড়ার মূল লক্ষ্য হলো—যুদ্ধবিমান দ্রুত মোতায়েন, বিভিন্ন ঘাঁটিতে ছড়িয়ে রাখার সক্ষমতা এবং দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধক্ষমতা বজায় রাখার প্রস্তুতি প্রদর্শন করা। পাশাপাশি সম্পদ ও জনবল বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানো, আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা এবং নমনীয় সামরিক প্রতিক্রিয়ার প্রস্তুতি নিশ্চিত করাও এর উদ্দেশ্য।
তবে মহড়ার সুনির্দিষ্ট তারিখ, স্থান কিংবা এতে অংশগ্রহণকারী সামরিক সম্পদের বিস্তারিত তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এটি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত শক্তি প্রদর্শনেরই অংশ।
এর আগে গত সোমবার সেন্টকম জানায়, পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে একটি বড় মার্কিন নৌবহর মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। এই রণতরীতে কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান ও প্রায় পাঁচ হাজার নাবিক রয়েছে। নৌবহরের সঙ্গে একাধিক গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ারও মোতায়েন করা হয়েছে, যা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে পুরো ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপকে সুরক্ষা দেবে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এফ–১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমানের একটি স্কোয়াড্রনও ওই অঞ্চলে পাঠিয়েছে বলে মার্কিন গণমাধ্যমে জানানো হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই ইউনিটটি ২০২৪ সালের এপ্রিলে ইরানের ওপর পরিচালিত হামলায় অংশ নিয়েছিল। যুক্তরাজ্যও প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা জোরদারের অংশ হিসেবে টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ‘বড় আর্মাডা’ রয়েছে—যা ভেনেজুয়েলার চেয়েও শক্তিশালী। তবে একই সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরে তিনি বলেন, ইরান চুক্তি করতে আগ্রহী এবং তারা একাধিকবার যোগাযোগ করেছে।
ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া ইরানের মুদ্রা অবমূল্যায়নকেন্দ্রিক বিক্ষোভে গণহত্যা বা গণফাঁসি হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হামলা চালাতে পারে—এমন হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন ট্রাম্প। পরে তিনি দাবি করেন, হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, তবে প্রয়োজনে সামরিক বিকল্প এখনো খোলা রয়েছে। তাঁর ভাষায়, “আমাদের বিশাল নৌবহর ওই দিকে যাচ্ছে—হয়তো ব্যবহারই করতে হবে না।”
মানবাধিকারভিত্তিক সংস্থাগুলোর দাবি, দমন-পীড়নে প্রায় ছয় হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। ইরান সরকার অবশ্য তিন হাজারের কিছু বেশি মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে। অন্যদিকে কয়েকটি কর্মী গোষ্ঠী ৩০ হাজারেরও বেশি মৃত্যুর আশঙ্কা প্রকাশ করলেও কঠোর সেন্সরশিপ ও ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় প্রকৃত সংখ্যা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সেন্টকম আরও জানিয়েছে, এই মহড়ায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা হবে। বাহরাইনের সঙ্গে ড্রোন ভূপাতিত করার সক্ষমতা নিয়ে প্রতিরক্ষামূলক অনুশীলনের ঘোষণাও এসেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক তৎপরতা নিয়ে কিছু আঞ্চলিক মিত্র দেশের মধ্যে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হামলায় তাদের আকাশসীমা, ভূখণ্ড কিংবা জলসীমা ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না; তারা নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখতে চায়।
মার্কিন বিমানবাহিনী জানিয়েছে, সব ধরনের কার্যক্রম স্বাগতিক দেশের অনুমোদন এবং বেসামরিক ও সামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে—যাতে নিরাপত্তা, নির্ভুলতা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ সম্মান বজায় থাকে।