
যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় বা এসাইলাম ব্যবস্থা বর্তমানে একটি গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে যারা নিজ দেশে নির্যাতন, সহিংসতা বা নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চাইছেন, তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে একটি শেষ ভরসার জায়গা হিসেবে বিবেচিত ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নীতিগত পরিবর্তন ও প্রশাসনিক কড়াকড়ির ফলে সেই ধারণা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার এমন দেশগুলোর সাথে " নিরাপদ তৃতীয় দেশ" চুক্তি করছে। যেখানে শরণার্থীকে প্রথমে পাঠিয়ে তাদের আশ্রয় আবেদন ও শুনানির অপেক্ষা করতে বলা হয়। এই নীতির লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রে অপেক্ষার চাপ ও দীর্ঘ ব্যাকলগ কমানো। এগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ গুয়াতোমালা ও হন্ডুরাসের মতো মধ্য আমেরিকান দেশ, যাদের সাথে এমন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে আমেরিকার হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ। একোয়াডরও তৃতীয় নিরাপদ দেশ হিসেবে চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। অন্যান্য দেশ যেমন বেলিজ, উগান্ডা ও প্যারাগুয়ে‑র সাথেও চুক্তি রয়েছে বা হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো “তৃতীয় দেশে অপেক্ষা” নীতি। এর মূল ধারণা হচ্ছে— কোনো ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় চাইলেও তাকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে না রেখে এমন একটি দেশে পাঠানো যেতে পারে, যাকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বলে মনে করে। সেখানে অবস্থান করেই আশ্রয়প্রার্থীর মামলা চলবে বা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রশাসনের যুক্তি অনুযায়ী, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত ও আদালত ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানোর একটি উপায়।
কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপটে এই নীতির প্রয়োগ বেশ কিছু জটিল প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। প্রথমত, “নিরাপদ তৃতীয় দেশ” ধারণাটি সর্বজনগ্রাহ্য নয়। যেসব দেশে আশ্রয়প্রার্থীদের পাঠানো হচ্ছে, সেসব দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আশ্রয় অবকাঠামো, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আইনি সহায়তা ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নবিদ্ধ। ফলে আশ্রয়প্রার্থী বাস্তবে নতুন এক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছেন।
দ্বিতীয়ত, এই নীতির ফলে আশ্রয়প্রার্থীর আইনি প্রক্রিয়া আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলে যেভাবে আইনজীবী পাওয়া, মামলার নথি প্রস্তুত করা বা আদালতের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব, তৃতীয় দেশে পাঠানো হলে তা অনেক সময় বাস্তবসম্মত থাকে না। এর ফলে অনেক আবেদনকারী কার্যত পূর্ণাঙ্গ শুনানির সুযোগ হারাতে পারেন— যা ন্যায়বিচারের মৌলিক ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময়। আশ্রয় মামলা এমনিতেই দীর্ঘসূত্রতার শিকার। তৃতীয় দেশে পাঠানোর ফলে এই অপেক্ষা আরও দীর্ঘ ও মানসিকভাবে ক্ষতিকর হয়ে উঠছে। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থানের অভাব এবং নিরাপত্তা নিয়ে ভয়— সব মিলিয়ে আশ্রয়প্রার্থীদের মানসিক চাপ বহুগুণে বেড়ে যাচ্ছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই নীতি আশ্রয় ব্যবস্থার মূল চেতনাকে দুর্বল করছে। আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইনের মূল লক্ষ্য হলো— যিনি আশ্রয় চাইছেন, তাকে নিরাপদ পরিবেশে থেকে নিজের দাবি উপস্থাপনের সুযোগ দেওয়া। কিন্তু তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে সেই প্রক্রিয়া চালানো হলে আশ্রয়ের মানবিক দিকটি প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার নিচে চাপা পড়ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের অবস্থান হলো, এটি কোনো আশ্রয় নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং একটি ব্যবস্থাপনা কৌশল। তাদের মতে, বিপুল সংখ্যক আবেদন, সীমান্তে চাপ এবং আদালতের ব্যাকলগ— এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসন দাবি করছে, আইনগত কাঠামোর মধ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য বিকল্প পথ খোলা রাখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের আশ্রয় ব্যবস্থায় তৃতীয় দেশ নীতি একটি গভীর নীতিগত পরিবর্তনের প্রতীক। এটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং আশ্রয়, নিরাপত্তা এবং মানবাধিকার— এই তিনটি মৌলিক ধারণার মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে একটি চলমান বিতর্ক। ভবিষ্যতে আদালতের রায়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক চাপ— সবকিছু মিলিয়ে এই নীতির গতিপথ নির্ধারিত হবে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য এটি এক অনিশ্চিত ও কঠিন সময়— যেখানে আশ্রয়ের পথ আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে।