
নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে তীব্র শীত ও টানা তুষারপাত। নগরজীবনের নিত্যদিনের ছন্দকে ভেঙে দেওয়া এক বাস্তবতা। বছরের এই সময়টাতে শহরের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে থমকে যায়, রাস্তাঘাটে জমে ওঠা বরফ মানুষের চলাচলকে যেমন দুর্বিষহ করে তোলে, তেমনি প্রতিদিনের জীবনে যোগ করে নানা ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা। শীতের সৌন্দর্য যতটা ছবির ফ্রেমে মানায়, বাস্তব জীবনে তার অভিঘাত ততটাই কঠিন।
নগরকেন্দ্রে শীতকালীন বিপর্যয়ের প্রথম ও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় পার্কিং। নিউইয়র্কের মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে বরফ পরিষ্কারের নিয়মের কারণে নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট পাশে গাড়ি পার্ক করা নিষিদ্ধ হয়। ‘স্নো অ্যালার্ট’ জারি হলেই শুরু হয় গাড়ি সরানোর দৌড়ঝাঁপ। অনেকেই সময়মতো গাড়ি সরাতে না পেরে মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনছেন, কারও গাড়ি টেনে নেওয়া হচ্ছে। যারা রাতের শিফটে কাজ করেন কিংবা প্রবীণ, তাদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও জটিল। একটি ছোট ভুল বা অসতর্কতা মুহূর্তেই অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে দেয়।
পার্কিংয়ের পাশাপাশি বড় সমস্যা হয়ে ওঠে চলাচল ও দুর্ঘটনা। বরফে ঢাকা রাস্তা ও ফুটপাথ পিচ্ছিল হয়ে পড়ায় হেঁটে চলার সময় পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। প্রতিদিনই জরুরি বিভাগে বাড়ছে পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙার রোগী। গাড়ি দুর্ঘটনাও বাড়ে উল্লেখযোগ্য হারে। অনেক চালক চার চাকার গাড়ি বা উন্নত প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত ভরসা করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে গাড়ি চালান, কিন্তু বরফের ওপর ব্রেক কাজ না করলে প্রযুক্তিও অসহায় হয়ে পড়ে। ফলে দুর্ঘটনার শিকার শুধু চালক নন, পথচারীরাও।
এই তীব্র শীত সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে মানুষের স্বাস্থ্যে। ঠাণ্ডাজনিত অসুখ—ফ্লু, নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস—এই সময়টায় ব্যাপকভাবে বাড়ে। শিশু ও প্রবীণদের জন্য শীতকাল বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ। ঠাণ্ডায় রক্তচাপ বেড়ে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের আশঙ্কাও বাড়ে বলে চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন। অনেক অভিবাসী পরিবার, বিশেষ করে যারা কম আয়ের, তাদের জন্য পর্যাপ্ত গরমের ব্যবস্থা করা কঠিন হয়ে পড়ে। বাড়ির হিটার চালাতে গিয়ে বিদ্যুৎ বা গ্যাস বিলের চাপ বেড়ে যায়, যা অনেকের পক্ষে বহন করা কঠিন।
শীতকালীন বিপর্যয়ের আরেকটি দিক হলো মানসিক স্বাস্থ্য। দিনের আলো কমে যাওয়া, দীর্ঘ সময় ঘরে বন্দি থাকা, চলাচলের সীমাবদ্ধতা—এসব মিলিয়ে অনেকের মধ্যে বিষণ্নতা ও একাকিত্ব বাড়ে। বিশেষ করে প্রবীণ ও একাকী বসবাসকারীদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা প্রকট। সামাজিক যোগাযোগ কমে গেলে মানসিক চাপ বাড়ে, যা শারীরিক অসুস্থতাকেও ত্বরান্বিত করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সতর্কতা ও প্রস্তুতির বিকল্প নেই। নগর কর্তৃপক্ষ নিয়মিত বরফ পরিষ্কারের কাজ করলেও নাগরিকদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে সচেতন হতে হবে। ফুটপাথ পরিষ্কার রাখা শুধু আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়, সামাজিক দায়িত্বও। নিজের বাড়ির সামনে জমে থাকা বরফ পরিষ্কার না করলে প্রতিবেশী বা পথচারী দুর্ঘটনার শিকার হতে পারেন। গাড়ি চালানোর সময় গতি কম রাখা, পর্যাপ্ত দূরত্ব বজায় রাখা এবং প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না বের হওয়াই নিরাপদ।
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় শীতকালীন পোশাক ব্যবহারের পাশাপাশি ফ্লু টিকা নেওয়ার গুরুত্ব বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে। প্রবীণ ও শিশুদের ক্ষেত্রে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা জরুরি। কম আয়ের মানুষের জন্য উষ্ণ আশ্রয়কেন্দ্র ও খাবার সহায়তা কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, কমিউনিটি সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
শীতকাল আমাদের মনে করিয়ে দেয় নগরজীবনের ভঙ্গুরতা। আধুনিক অবকাঠামো ও প্রযুক্তির মাঝেও প্রকৃতির সামনে আমরা কতটা অসহায়। একই সঙ্গে এটি সহযোগিতা ও সহমর্মিতার সময়। প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া, একাকী প্রবীণকে সাহায্য করা, কারও গাড়ি বরফে আটকে গেলে হাত বাড়িয়ে দেওয়া—এই ছোট ছোট উদ্যোগই বিপর্যস্ত সময়ে বড় মানবিক শক্তি হয়ে ওঠে।
নিউইয়র্কসহ আমেরিকার তীব্র শীত এক দুর্ভোগের গল্প। এটি সচেতনতা, প্রস্তুতি ও পারস্পরিক সহায়তার পরীক্ষাও। শীতের বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই, তবে সম্মিলিত দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার চর্চা থাকলে এই কঠিন সময়ও মোকাবিলা করা সম্ভব। তুষারপাতের নিচে ঢাকা শহর আবারও জেগে উঠবে—শর্ত একটাই, আমরা যেন দায়িত্বশীল ও সহানুভূতিশীল থাকতে পারি।