
ওয়াশিংটন ডিসির কংগ্রেস ভবনের আলোঝলমলে কক্ষে যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণ শুরু করেন, তখন কক্ষের ভেতরেই যেন দুই ভিন্ন আমেরিকার উপস্থিতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একপাশে দাঁড়িয়ে করতালি দিচ্ছেন রিপাবলিকান পার্টি-এর আইনপ্রণেতারা, অন্যপাশে গম্ভীর মুখে বসে আছেন ডেমোক্র্যাট পার্টি-এর সদস্যরা। বাইরে তখনও বিতর্ক, ভেতরে আরও বড় রাজনৈতিক লড়াই।
ভাষণের শুরুতেই ট্রাম্প অর্থনীতির সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। তাঁর দাবি—মুদ্রাস্ফীতি কমেছে, জ্বালানির দাম নেমেছে, চাকরির বাজার শক্তিশালী, শেয়ারবাজার ঊর্ধ্বমুখী। শিল্প উৎপাদন ও জ্বালানি খাতে “ঐতিহাসিক অগ্রগতি”র কথাও তিনি উল্লেখ করেন। সীমান্ত নিরাপত্তাকে “রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব” বলে ঘোষণা করে কঠোর নীতির পক্ষে অবস্থান নেন। আমেরিকান উৎপাদন বাড়াতে শুল্ক আরোপ ও দেশীয় শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করেন। সামরিক বাহিনী ও ভেটেরানদের সম্মান জানিয়ে কিছু আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয়—যা তাঁর সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
ভাষণের পরপরই একাধিক জরিপে দেখা যায়, দর্শকদের একটি অংশ ভাষণকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেছেন। সিএনন-এর প্রকাশিত তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জরিপে রিপাবলিকান ঘরানার দর্শকদের মধ্যে উচ্চ সন্তুষ্টি দেখা যায়। ট্রাম্প শিবির এটিকে “জনসমর্থনের প্রমাণ” হিসেবে তুলে ধরে।
কিন্তু সমালোচনার ঝড়ও কম ছিল না। দ্যা গার্ডিয়ান বিশ্লেষণে ভাষণকে তীব্রভাবে বিভাজনমূলক আখ্যা দেয়, উল্লেখ করে—প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে বহু দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পিবিএস নিউজ আওয়ার-এর ফ্যাক্ট-চেক প্রতিবেদনে অর্থনীতি, স্বাস্থ্যনীতি ও অভিবাসন প্রসঙ্গে কয়েকটি পরিসংখ্যান ও দাবির অসঙ্গতি তুলে ধরা হয়। ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা অভিযোগ করেন, জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা ও মধ্যবিত্তের চাপ নিয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান অনুপস্থিত ছিল ভাষণে।
অন্যদিকে, ভাষণের আগের এক জরিপে দ্যা ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়—দেশের একটি বড় অংশ মনে করে দেশ “ভুল পথে” এগোচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে সমালোচকেরা বলেন, ভাষণের আশাবাদী সুর সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।
কংগ্রেসের কক্ষের করতালি আর নীরবতার ফাঁকে ফাঁকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এই ভাষণ শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, বরং আসন্ন রাজনৈতিক লড়াইয়ের মঞ্চ প্রস্তুত। সমর্থকদের কাছে এটি ছিল দৃঢ় নেতৃত্বের প্রদর্শন; বিরোধীদের চোখে তা ছিল অতিরঞ্জিত আত্মপ্রশংসা ও বিভাজনের পুনরাবৃত্তি।
একই ভাষণ—দুটি ব্যাখ্যা। একপক্ষ বলছে, দেশ জয়ের পথে। অন্যপক্ষ বলছে, বাস্তবতার সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে। আমেরিকার রাজনৈতিক আকাশে তাই প্রশ্ন রয়ে যায়—কোন বয়ান শেষ পর্যন্ত ভোটারদের মনে বেশি প্রতিধ্বনি তুলবে?