
মার্কিন ডেমোক্র্যাট রাজনীতিতে প্রতিনিধি আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কার্টেজের প্রভাব স্পষ্টভাবেই বাড়ছে। দলের ভেতরে ও বাইরে তার রাজনৈতিক ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা এখন আরও জোরালো।
সর্বশেষ উদাহরণ নিউজার্সিতে। সেখানে হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের একটি বিশেষ প্রাইমারি নির্বাচনে ওকাসিও-কার্টেজের সমর্থিত প্রার্থী আনালিলিয়া মেজিয়া প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফল করেন। প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক কংগ্রেসম্যান টম ম্যালিনোস্কি শেষ পর্যন্ত পরাজয় স্বীকার করেন। এই ফলাফল ওকাসিও-কার্টেজের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাবের আরেকটি প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানিকে সমর্থন দিয়ে বড় সাফল্য পান তিনি। ডেমোক্র্যাটিক সমাজতান্ত্রিক এই প্রার্থীর বিজয়ে ওকাসিও-কার্টেজের আগাম সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে মনে করছেন দলীয় কৌশলবিদরা।
একই সঙ্গে সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের সঙ্গে দেশজুড়ে ‘ফাইটিং অলিগার্কি’ শিরোনামের সমাবেশে বড় বড় জনসমাবেশ করছেন ওকাসিও-কার্টেজ। রিপাবলিকান অধ্যুষিত এলাকাতেও এসব সমাবেশে মানুষের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।
ডেমোক্র্যাট কৌশলবিদ এডি ভেইল বলেন, “তার প্রভাব বাড়ছে, কারণ তিনি খুব পরিকল্পিতভাবে নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলছেন। অনেকেই কেবল শোরগোল তুলতে আগ্রহী থাকেন, কিন্তু তিনি ধীরে, স্থিরভাবে নিজের অবস্থান শক্ত করছেন।”
২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে অভাবনীয় জয় দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ওকাসিও-কার্টেজ। নিউইয়র্কে শক্তিশালী প্রার্থীকে হারিয়ে তিনি কংগ্রেসে নির্বাচিত হন এবং ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ নারী কংগ্রেস সদস্য হন। এখন ৩৬ বছর বয়সে তিনি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অন্যতম বড় তহবিল সংগ্রাহক এবং প্রগতিশীল ধারার প্রধান মুখ।
ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালে তিনি প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ ডলার তহবিল সংগ্রহ করেন। আগামী সপ্তাহে মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে তার অংশগ্রহণের কথাও শোনা যাচ্ছে, যা তাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও পরিচিত করে তুলতে পারে।
নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট কৌশলবিদ হ্যাংক শেইনকপফ বলেন, “তিনি বার্নি স্যান্ডার্সের রাজনৈতিক ধারার উত্তরসূরি। তিনি পরিবর্তনের প্রতীক, কিন্তু ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলার রাজনীতিক নন।”
যদিও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন এড়িয়ে চলছেন ওকাসিও-কোর্তেজ, তবুও ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তার নাম ঘুরে ফিরে আসছে। এক ডেমোক্র্যাট কৌশলবিদ বলেন, তিনি দলের সবচেয়ে কার্যকর যোগাযোগকারীদের একজন এবং প্রগতিশীল ভোটব্যাংকে তার ভিত্তি অত্যন্ত শক্ত।
ইয়েল ইয়ুথ পোল-এ তরুণ ভোটারদের মধ্যে তিনি কমলা হ্যারিস, গ্যাভিন নিউজমসহ অন্যান্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের চেয়ে দ্বিঅঙ্কের ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। ডিসেম্বরের এক জরিপে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের বিরুদ্ধে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকার তথ্যও তিনি নিজেই তুলে ধরেন। ইউগভের জনপ্রিয়তা সূচকে বছরের শেষে তিনি দেশের পঞ্চম জনপ্রিয় ডেমোক্র্যাট হিসেবে তালিকাভুক্ত হন, যা অনেক প্রতিষ্ঠিত নেতার চেয়েও এগিয়ে।
তবে সবাই যে তার সম্ভাবনা নিয়ে নিঃসন্দেহ, তা নয়। নিউইয়র্কের কৌশলবিদ জন রেইনিশ মনে করেন, ২০২৮ সালে ডেমোক্র্যাটদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে ‘কে নিশ্চিতভাবে জিততে পারবেন’। তার মতে, সুইং স্টেটগুলোতে ওকাসিও-কার্টেজ কতটা কার্যকর হবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।
সেটন হল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যাপক ম্যাট হেইলও মনে করেন, অতিমাত্রায় প্রগতিশীল প্রার্থীদের জন্য প্রাথমিক রাজ্যগুলোতে লড়াই কঠিন হতে পারে। তবে ট্রাম্প-পরবর্তী রাজনীতিতে ভোটারদের মানসিকতা বদলাচ্ছে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে না গেলে, ওকাসিও সিনেট নেতা চাক শুমারের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন—এমন আলোচনা ডেমোক্র্যাট মহলেও শোনা যাচ্ছে। কংগ্রেসে প্রজন্মগত পরিবর্তনের দাবির সঙ্গেও তার নাম জড়িয়ে পড়ছে। তবে ঘনিষ্ঠদের মতে, তার কোনো তাড়াহুড়ো নেই। “তার হাতে সময় আছে। তিনি তরুণ, অর্থ সংগ্রহের সক্ষমতাও অসাধারণ,” বলেন শেইনকপফ। “তাহলে তাড়াহুড়োরই বা কী আছে?”
এদিকে, প্রভাব বাড়ানোর কৌশল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে প্রার্থী সমর্থন অব্যাহত রেখেছেন ওকাসিও-কার্টেজ। নিউজার্সিতে আনালিলিয়া মেজিয়ার উত্থান এবং নিউইয়র্কে মামদানির জয় প্রমাণ করছে—তার সমর্থন বাস্তব রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নিচ্ছে।
ডেমোক্র্যাট নেতা বাসিল স্মাইকেলের ভাষায়, “আগে যেমন জাতীয় রাজনীতিতে জিম ক্লাইবার্ন বা চার্লস র্যাংগেলের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এখন অনেক ক্ষেত্রেই ওকাসিও-কার্টেজ সেই ভূমিকায় চলে এসেছেন।”
ভবিষ্যতে তিনি কোন পথে হাঁটবেন, তা এখনও অনিশ্চিত। তবে ডেমোক্র্যাট রাজনীতিতে এক বিষয় স্পষ্ট—আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কার্টেজ এখন আর শুধু আন্দোলনের মুখ নন, তিনি একজন প্রভাবশালী ক্ষমতাকেন্দ্র।