ভেনেজুয়েলা থেকে আরও তেল তুলবে যুক্তরাষ্ট্রের শেভরন

ডেস্ক রিপোর্ট
  ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৭

ভেনেজুয়েলায় নিজেদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন তেল কোম্পানি শেভরন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এর আগে কারাকাসের তেলসম্পদের উন্নয়ন এবং সেই মুনাফায় পেন্টাগনকে অংশীদার করার উচ্চাভিলাষী চুক্তির ঘোষণা দিয়েছিলেন।
পিবিএস নিউজ লিখেছে, শেভরনই একমাত্র মার্কিন তেল কোম্পানি, যাদের ভেনেজুয়েলায় বড় ধরনের উপস্থিতি রয়েছে। দেশটির অরিনোকো বেল্টে তাদের আরও জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ওই এলাকায় বর্তমানে কোম্পানির কার্যক্রম রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে শেভরন। এ বিনিয়োগের লক্ষ্য হল বর্তমান উৎপাদন দ্বিগুণ বাড়িয়ে প্রতিদিন ৬ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করা।
শেভরনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাইক ওয়ার্থ এক বিবৃতিতে বলেন, “ভেনেজুয়েলায় শেভরনের ইতিহাস এক শতাব্দীর বেশি সময়ের। সেখানে আমাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত দেশটির সম্ভাবনার প্রতি আমাদের আস্থার প্রতিফলন।”
খনিজ তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংস্থা ওপেকের ২০২৫ সালের বার্ষিক বুলেটিন অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি উত্তোলনযোগ্য তেলের মজুদ রয়েছে ভেনেজুয়েলায়, যার পরিমাণ ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেলের বেশি। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সৌদি আরবের মজুদ ২৬৭ বিলিয়ন ব্যারেল।
তবে ভেনেজুয়েলার জ্বালানি অবকাঠামোর মারাত্মক অবনতি হওয়ায় এবং দেশটি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকায় তাদের দৈনিক উৎপাদন মাত্র ১০ লাখ ব্যারেলের কিছু বেশি। অন্যদিকে সৌদি আরব প্রতিদিন ১ কোটি থেকে ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল কোম্পানি শেভরন ১৯২৩ সাল থেকে ভেনেজুয়েলায় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে বুধবার মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেন, “ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মিশন খুব সুনির্দিষ্ট। মিশনটি হল ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্য শান্তি, স্বাধীনতা, সুযোগ ও সমৃদ্ধি নিয়ে আসা।”
তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, আজ যে চুক্তিগুলো সই হয়েছে, সেগুলোতে কয়েক হাজার কোটি ডলারের বিনিয়োগ এবং আখেরে হাজার হাজার কর্মসংস্থান হবে। আর তা ভেনেজুয়েলার সবার জন্য শান্তি, সুযোগ ও সমৃদ্ধির প্রক্রিয়া শুরু করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পে ট্রাম্পের প্রবেশ চেষ্টার অংশ হিসেবে সেখানকার তেল অনুসন্ধান ও উৎপাদনকারী কোম্পানি নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্সের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে যাওয়ার কথা সোমবার জানিয়েছে হোয়াইট হাউজ।
তবে এ চুক্তির লক্ষ্য কতটা অর্জিত হবে, তা নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। তাদের ভাষ্য, বছরের পর বছর অবহেলার কারণে বিশৃঙ্খল অবস্থায় থাকা ভেনেজুয়েলার তেলশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে কয়েক বছর সময় লাগবে।
ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল মজুত তেলের ১৭টি ক্ষেত্রকে নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্সের হাতে ১০০ বছরের জন্য তুলে দেওয়ার এখতিয়ার আছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলার বা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সরকার এই চুক্তি বাতিল করবে কি না, সেই প্রশ্নও রয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক ক্যাটো ইনস্টিটিউটের আন্তর্জাতিক গবেষণাবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়ান ভাসকেজ লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এ সপ্তাহে যে ধরনের চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে তা ভেনেজুয়েলার সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় পরিষদের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এমন অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
