
যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক ও কৌশলগত আলোচনার সূচনা হয়েছে। ১১ ফেব্রুয়ারি বুধবার ক্যাপিটল হিলে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক হাউজ ফরেন অ্যাফেয়ার্স সাব-কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ শুনানিতে দক্ষিণ এশিয়ায় গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং শরণার্থী ইস্যু নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
শুনানিতে স্টেট ডিপার্টমেন্টের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সাক্ষ্য দেন এবং এ অঞ্চলের কূটনৈতিক, নিরাপত্তা ও মানবিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রদান করেন।
সাব-কমিটির চেয়ারম্যান মিশিগানের রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য বিল হুইজেঙ্গা তাঁর উদ্বোধনী বক্তব্যে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রায় ২০০ কোটিরও বেশি মানুষের আবাসস্থল এই অঞ্চল বৈশ্বিক বাণিজ্যপথ, জ্বালানি সরবরাহ রুট এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
চেয়ারম্যান হুইজেঙ্গা বলেন, চীন ও রাশিয়ার প্রভাব বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রকে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ায় তার কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পৃক্ততা আরও শক্তিশালী করতে হবে। বিশেষ করে অবকাঠামো বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক সংযোগ ইস্যুকে তিনি অগ্রাধিকার দেন।
সাব-কমিটির র্যাঙ্কিং মেম্বার ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস সদস্য সিডনিকমলাগার-ডোভ তাঁর বক্তব্যে দক্ষিণ এশিয়ায় গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং শরণার্থী ইস্যু নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বিশেষভাবে আফগানিস্তান প্রসঙ্গে বলেন, মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের পর আফগান মিত্রদের জন্য বিশেষ ভিসা ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়েছে। একই দিনে ডেমোক্রেট সদস্যরা একটি পৃথক ‘শ্যাডো হিয়ারিং’- আয়োজন করে আফগান শরণার্থী পুনর্বাসন ও মানবিক সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রশাসনের ধীরগতির সমালোচনা করেন।
ডেমোক্রেট সদস্যরা আরো বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কেন্দ্রে গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের প্রশ্নটি থাকতে হবে।
শুনানিতে স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রতিনিধি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলে ভারত একটি কেন্দ্রীয় অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্র-ভারত কৌশলগত অংশীদারিত্বকে তিনি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।
কংগ্রেস সদস্যরা আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষায় ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করেন। এছাড়া প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য খাতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার সম্ভাবনাও উঠে আসে।
শুনানিতে আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি, পাকিস্তানের নিরাপত্তা ইস্যু এবং মধ্য এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়েও আলোচনা হয়। সদস্যরা জঙ্গিবাদ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর পুনরুত্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রতিনিধি জানান, যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা, আঞ্চলিক অংশীদারিত্ব এবং মানবিক সহায়তার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
এখানে উল্লেখ্য, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক এই সাবকমিটি যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা, বৈদেশিক সহায়তা এবং আঞ্চলিক নীতিমালা তদারকি করে। এটি স্টেট ডিপার্টমেন্টের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক ব্যুরোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে এবং প্রয়োজনে শুনানি ও নীতিগত সুপারিশ প্রদান করে।
সাবকমিটির কার্যপরিধির মধ্যে রয়েছে- যুক্তরাষ্ট্র–ভারত কৌশলগত সম্পর্ক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান ইস্যু, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ, মানবিক সংকট ও শরণার্থী সহায়তা এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী বছর ঘনিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে কংগ্রেসের সক্রিয়তা বাড়ছে। বিশেষ করে প্রবাসী দক্ষিণ এশীয় জনগোষ্ঠীর আগ্রহের বিষয়, আফগান শরণার্থী পুনর্বাসন, যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং মানবাধিকার, এগুলো এখন ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশীয় প্রবাসীদের জন্য এ ধরনের শুনানি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান সরাসরি প্রভাব ফেলে ভিসা নীতি, নিরাপত্তা সহযোগিতা, মানবিক সহায়তা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর।