একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি জাহানারা আরজু আর নেই

সাহিত্য ডেস্ক
  ০২ মার্চ ২০২৬, ২৩:৫৫

একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি, সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জাহানারা আরজু আর নেই। সোমবার (২ মার্চ) দুপুর দেড়টার দিকে গুলশানের নিজ বাসভবনে তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন ৯৩ বছরের এই কবি। মৃত্যুকালে তিনি দুই পুত্র, এক কন্যা, নাতি-নাতনি ও অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী রেখে গেছেন।
জাহানারা আরজু সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের মা। তার জীবনসঙ্গী মরহুম একেএম নুরুল ইসলাম ছিলেন ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য এবং বাংলাদেশের উপরাষ্ট্রপতি।
নুরুল ইসলামের জন্ম হরিরামপুরের খলিলপুরে, আর আরজুর পৈতৃক নিবাস মানিকগঞ্জ শহরের সেওতা গ্রামে।
১৯৩২ সালের ১৭ নভেম্বর মানিকগঞ্জের জাবরা গ্রামে মাতুলালয়ে তার জন্ম। পিতা আফিল উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী, মাতা খোদেজা খাতুন। শিক্ষার সূচনা নিজ জেলায়; পরে ইডেন মহিলা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন। কৈশোরেই লেখালেখির হাতেখড়ি। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় হাতে লেখা পত্রিকা প্রকাশ করে সাড়া ফেলেন; আশীর্বাণী দিয়েছিলেন শেরেবাংলা একে ফজলুল হক ও মহাকবি কায়কোবাদ।
১৯৪৫ সালে ‘আজাদ’-এর ‘মুকুলের মাহফিল’-এ তার প্রথম কবিতা ছাপা হয়। পরবর্তী সময়ে ‘সওগাত’, ‘মোহাম্মদী’, ‘বেগম’, ‘মিল্লাত’ ও ‘ইত্তেহাদ’-সহ নানা সাময়িকীতে নিয়মিত লেখা প্রকাশিত হয়।
১৯৪৯ সালে কবি সুফিয়া কামালের সঙ্গে যৌথভাবে সম্পাদনা করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম মহিলা সাপ্তাহিক ‘সুলতানা’, যা নারী সম্পাদিত ধারায় ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। পরে ‘পরিক্রম’-এ যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন; টিবি অ্যাসোসিয়েশনের পাক্ষিক ‘হেলথ বুলেটিন’ ও সাহিত্যপত্র ‘সেতুবন্ধন’-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
তার সৃষ্টিকর্মে মানবিক বোধ, প্রেম, প্রকৃতি ও সমাজ-বাস্তবতার নিবিড় উপস্থিতি দেখা যায়। সহজ ভাষায় গভীর অনুভব প্রকাশ ছিল তার শক্তি।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— নীলস্বপ্ন (১৯৬২), রৌদ্র ঝরা গান (১৯৬৪), সবুজ সবুজ অবুঝ মন, আমার শব্দে আজন্ম আমি, ক্রন্দসী আত্মজা, বাদল মেঘে মাদল বাজে এবং একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে স্বনির্বাচিত কবিতার সংকলন শোণিতাক্ত আখর (১৯৭১)। তার কবিতা অবলম্বনে নির্মিত হয় চলচ্চিত্র ‘মেহেরজান’।
বাংলা সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৭ সালে লাভ করেন একুশে পদক। জীবদ্দশায় অর্জন করেছেন ২৬টি সাহিত্য সম্মাননা। তার কয়েকটি রচনা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন জীবনসঙ্গী নুরুল ইসলাম, যিনি নিজেও ইংরেজি সাহিত্যের কৃতী শিক্ষার্থী ছিলেন।
সোমবার তারাবিহর পর মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার খলিলপুর গ্রামে স্বামীর কবরের পাশে মরহুমার দাফন সম্পন্ন হবে।