সর্বপ্রথম হিজরতকারী মহীয়সী চার নারী

ইসলাম ডেস্ক
  ২২ জুন ২০২৬, ১৫:১১

মহান হিজরত ছিল ইসলামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়। এই হিজরতের পেছনে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অবদানও ছিল অসামান্য।
তাঁদের আত্মত্যাগের ফলেই ইসলামের দাওয়াত নতুন ভূখণ্ডে পৌঁছেছিল এবং মুসলিম সমাজের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে এবং আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ও জীবন দিয়ে সংগ্রাম করেছে, আল্লাহর কাছে তাদের মর্যাদা অনেক উচ্চ।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ২০)
হিজরতের প্রথম আশ্রয় আবিসিনিয়া
নবুয়তের পঞ্চম বছরে মক্কার নির্যাতন যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন মহানবী (সা.) তাঁর সাহাবীদের আবিসিনিয়ায় (বর্তমান ইথিওপিয়া) হিজরত করার অনুমতি দেন। কারণ সেখানে একজন ন্যায়পরায়ণ খ্রিস্টান শাসক নাজ্জাশি রাজত্ব করতেন, যার রাজ্যে কারও ওপর জুলুম করা হতো না।
প্রথম হিজরতের দলে ছিলেন বারোজন পুরুষ এবং চারজন নারী। ইতিহাসে এই চারজন নারী বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। তাঁরা ছিলেন ইসলামের প্রথম যুগের নারী সংগ্রামী, যাঁদের ঈমান ও ত্যাগ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আদর্শ হয়ে আছে। তারা হলেন-
১. নবী কন্যা রুকাইয়াহ (রা.)
সর্বপ্রথম আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী নারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন মহানবী (সা.)-এর কন্যা রুকাইয়াহ (রা.)।
তিনি ছিলেন উম্মুল মুমিনীন খাদিজা (রা.)-এর কন্যা। শৈশবেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইসলামের কারণে বহু কষ্ট সহ্য করেন। প্রথমে তাঁর বিবাহ হয়েছিল ওতবা ইবনে আবি লাহাবের সাথে। কিন্তু মহানবী (সা.)-এর বিরোধিতার কারণে ওতবা তাঁকে তালাক দেয়। পরবর্তীতে তাঁর বিবাহ হয় মহান সাহাবি ওসমান ইবনে আফফান (রা.)-এর সঙ্গে।
এই সৌভাগ্যবান দম্পতি প্রথমে আবিসিনিয়া এবং পরে মদিনায় হিজরত করেন।
২. উম্মে সালামা (রা.)
মুমিনদের মাতা উম্মে সালামা (রা.)-এর জীবন হিজরতের কষ্ট ও ধৈর্যের এক অসাধারণ অধ্যায়। তিনি তাঁর স্বামী আবু সালামা (রা.)-এর সঙ্গে হিজরতের প্রস্তুতি নিলে তাঁর গোত্র তাঁকে স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। অন্যদিকে তাঁর সন্তানের অভিভাবকরাও শিশুকে তাঁর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়। ফলে একদিকে স্বামী, অন্যদিকে সন্তান—দুজনের কাছ থেকেই তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ইবনে হিশাম বর্ণনা করেন, প্রায় এক বছর ধরে তিনি প্রতিদিন উপত্যকায় বসে কান্নাকাটি করতেন। অবশেষে আল্লাহ তাঁর জন্য সহজ ব্যবস্থা করে দেন এবং তিনি সন্তানকে নিয়ে একা মদিনার পথে যাত্রা করেন।
৩. সাহলা বিনতে সুহাইল (রা.)
সাহলা বিনতে সুহাইল (রা.) ছিলেন ইসলামের প্রথম দিকের মুসলিম নারীদের একজন। তিনি তাঁর স্বামী আবু হুজাইফা (রা.)-এর সঙ্গে আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। তিনি ইসলামের জন্য কষ্ট স্বীকার করেছেন, দাওয়াতি কাজে অংশগ্রহণ করেছেন এবং পরবর্তী জীবনে বহু গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন।
৪. লায়লা বিনতে আবি হাতমা (রা.)
প্রথম আবিসিনিয়া হিজরতের আরেক সাহসী নারী ছিলেন লায়লা বিনতে আবি হাতমা (রা.)। তিনি তাঁর স্বামী আমির ইবনে রাবিয়া (রা.)-এর সঙ্গে হিজরত করেন। মক্কা ত্যাগের আগে তাঁর সঙ্গে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর একটি স্মরণীয় ঘটনা ঘটে। তখনও ওমর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেননি। লায়লা (রা.) যখন হিজরতের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ওমর তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমরা কি সত্যিই চলে যাচ্ছ?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনারা আমাদের ওপর এত অত্যাচার করেছেন যে আমরা আল্লাহর জমিনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছি।’ লায়লা (রা.) পরে বলেন, সেদিন তিনি ওমরের চোখে এক ধরনের কোমলতা ও অনুশোচনা দেখেছিলেন। অল্প কিছুদিন পরই উমর (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ইসলামের অন্যতম মহান ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
আজ যখন মুসলিম সমাজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন রুকাইয়াহ (রা.), উম্মে সালামা (রা.), সাহলা বিনতে সুহাইল (রা.) এবং লায়লা বিনতে আবি হাতমা (রা.)-এর জীবন আমাদের জন্য এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। তাঁদের ত্যাগ ও আদর্শ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদেরও উচিত ঈমানের পথে দৃঢ় থাকা, ইসলামের জন্য কাজ করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই মহান সাহাবিয়াদের আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।