ভাসকেজ লিখেছেন, “চুক্তিটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, কারণ এটি এমন একটি স্বৈরশাসকের সঙ্গে করা হয়েছে, যে কয়েক দশক ধরে সহিংসতার মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে আছে এবং ২০২৪ সালে লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বড় নির্বাচনি জালিয়াতি করেছেন।”
তিনি এও লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের তরফে সামরিক ও অন্যান্য ধরনের ব্যাপক চাপের মধ্যে এই চুক্তি করা হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলার যে কোনো গণতান্ত্রিক সরকার এ চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। তাতে বর্তমান ব্যবস্থার প্রতি আস্থা নষ্ট করবে।”
এ বিষয়ে বুধবার সাংবাদিকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে রদ্রিগেজের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে থাকা রাইট ওই সমালোচনার বিরোধিতা করেন।
তিনি বলেন, “এটি এমন একটি চুক্তি, যা যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের জন্য বিশাল বিজয় ও সুবিধা এবং ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্যও বিশাল বিজয়।”
তিনি বলেন, “এর মাধ্যমে ভূগর্ভে থাকা এমন সম্পদকে কাজে লাগানো হবে, যা এখন কারও উপকারে আসছে না। সেখানে পুঁজি, অর্থ ও প্রযুক্তি বিনিয়োগ করে সেই সম্পদ মাটির উপরে আনা হবে।
“এতে ভেনেজুয়েলাবাসীর জীবনযাত্রার উন্নতি হবে এবং আমেরিকানদের জন্য জ্বালানি সরবরাহ আরও ভালো হবে।”
গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের পর থেকেই দেশটির দিকে নজর দিয়েছেন ট্রাম্প এবং সেখানে মার্কিন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ফেরানোর চেষ্টা করছেন।
সেই মাসে তিনি বলেছিলেন, “এক্সন সেখানে যাচ্ছে, শেভরন সেখানে যাচ্ছে। আমাদের বড় তেল কোম্পানিগুলো সেখানে যাচ্ছে।”
মার্কিন প্রেসিডেন্ট সোমবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য বড় তেল কোম্পানিগুলোও ভেনেজুয়েলায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে শেভরন ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানি ফিরে যাচ্ছে—এমন কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই।
এক্সন মবিলের সিইও ড্যারেন উডস জানুয়ারিতে বলেছিলেন, ভেনেজুয়েলায় বিনিয়োগ করা ‘অসম্ভব’।
এক্সনের একজন মুখপাত্র এ সপ্তাহে বলেছেন, “কিছুই পরিবর্তন হয়নি।”
এ দ্বিধার কারণ হচ্ছে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন তেল জায়ান্টগুলোর অতীত অভিজ্ঞতা।
পিবিএস নিউজ লিখেছে, ভেনেজুয়েলা ১৯৭৬ সালে তার তেলশিল্প জাতীয়করণ করে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি পেত্রোলেওস দে ভেনেজুয়েলা এসএ প্রতিষ্ঠা করে। ২০০৭ সালে দ্বিতীয় দফায় জাতীয়করণ করা হয়।
সে সময় প্রেসিডেন্ট উগো চাভেজ বিদেশি তেল কোম্পানিগুলোকে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণাধীন যৌথ উদ্যোগে যেতে বাধ্য করেন। যারা এতে রাজি হয়নি, তাদের সম্পদ দখল করে নেওয়া হয়।
যৌথ উদ্যোগে যেতে রাজি হয়েছিল শেভরন। অন্যদিকে এক্সন, কনোকোফিলিপসসহ কয়েকটি কোম্পানি সেই প্রস্তাবে রাজি হয়নি এবং ভেনেজুয়েলা তাদের সম্পদ নিয়ে নেয়।
ট্রাম্প বলছেন, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে এ চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম ‘উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে’।
তবে বিশ্লেষকেরা বারবার সতর্ক করে বলেছেন, ভেনেজুয়েলার জরাজীর্ণ তেল অবকাঠামো ঠিক করতে কয়েক বছর কাজ করতে হবে এবং আবার সচল করতে কয়েক হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন হবে।
নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল এনার্জি, ক্লাইমেট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ল্যাবের পরিচালক অ্যামি জ্যাফে ইমেইলে বলেছেন, “অরিনোকো অঞ্চলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করে তা চালু করতে দুই থেকে চার বছর সময় লাগতে পারে।
“আর যেখানে কোনো পাইপলাইন এবং অন্যান্য ধরনের সহায়ক অবকাঠামো নেই, সেখানে আরও বেশি সময় লাগতে পারে।”
এদিকে মোটর ক্লাব এএএ’র তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের জাতীয় গড় সাধারণ দাম রাতারাতি বেড়ে গ্যালনপ্রতি ৪ দশমিক ১২ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের এ সময়ের তুলনায় ৯৩ সেন্ট বেশি।